মেইন ম্যেনু

ছাত্রলীগের নামে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর নাহিদের চাঁদাবাজি

উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ শহর নীলফামারীর সৈয়দপুরে সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন আটকিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ট্রাফিক বিভাগের সদস্যরা যানজট নিরসনের পরিবর্তে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন চাঁদাবাজির মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামাইয়ে।

শহরের বিভিন্ন মোড়ে যানবাহন থামিয়ে বখরা আদায় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এবং ভুক্তভোগীরা। কাগজ দেখার নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাঁদা আদায়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন যানবাহন চালক-মালিকরা। প্রতিদিন গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা দিয়ে সড়কে যানবাহন চালাতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। চাঁদাবাজির শিকার বেশি হচ্ছেন পণ্যবোঝাই যানবাহনের চালক-মালিকরা।

এর পেছনের মূলহোতা সৈয়দপুরে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজ চৌধুরী। তিনি ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে তার অধস্তনদের দিয়ে এবং কিছু দালালদের মাধ্যমে এসব চাঁদাবাজি করাচ্ছেন। তিনি কাউকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। তার হাত থেকে রক্ষা পাননি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা, এমনকি সাবেক সেনা কর্মকর্তাও। সেনা কর্মকর্তা তার পরিচয় দিয়ে আরও গালি শুনেছেন।

চাঁদাবাজির টাকায় দিন দিন আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন নাহিদ পারভেজ। যোগদানের এক বছরের মধ্যে তিনি অনেক সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। কিনেছেন দামি গাড়ি। থাকেন শহরের অভিজাত বাড়িতে।

ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজের বেপরোয়া চাঁদাবাজির ঘটনায় দুঃখ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ অন্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, সড়কে শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে জেলা শহর ও সৈয়দপুর শহরে ট্রাফিক পুলিশ বক্স স্থাপন করে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শকের পদসহ দুজন ট্রাফিক সার্জেন্ট পদ দেয়া হয় এই শহরের শৃঙ্খলার জন্য।

ট্রাফিক পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজ যোগদানের পর থেকেই সরকারদলীয় গুটিকয়েক নেতাকর্মীকে ম্যানেজ করে এক ধরনের রাজত্ব চালানো শুরু করেন। দিনাজপুর-রংপুর ও নীলফামারী মহাসড়কের ২৫টি পয়েন্টে নিয়োগ করেছেন দালাল চক্র। যাদের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন যানবাহন থেকে ১ লাখ টাকা আয় করছেন। এ ছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ রেখে অনায়াসে চাঁদাবাজি করছেন তিনি।

ভুক্তভোগী এক মোটরসাইকেলচালক নীলফামারী সদরের সংগলশী ইউনিয়নের দীঘলডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মইনুল শাহ ট্রাফিক পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজের সিগন্যাল অমান্য করায় বিনা রসিদে জরিমানা করেন ২ হাজার টাকা। রসিদ ছাড়াই জরিমানা দিতে প্রতিবাদ করায় তাকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করা হয়।

সূত্র আরও জানা গেছে, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজ সৈয়দপুরে যোগদানের পর থেকে আইনের ফাঁকফোকরে ফেলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে শুরু করেন বেপরোয়া চাঁদাবাজি। প্রতিনিয়ত তার হাতে নাজেহাল হচ্ছেন মোটরসাইকেল মালিকরা।

প্রথমে তিনি আইনের বিভিন্ন ধারা দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করে ধরিয়ে দিচ্ছেন স্লিপ। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাফিক সার্জেন্টদের হাতে তিনি দুই ধরনের স্লিপ দিয়ে রেখেছেন। একটি সরকারি কোষাগারে জমার জন্য, আর একটি নিজস্ব তহবিলে।

সৈয়দপুর পৌরসভাধীন মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা সুমন জানান, গত ৩১ জানুয়ারি তাকে মোটরসাইকেলসহ আটক করা হয় শহরের পাঁচমাথা মোড়ে। সেখানে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখানোর পরও বীমার মাত্র এক মাস অতিবাহিত হওয়ায় তার দুই হাজার টাকা জরিমানা করে একটি স্লিপ ধরিয়ে দেন।

