মেইন ম্যেনু

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহে পুলিশ ও ইসির লুকোচুরি

নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের তালিকা গোপনে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। সেই তালিকা নিয়ে দুই মাস আগে তথ্য সংগ্রহে মাঠে নামে পুলিশ। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

তালিকায় থাকা প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা এবং আনসার-ভিডিপির সদস্যদের নাম-ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, আগে কখনো নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, বর্তমান ও অতীতে দলীয় পরিচয়, কারও স্বামী বা পরিবারের অন্য কেউ রাজনীতি করেন কি না—এসব তথ্য রেকর্ড করা হচ্ছে।

নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ব্যাপারে এমন গোপন অনুসন্ধান নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেকে নির্বাচনী দায়িত্ব কীভাবে এড়াবেন, তার কৌশল খুঁজছেন বলে জানিয়েছেন। তবে মাঠপর্যায়ে গোপনে ও প্রকাশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও ঢাকায় নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বিষয়টি অস্বীকার করে যাচ্ছেন। পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, এ ব্যাপারে পুলিশের কোনো নির্দেশনা নেই।

পুলিশের এমন গোপন অনুসন্ধানের ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, কারা নির্বাচনী কর্মকর্তা হবেন, এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় অনেকগুলো শর্ত আছে। যদি কেউ দণ্ডপ্রাপ্ত হন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, এটা যাচাই করার সক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের নেই। কাজটি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে কেউ করে দিতে হবে। এ রকম ক্ষেত্রে যাচাইয়ের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তা পুলিশকে অনুরোধ করতে পারেন। তারপরও নির্বাচন কমিশন বা রিটার্নিং কর্মকর্তা এ ধরনের কোনো নির্দেশ দেননি বলে তিনি জানান।

পুলিশ যদি আগবাড়িয়ে এসব করে থাকে, তাহলে কমিশন কিছু বলছে না কেন, এ প্রশ্ন করা হলে রফিকুল ইসলাম বলেন, যদি অত্যুৎসাহী কোনো পুলিশ এ ধরনের কাজ করে থাকে, কেউ এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণমাধ্যমে তো খবর প্রকাশিত হয়েছে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন, এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, গণমাধ্যমে আসা নাম-ঠিকানাগুলো যাচাই করা হবে। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্বাচন কর্মকর্তাদের তালিকা ইসির হাতে থাকার কথা। সেই তালিকা পুলিশের হাতে গেল কীভাবে, এ প্রশ্নের জবাবে রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কর্মকর্তা কারা হবেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। যেকোনো মানুষই চিহ্নিত করতে পারেন কারা নির্বাচন কর্মকর্তা হবেন। এ ক্ষেত্রে কাউকে হয়রানি করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুই মাস আগে থেকেই নির্বাচন কর্মকর্তাদের ব্যাপারে তাঁরা খোঁজখবর শুরু করেছেন। ওপরের নির্দেশে এসব করা হচ্ছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তারা বলেন, জামায়াত ও বিএনপির লোকদের তথ্যের ব্যাপারে তাঁরা বেশি তৎপর।

নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন, বরিশাল নগরের এমন অন্তত আটজন ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাঁরা বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের কর্মস্থলে, এমনকি স্থায়ী ঠিকানায় (গ্রামের বাড়ি) পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয়সহ নানা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

বরিশালের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কোনো খোঁজখবর করছি না।’

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান গতকাল দুপুরে বলেন, পুলিশ প্রশাসন নিজস্ব প্রয়োজনেই দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং-পোলিং কর্মকর্তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে পারে।

খুলনা সরকারি বিএল কলেজের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, অপরিচিত কোনো নম্বর থেকে ফোন করে পুলিশের পরিচয় দিয়ে ‘কোন দল করা হয় বা কোন দল সমর্থন করি, ’ এমন প্রশ্ন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, খুলনা সিটিতে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা কাজ করেন, তাঁরা অনেক স্মার্ট। তাঁদের আগেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা এ ধরনের কাজ করতেই পারেন না।

খুলনা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন বলেন, পুলিশকে তাঁদের সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার দারিয়াপুর কিয়ামত উল্যাহ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম গতকাল বলেন, কয়েক দিন আগে পুলিশ বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষকের কাছে ফোন করেন। পুলিশের ফোন পেয়ে ওই শিক্ষক প্রথমে ভড়কে যান।

রংপুরের ছয়টি আসনে নির্বাচন কর্মকর্তাদের তালিকা ধরে তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নিরপেক্ষতা যাচাই করতে এমনটি করা হচ্ছে।

রংপুর জিলা স্কুল, কেরামতিয়া স্কুল, রংপুর উচ্চবিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি স্কুলের ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, পুলিশের এভাবে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। তাই দেনদরবার করছি, যাতে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব এড়ানো যায়।

কাউনিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক শাশ্বত ভট্টাচার্য বলেন, ‘পুলিশের পরিচয় দিয়ে নাম-ঠিকানাসহ আরও কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। এর আগে অনেক নির্বাচনে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা ছিলাম। কিন্তু এভাবে ফোন দেওয়া হয়নি।’

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে গত দুই দিনে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার ৩০ জন নির্বাচন কর্মকর্তার (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বা স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের ব্যাপারে পুলিশ খোঁজখবর করছে। তাঁদের অনেকেই জানান, সরাসরি পুলিশের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, কে কোন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী।

কেন পুলিশ তাঁদের ফোন করছে, জানতে চাইলে মন্তব্য করতে রাজি হননি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা। তবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান গতকাল মুঠোফোনে বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গোয়েন্দা পুলিশ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর হয়তো নিচ্ছে। তালিকাটি কীভাবে পেলেন, জানতে চাইলে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, কেউ স্বেচ্ছায় কারও বিষয়ে যাচাই-বাছাই করলে সেটি তাদের বিষয়। তাঁরা কাউকে তালিকা দেননি।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে জেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা চাওয়া হয়। সেই তালিকা থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠপর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দুই মাস আগে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। ওই সময় জেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা চাওয়া হয়। সেই প্রাথমিক তালিকা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এখন পুলিশের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তালিকা চূড়ান্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটা নির্বাচন কমিশনের চরম ব্যর্থতা। এই সময়ে সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সবকিছুই হবে তাদের হুকুমে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে, এমন খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তা না করে পুরো বিষয়টি প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াটা অন্যায়। তাদের এমন আচরণ অত্যন্ত হতাশাজনক। সূত্র : প্রথম আলো।



মন্তব্য চালু নেই