মেইন ম্যেনু

আমার নিজের দেশ || পল্লব কীর্ত্তনীয়া

আমার চব্বিশ বছর বয়সী মা ছুটছে আমার তেরো মাস বয়সী দাদাকে কোলে নিয়ে, দুধারে ঘন পাটক্ষেতের আল দিয়ে, ধানক্ষেত ভেঙে। বাবা অনেকটা সামনে। মা তাল রাখতে পারছে না ঠিক। একুশ এবং আঠারোর দুই মাসি মায়ের সঙ্গে ছুটছে। বাবার কাছে একটা ঝোলায় সামান্য কিছু টাকাকড়ি, চিড়ে-মুড়ি, বিস্কুটের প্যাকেট আর একটা ট্রাঙ্ক, মাসিদের কোলে-কাঁখে একটা চামড়ার সুটকেস, একটা মাদুর আর তেরো মাসের ছানার ছোট্ট বিছানা। ব্যাস, এই সম্বলটুকু আঁকড়ে ওরা পাড়ি দিচ্ছে দেশ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ইন্ডিয়া। লুকিয়ে, পালিয়ে।

১৯৬৪’র ৫ জুলাই। আষাঢ় মাস তো, বৃষ্টি এসেছিলো ঝেঁপে, দাদা খুব ভিজছিলো আর কাঁদছিলো। মা দাদার মাথা ঢাকার চেষ্টা করছিলো অসহায় আঁচলে। ও আরো কাঁদছিলো। ওর কি খুব শীত করছিলো? মাত্র তেরো মাস বয়স তো! আমার একটুও শীত করেনি। আমি তখন সবে ন-মাসের ভ্রূণ, মায়ের পেটের ভেতর কি সুন্দর হালকা গরমজলে সাঁতার কাটছি! আর ঠিক একমাস দশ দিন পর আমি জন্মাব তো, আমাকে পেটে আর দাদাকে কোলে নিয়ে ছুটতে মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছিলো, চোখে জল আসছিলো বোধ হয়, খুব হাঁপাচ্ছিলো মা। বাবা খানিক পিছিয়ে এসে মাকে ধরলো, ‘আমরা প্রায় এসে গেছি, ওই দেখো দূরে ওই একটা খালের মতো দেখতে পাচ্ছো? ওখানে নৌকো রাখা আছে আমাদের নামে, দালাল সব ঠিক করে রেখেছে. নৌকোয় উঠে গেলে নিশ্চিন্তি, খাল বেয়ে ইছামতি আর ইছামতি বেয়ে তেঁতুলিয়া |’ বাবার কথায় সবার চোখ চক চক করে উঠেছে। আর একটু, আর একটু! নৌকোয় উঠতে পারলেই নিশ্চিন্তি- নিশ্চিন্তি প্রাণ হারানোর আশঙ্কা থেকে, নিশ্চিন্তি মান খোয়ানোর শংকা থেকে, নিশ্চিন্তি যে কোনো মুহূর্তে বাবার গ্রেফতারির ভয় থেকে!

বাবা ইতমধ্যেই সাতক্ষীরা কলেজের অধ্যাপনায় ইস্তফা দিয়ে মিথ্যে মিথ্যে বলেছিলো সবাইকে, সদ্য গড়ে ওঠা মাথাভাঙ্গা কলেজে ডাক পেয়েছে তাই চলে যাবে ওখানে। বাবার বন্ধু নিরোদকাকু ওই কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। তিনি ‘আপনাকে আমাদের সদ্য প্রতিষ্ঠিত মাথাভাঙ্গা কলেজে প্রয়োজন, এখানে সংযুক্ত হলে উপকৃত হবো’– এই মর্মে একটা মিথ্যে চিঠিও করে দিয়েছিলেন বাবাকে যাতে তার কথা ঘুণাক্ষরেও অবিশ্বাস না করে কেউ, কাকপক্ষীও যাতে এতটুকু টের না পায় আমরা পালাচ্ছি ‘ইন্ডিয়ায়’। এতো গোপনীয়তার কারণ সাতক্ষীরার আকাশে তখন ভয়ের ঘন মেঘ। হিন্দু, মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের ভেতর অবিশ্বাস আর সন্দেহের হাওয়া উঠেছে ঘোরালো হয়ে– রক্ত-গন্ধ আসে বুঝি! পালানোর আঁচ পেলেই হয় তো নেমে আসবে আক্রমণ, নির্বিচার লুঠ-তরাজ।