তিনি বলেন, এর কিছুক্ষণ পর তাদেরই এক দালাল আমার কাছে এসে নানান ধরনের কথা বললে আমি এক হাজার টাকা দিলে তারা স্লিপটি নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেন।

একই ঘটনা ঘটেছে উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলী গ্রামের জীবন চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত ৩ ফেব্রুয়ারি আমাকে শহরের পোস্ট অফিসের সামনে এক ট্রাফিকের মাধ্যমে আটক করেন ওই ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। এরপর মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ও বীমার কাগজপত্র দেখতে চাইলে আমি তা দেখানোর পরও ফুল শার্ট, পায়ে জুতা ও হেলমেট নেই এই কারণে জরিমানা করতে চাইলে আমি ৫০০ টাকা দিয়ে তাদের হাত থেকে রেহাই পাই।

এ ছাড়া ঢলাপীরের আব্দুর রশীদ, ধলাগাছের রহমত আলীসহ অনেক সম্মানী মানুষের মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি আটকিয়ে চাঁদা নেওয়ার পরেও হয়রানিমূলক মামলা দিয়েছেন এই নাহিদ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নীলফামারীর পাঁচটি উপজেলায় নিয়মিত চলাচল করে প্রায় ২০০ মাইক্রোবাস, শতাধিক পিকআপ, দেড় শতাধিক ট্রাক্টর, ৬০টি পাওয়ার ট্রলি, ৩৬টি যাত্রীবাহী বাস ও ১২৫টি ট্রাক। সৈয়দপুর, রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী মহাসড়কে এসব পরিবহনের চাকা ঘুরলেই পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজকে প্রতিটি যানবাহন থেকে মাসোহারা দিতে হয়। না দিলে কাগজ দেখার নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই যানবাহন আটকিয়ে রাখে। নয়তো বা দেওয়া হয় মামলার খড়গ। বাধ্য হয়ে এ টাকা দিতে হচ্ছে চালকদের। সন্ধ্যার পর থেকে রাত ২টা পর্যন্ত চাঁদাবাজির ঘটনা বেশি ঘটে বলে চালকরা জানিয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, শহরের ওয়াবদা মোড়, রাবেয়া মোড়, বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে হাসপাতাল মোড়, শহীদ ডা. জিকরুল হক রোড় ও জহুরুল হক রোডে অবস্থান নেওয়া যানবাহনগুলো থেকে দালালের মাধ্যমে মাসিক মাসোহারা আদায় করায় নির্বিঘ্নে গাড়িগুলো দিনের বেলা শহরে ঢুকছে। এতে শহরে যানজট এবং দুর্ভোগ দুটিই বাড়ছে।

সৈয়দপুর বণিক সমিতির সভাপতি মো. ইদ্রিস আলী জানান, দিনের বেলা শহরে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল ও যানজট নিরসনে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সিদ্ধান্ত মতে, সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শহরে যানবাহন প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও অবাধে ভারী যানবাহন বিশেষ করে কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়ি, বিভিন্ন মালামাল পরিবহনে ট্রাক, পিকআপ এবং ট্রাক্টর ব্যস্ততম সড়ক শহীদ ডা. জিকরুল হক রোড ও জহুরুল হক রোডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মালামাল লোড-আনলোড করায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ অজ্ঞাত কারণে ট্রাফিক বিভাগ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। তারা এ থেকে পরিত্রাণ চান।

সৈয়দপুর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো. দিলনেওয়াজ খান বলেন, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে। তিনি নিজেকে ছাত্রলীগের নেতা পরিচয় দিয়ে বেপরোয়া কর্মকাণ্ড করায় সংগঠনটিরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন।

সৈয়দপুর পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, আমি নিজেই ওই ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের হাতে নাজেহাল হয়েছি। তাহলে বুঝে নিন, সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে কতটুকু সেবা পাচ্ছেন। আর সরকারি কর্মচারী হয়ে ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে সংগঠনটিকে কলুষিত করছে। এ ব্যাপারে আমরা দলীয়ভাবে কেন্দ্রকে অবহিত করব।

