মেইন ম্যেনু

উন্নয়ন হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষ ভাগ পাচ্ছে না কেন?

দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। জিডিপি ক্রমাগত বাড়ছে। আমাদের মাথাপিছু গড় আয়ও বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৬২ ডলারের মতো। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি। উন্নয়নের ধারা ৫ বছর অব্যাহত থাকলে, আমরা প্রকৃত উন্নয়নশীল দেশে পরিগণিত হব। এরই ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার কমছে।

গেল বছর (২০১৭) এ হার দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সুতরাং সামগ্রিক বিবেচনায় দারিদ্র্য নিরসনে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

দারিদ্র্য নিরসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় হল মানব উন্নয়নসূচক বা Human Development Index (HDI)। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান- এ তিনটি নির্দেশিকা নিয়ে তৈরি জাতিসংঘের এই সামষ্টিক সূচক কোনো দেশের মানব উন্নয়নের মৌলিক দিকগুলো সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।

২০১৮ সালে বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়েছে। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ২০১৮ সালের বিশ্বব্যাংকের মানব সম্পর্ক সূচক এরই সত্যতা তুলে ধরে। সূচক সংবলিত প্রতিবেদনটির মতো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার বিদ্যমান অবস্থা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের শিশুরা ভারত ও পাকিস্তানের শিশুদের চেয়ে বেশি উৎপাদনশীল হবে (প্রথম আলো ১২-১০-২০১৮)।

বিশ্ব ক্ষুধা সূচকেও আমরা এগিয়ে আছি। ক্ষুধা দূরীকরণে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। বিগত তিন বছর ধরে ক্ষুধা নিরসনে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করে চলেছে। চলতি বছরের (২০১৮) বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশ ১১৭টি দেশের মধ্যে ৮৬তম স্থান লাভ করেছে।

এ ক্ষেত্রে গতবারের চেয়ে দুই ধাপ এগিয়েছে। তবে দেশে ক্ষুধা পরিস্থিতি যে বেশ সন্তোষজনক তা বলা যাবে না। ৩৬ লাখ মানুষ এখনও মারাত্মক ক্ষুধা ঝুঁকির মধ্যে আছে। আর ক্ষুধামুক্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পর্যাপ্ত পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য পাচ্ছে না।

গত বছরের এক হিসাব মতে, এখনও ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। অসচেতনতা এবং পুষ্টিযুক্ত বৈচিত্র্যহীন খাদ্যের কারণে এটি ঘটছে (প্রথম আলো ৮-৫-১৭)। তবে উপরোক্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি এবং বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে উন্নতি- এসবই আমাদের জন্য আনন্দ, উন্নতি এবং এগিয়ে যাওয়ার খবর।

কিন্তু এর বিপরীতে যখন শুনি দেশের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশেরই ভাগ পায় সমাজের ওপরের দিকে থাকা ১০ শতাংশ ধনী, আর মোট আয়ের মাত্র ১ শতাংশের ভাগ এবং ভোগ পায় সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ, তখন বেজায় দুঃখিত না হয়ে পারা যায় না, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের এক জরিপের এ তথ্য খুবই মর্মান্তিক এবং হতাশাজনক।

একই জরিপে দেখা যায় ওপরের ৫ শতাংশ লোক নিচের ৫ শতাংশ লোকের চেয়ে ১২১ গুণ বেশি আয় করে। দেশে ধন-বৈষম্যের এ ভয়াবহ পরিস্থিতির যে হ্রাস হচ্ছে না, তার প্রমাণ মেলে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের সম্প্রতি প্রকাশিত অসাম্যসূচকে। (Inequality Index of Oxfam) তাদের মতে, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ধন-বৈষম্য হ্রাসকরণে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা বেশ দুর্বল, যদিও দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৭ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। ধন-বৈষম্যের সূচকে বিশ্বের ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৮।

ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ, যথা মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত ও নেপালের অবস্থান বাংলাদেশের ওপরে (star Business 10-10-18)। কিছুদিন আগে বাংলাদেশে এ বৈষম্যেরই আরেকটি খবর দেয় মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স। তাদের মতে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে।

কিন্তু দেশটি ২০১২ থেকে বিশ্বে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে সবার ওপরে (প্রথম আলো ১২-৯-১৮)।