দেশভাগের আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বারবার রক্তে ভেসে গেছে অবিভক্ত বাংলা। স্বাধীনতার পরেও এপার-ওপার দু-দিকেই মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই টেনশন, রক্ত-গন্ধ। ওপার বাংলার নাম তখন পূর্ব পাকিস্থান, পশ্চিম পাকিস্থানের শাসনাধীন। ধর্ম-নিরপেক্ষতা ছেড়ে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে তোলার হাওয়া সেখানে প্রবল হয়ে উঠছিলো ভেতরে ভেতরে। ওখানে সংখ্যালঘুরা তাই বাঁচতেন ভয়ে কুঁকড়ে, মাথা নিচু করে, প্রায় মাটিতে মিশে। ওপার বাংলা থেকে হিন্দুদের এদেশে চলে আসার স্রোত তাই অব্যাহত ছিল (আজও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি সেই শেকড় ছিঁড়ে আসার বহমানতা)। এপার থেকেও বহু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ওপারে চলে গেছেন স্বাধীনতার সময়, তবে তারপর সেটা ক্রমে স্তিমিত হয়ে যেতে থাকে। এখানকার রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুরা ক্রমশ আস্থা অর্জন করছিলেন কিছুটা। তবে ধর্মান্ধতা এমনই এক বিষ, যে মস্তিষ্কের দূরতম কোষ-কলায় ঘাঁটি গেড়ে থাকে, ঘাঁটি গেড়ে থাকে মজ্জায়, রক্ত-কণিকায়। একেবারে নির্মূল হয় না কিছুতেই। ছোট্ট কোনো উস্কানিতে এই দেশেও তাই মাঝে মাঝে ঘনিয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক অশান্তি, বিবাদ, অকারণ রক্তক্ষয়। ১৯৬৪ সালের গোড়ার দিকে শোনা যায় ২৪ পরগনার হাবড়ায় রূপকথা সিনেমা হলের মুসলমান মালিক এ রকম-ই কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদে খুন হয়ে যান এবং এই অঞ্চলের পনের-বিশজনের একদল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হয়। তাঁরা বর্ডারের ঠিক ওপারে সাতক্ষীরায় এসে আশ্রয় নেন। ওখানে ছড়িয়ে পড়ে দাবানল, জেগে ওঠে সেই বিষ, রক্ত-গন্ধ! হিন্দুরা থর থর কাঁপে, যে কোনো মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে হত্যা, লুঠ, ধর্ষণ, ধ্বংসলীলা! প্ৰশাসণ মিটিং ডাকে। আমার বাবা, আমার আদরের বাপি, সাতক্ষীরা কলেজের জনপ্রিয়, তরুণ বাংলার অধ্যাপক সেই মিটিং-এ বক্তব্য রাখবে ঠিক হয়।

বাপি মানবতার কথা বলেছিলো, ধর্মের ভিত্তিতে দেশ-বিভাগ নিয়ে রাজনৈতিক ধান্দাপূরণ বলেছিলো। বলেছিলো, ‘এই দেশভাগ আমরা তো চাইনি। আচমকা আমরা আবিষ্কার করলাম ভারত একটা আলাদা দেশ, একটু সুস্থভাবে বাঁচতে হলে ওখানে হিন্দুরা চলে যাবে, আর এখানে থাকবে প্রধানত মুসলমানরা। কেন এমন হবে? কেন আমার নিজের মাটিতে শুধু ধর্ম আলাদা বলেই ভয়ে কুঁকড়ে বাঁচতে হবে? ওদেশে কোনো সাম্প্রদায়িক বিবাদ হলে, মুসলমানদের ওপর কোনো আক্রমণ হলে তার দায় কেন নিতে হবে এদেশের হিন্দুদের? তাদের অপরাধ কী? আবার ওই দেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমানভাবে সত্য!’ চিরকালের নাস্তিক, আদর্শবান বাপি সব ধর্মের সমানাধিকারের কথা বলেছিলো। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলেছিলো। একসঙ্গে মিলেমিশে বাঁচার কথা বলেছিলো, ভালোবাসার কথা বলেছিলো। লাভ হয়নি কিছুই।

ধর্মের ধ্বজাধারীরা কঠিন চোয়াল নিয়ে চোখ সরু করে মেপে রেখেছিল সব, প্রশাসন মহা ক্রুদ্ধ। মহকুমা শাসক বাপিকে ডেকে প্রবল ধমকালেন, ‘আপনি এই দেশ জন্মানোর বিরুদ্ধে বলেছেন, দেশদ্রোহী বক্তব্য রেখেছেন। প্রয়োজনে যে কোনো মুহূর্তে আপনাকে আরেস্ট করবো।’

চারপাশে তখন ভয়, আতঙ্ক- কী হয় কী হয়! মায়ের পেটের ভেতর ছয়-সাত-আট মাসের ভ্রূণ আমি টের পেতাম সেই তীব্র ভয়। ন-দশ-এগারো মাসের দাদাকে বুকে জড়িয়ে মা-বাপির নির্ঘুম রাত, নিচু আতঙ্কের স্বরে কথা, বাপিকে ধরে মায়ের কান্না, মাসিদের বিস্ফারিত চোখে ফিসফিস– সব টের পেতাম আমি। এক এক করে সমস্ত দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো আমাদের। বাপি প্রশাসনের কাছে নিরাপত। (চলবে……)



মন্তব্য চালু নেই