বাস-মিনিবাস-ট্রাক-ট্যাংকলরি নীলফামারী জেলা শাখার মালিক সমিতির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাফিক পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজের অপতৎপরতার কারণে সরকারের নিরাপদ সড়কব্যবস্থা অনিরাপদে পরিণত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি আগামী মাসে রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (আরটিএ) সভায় আলোচনা করার কথা জানান।

সৈয়দপুর ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি বন্ধে বাংলাদেশ অটোরিকশা-টেম্পো সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন নীলফামারী জেলা কমিটি একাধিকবার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে অবগত করলেও কোনো কাজ হয়নি।

ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন রহমান জানিয়েছেন, কালো টাকার দম্ভে পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজের সঙ্গে পেরে ওঠা যাচ্ছে না। পরিবহন শ্রমিকরা তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে গেলে আন্দোলনের বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।

নীলফামারী জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আখতার হোসেন বাদল বলেন, তার কাছে কোনো মালিক কিংবা চালক অভিযোগ নিয়ে এলে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে দিয়ে থাকেন।

এ বিষয়ে পুলিশের সৈয়দপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার অশোক কুমার পাল বলেন, ট্রাফিক পুলিশের কোনো কর্মকর্তা যদি অন্যায়ভাবে কোনো ট্রাকচালক কিংবা মোটরসাইকেল চালককে কাগজপত্র ঠিক থাকার পরেও অযথা হয়রানি করে থাকে তাহলে তার কাছে অভিযোগ করলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন।

তিনি আরও বলেন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বর্তমানে প্রতিদিন ১১টি করে বিমান ওঠানামা করায় রাস্তা সরু হওয়ার কারণে কিছুটা যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া রাস্তাগুলো খুবই সরু হওয়ায় এবং রাস্তার পাশে ব্যবসায়ীদের গোডাউন থাকায় ট্রাক থেকে দিনের বেলায় মাল লোড-আনলোড করায় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে পৌর মেয়র এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে যানজটের বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন।

সৈয়দপুর ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। নাহিদ বলেন, যেসব অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে তা মিথ্যা। তিনি মোবাইল ফোনে আরও বলেন, তিনি সবার সঙ্গেই মিলেমিশে কাজ করে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আবু নাহিদ পারভেজ চৌধুরীর সৈয়দপুরে যোগদানের এক বছরের মধ্যে অনেক বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে গেছেন। কিনেছেন দামি মোটরসাইকেল এবং কার। আর বসবাস করছেন শহরের অভিজাত আলতাফ টাওয়ারে। জানা গেছে, সীমাহীন চাঁদাবাজির অভিযোগের আগের কর্মস্থল নওগাঁ থেকে সৈয়দপুরে বদলি করা হয়।

কে এই ট্রাফিক পরিদর্শক আবু নাহিদ পারভেজ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময়ের ঠাকুরগাঁও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নাহিদ পারভেজ ওরফে সংগ্রাম ছিলেন জেলার ত্রাস। তাকে সবাই ত্রাস সংগ্রাম নামেই চেনেন। ছাত্র রাজনীতির সুবাদে সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন তিনি। রাতারাতি বনে যান প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জেলার সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারে তিনি প্রভাব খাটাতেন।

পরে ঝোপ বুঝে কোপ মেরে যোগ দেন পুলিশে। চাকরির বয়স খুব বেশি দিন না হলেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তদ্বিরে পেয়ে যান ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক। এই পদে থেকে গত কয়েক বছরে কামিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। জন্মস্থান ঠাকুরগাঁওয়ের বছিরপাড়া গ্রামে গড়ে তুলেছেন আধুনিক মডেলের একটি সুরম্য অট্টালিকা। স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে কিনেছেন একটি মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার।-পরিবর্তন ডটকমের সৌজন্যে প্রকাশিত।



মন্তব্য চালু নেই