এর মধ্যে আরেকটি দুঃসংবাদ পাওয়া গেল। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সূচকে বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় এক ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩, গতবার যা ছিল ১০২। বিশেষজ্ঞরা এ অবনতির কারণ হিসেবে দুর্নীতিকে এক নম্বর হিসেবে দায়ী করেছে।

অন্য দুটি হচ্ছে অদক্ষ আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামো সমস্যা। দুর্নীতি তথা সুশাসনের অভাব আমাদের উন্নয়নের যে সবচেয়ে বড় বাধা, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর আমলাতন্ত্রের অদক্ষতার কথাও সর্বজনবিদিত। শিক্ষার গুণগত মানের অভাবের সঙ্গে এ ব্যাপারে যুক্ত হয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। সারাক্ষণ ঘুষ-দুর্র্নীতির নেশায় ব্যস্ত আমলাগোষ্ঠীর পক্ষে দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত মানসম্পন্ন সেবা প্রদান সম্ভব নয়।

প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সক্ষমতার পরিচয় প্রদান দুর্বল অবকাঠামোসম্পন্ন দেশের দুর্নীতিবাজ অদক্ষ আমলাগোষ্ঠীর পক্ষে যে দুরূহ হবে তা সহজেই অনুমেয়।

দেশে দারিদ্র্য নিরসনের হার হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে অতি দারিদ্র্য ২৪.২৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে ২২ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দুর্নীতি এবং অদক্ষতা হ্রাস পেলে আমার মতে অতিদরিদ্রের হার ২০ শতাংশে পৌঁছত; ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও অনেক কমত এবং দ্রুতগতিতে অতি ধনীদের বৃদ্ধির হারও হ্রাস পেত।

দুর্নীতির মাধ্যমেই ব্যবসায়ী, আমলা এবং রাজনীতিকরা দেশে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ধনী হয়। আর এ দরিদ্র দেশের অতিশয় ধনীরা বিদেশে বিপুল অঙ্কের টাকা পাচার করে এবং সৃষ্টি হয় আমেরিকা ও কানাডায় বাংলাদেশি বেগমপাড়া, শপিংমল এবং মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম।

সরকারের বড় বড় প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঘুষ-দুর্নীতি ও ব্যাংক-বীমা লুটপাট ধরনের অপকর্মের মাধ্যমে আমলা-ব্যবসায়ী-রাজনীতিকদের একটি গোষ্ঠী দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে পড়েছে। এই ধনিক গোষ্ঠীটিই দেশে ধনী-গরিবের বিরাট বৈষম্য সৃষ্টিকারীও বটে, এদের এই ধন দেশের উৎপাদন বৃদ্ধিতেও তেমন একটা বিনিয়োগ হয় না।

বরং হয় ভোগ-বিলাসে এবং বিদেশে টাকা পাচারে। তাই এদের দেশপ্রেমিক জাতীয় বুর্জোয়াও বলা যায় না। যা বলা যায় তা হল দেশ লুণ্ঠনকারী, ভোগ-বিলাসে আসক্ত একদল লুম্পেন বা মুৎসুদ্ধি বুর্জোয়া।

সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়-বরাদ্দ বর্তমানের তুলনায় অধিকতর (অন্তত দ্বিগুণ) বৃদ্ধি করলে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং উন্নয়নের সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধিকহারে ভোগ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এর সঙ্গে তাদের কাছে সহজ শর্তে এবং স্বল্পসুদে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হওয়া সম্ভব। সরকার চাইলে ধন-বৈষম্য দূরীকরণের কৌশল নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের অভাব হবে না।

প্রসঙ্গক্রমে আমাদের আরেকটি পরামর্শ হচ্ছে, রাজনীতিক এবং আমলাদের বাইরের কিছু উচ্চশিক্ষিত, দুর্নীতিমুক্ত এবং দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের একটি পরামর্শক সভা গঠনপূর্বক অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে তাদের মতামত এবং সুপারিশ গ্রহণ।

পরিশেষে বলতে হয়, গত ১০ বছরে দেশের যে উন্নয়ন হয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ক্ষুদ্রসংখ্যক আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকের দুর্নীতির কারণে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ তার সুফল যথাযথভাবে পাচ্ছে না। গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে আগামী সরকারকে এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। দেশবাসীকেও সোচ্চার হতে হবে। সংসদ সদস্য এবং জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টিতেও বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারে না। (যুগান্তরের সৌজন্যে প্রকাশিত)

লেখক : মো. মইনুল ইসলামসাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য চালু নেই