মেইন ম্যেনু

একজন সাধারণ ছাত্রের ‘কোটা-চিন্তা’

সাফাত জামিল : ফরাসি দার্শনিকতা জাক দেরিদা’র ডিকন্সট্রাকশন থিওরি পড়ার পর থেকে কাঠামোগত বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে বা কথা বলতেই বিরক্ত লাগে। তবু এ দেশে যেহেতু থাকি,এদেশের আলো-বাতাস গ্রহন করে বেঁচে আছি, তাই কিছু না কিছু বলতে হয়, লিখতে হয়। আলোচ্য যেকোন বিষয় নিয়েই নিজের মতামত দেয়া বাঙালিত্ববোধের বৈশিষ্ট্য। তবুও যথেষ্ট নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই লিখেছি, যেকেউ নিজের মত করে ভাবতে পারে, মতামত দিতে পারে। কেননা আরেকজন দার্শনিক রোলা বার্থ তো বলেই দিয়েছেন, “রচনা প্রকাশের পরই রচয়িতার মৃত্যু ঘটে, জন্ম হয় পাঠকের।”

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে গত কয়দিন দেশজুড়ে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়,মোটামুটি সারাদেশেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। হঠাৎ করে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন এতটা ব্যাপকতা লাভ করবে কেউ সেটা ভাবতে পারেননি। আন্দোলন অবশেষে থামলো, বরাবরের মত জেগে উঠল কিছু প্রশ্ন।অনেকেই মন্তব্য করেছেন, “ছাত্রছাত্রীরা পানি চেয়েছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাকি শরবত দিয়ে দিয়েছেন, তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে রাগ করে, অভিমান করে কোটা উঠিয়ে দিয়েছেন” ইত্যাদি।

সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের একজন উপদেষ্টাসহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ বৈষম্যবিরোধী এ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু গনসমর্থনের এ ইস্যুতে ধীরে ধীরে ‘রাজনীতি’ ঢুকে পড়েছিল সেটা বোঝার জন্য গবেষক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। কোটা ব্যবস্থা রাখা না-রাখার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচর্যের কোনও সম্পর্ক নেই। তারপরও তার বাসভবনে গভীর রাতে হামলা করা, ভাঙচুর, লুটপাট করা,পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার জন্য প্রস্তুত জিনিসপত্র ভাঙচুর এগুলো কোটাবিহীন মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাজ বলে মেনে নেয়া যায়না।

এদেশের নারীর অবস্থান কি এতটাই বদলে গেছে যে, নারীর জন্য ১০ শতাংশ কোটা থাকাটাও আর প্রয়োজন নেই? আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ দেখে মনে হচ্ছিল যে, নারীরা আর এই কোটা চাইছেন না। অথচ সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হলো এদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীর। মাঝে মাঝে পত্রিকায় বিভিন্ন এলাকার নারী ইউএনও, এসপি, ডিসি- দের সাহসীকতার খবর পড়ি, ভালো লাগে। নারীদেরকে কোটা দিয়ে সুবিধা দেয়া হয়নি, বরং সাহস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন?

মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কিছুই বলতে চাইনা, কেননা ব্যাপারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কিন্তু আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অনেক শ্লোগান শোনা গিয়েছিল বলে পত্রিকায় পড়েছি। সত্য মিথ্যা জানিনা।

কোটা পদ্ধতি সংস্কার হোক আর বাতিলই হোক, এতে করে কি দেশের বেকার সমস্যা দূর হবে? কখনোই না। কারণ একটা বিশাল অংশ তো চাকুরীহীন-ই থাকবে। সুতরাং প্রকৃত সমস্যা তো সমস্যা হিসেবেই থেকে যাচ্ছে।কোটা পদ্ধতি সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীরা যদি ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, সরকারি চাকরিতে নতুন পদ সৃষ্টি করা, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত করার জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং সর্বোপরি ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধেও দাবি তুলে ধরতো তাহলে সেটা হতো শতভাগ যৌক্তিক।

ড. জাফর ইকবাল স্যারের একটি কলাম পড়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভাবনাজগত আবারো ধাক্কা খেয়েছে । বিসিএস বা সরকারী চাকুরী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ভাইবা বোর্ডে যদি নিচের প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করে, তবে কি উত্তর দেবো?

“দাবি আদায় করার জন্যে তুমি কী সবাইকে নিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ করে পুরো শহরকে জিম্মি করে ফেলার বিষয়টি সমর্থন করো?”

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য চালু নেই