মেইন ম্যেনু

মাতৃভাষার গুরুত্ব এবং একুশে ফেব্রুয়ারী

আলহাজ্ব নূর হোসাইন মোল্লা : আদিকালে মানুষের ভাষা ছিলো একটি। হজরত আদম(আঃ) এর সন্তানদের বংশ বিস্তারের সাথে সাথে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিভিন্ন ভাষার সৃষ্টি হয়। আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাস করি আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাভাষা আমাদের নিকট অতিপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা এ তিনটি শব্দ আমাদের নিকট অতি প্রিয়। কারন, এ তিনটি শব্দের সাথে প্রত্যেক বাঙালীর এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে আমরা মায়ের আদর-যত্নে লালিত-পালিত হই। মায়ের আদর-যত্ন ছাড়া কোনো শিশুই বাঁচতে ও বড় হতে পারেনা। আমাদের জন্ম এবং বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সাথে মায়ের ভূমিকার কথা বিবেচনা করে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত। মায়ের সেবা যত্ন না করে কোনো মানুষই বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।” তাই মাতা-পিতার প্রতি সকলেরই শ্রদ্ধাশীল থাকা কর্তব্য।

মায়ের মতোই মাতৃভূমির সাথে আমাদের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মানুষ যে দেশে জন্ম গ্রহণ করে সে দেশের আলো বাতাসে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ জন্মভূমি থেকেই সংগ্রহ করে। জন্মভূমি আমাদের জীবনের সকল প্রয়োজন পূরণ করে। মায়ের-আদর যত্নের ঋন যেমন অপরিশোধ্য, তেমনি জন্মভূমির ঋনও অপরিশোধ্য। এজন্য রাসূল (সঃ) বলেছেন, “স্বদেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ।” নিজের দেশকে সেবা করে উন্নত করতে হবে। প্রয়োজনে নিজের দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জীবন দান করতে হবে।

মা আর মাতৃভূমির মতোই মাতৃভাষাও আমাদের নিকট অতি প্রিয়। মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষা ছাড়া কোনো মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বা লিখতে পারেনা। জন্মের পর মায়ের কোলে আমরা যে ভাষা শিখি সেটাই আমাদের মাতৃভাষা।

বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে ছয় হাজার ভাষা প্রচলিত আছে। তবে অনেক ব্যাকরণবিদই মনে করেন যে, সাড়ে তিন হাজারের অধিক ভাষা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে বাংলা একটি অন্যতম জীবন্ত ও বহুজন ব্যাবহৃত ভাষা। বর্তমানে প্রায় তিরিশ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীতে ৬ষ্ঠ বৃহত্তম মাতৃভাষা।

মহান অাল্লাহ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রতি সুবিচার ও সমমর্যাদা দান করেছেন।তিনি পবিত্র কুরঅানে সূরা ইব্রাহিমের ৪নং অায়াতে বলেছেন,”অামি প্রত্যেক নবী ও রাসূলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরন করেছি তাদের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যাখা করার জন্যে “।অামাদের রাসূল (সঃ) প্রত্যেক মানুষকে তাঁর মাতৃভাষাকে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা করার শিক্ষা দিয়েছেন। সাথে সাথে অন্য ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কথা বলেছেন।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়,১৯৪৭ সালের ১৪ অাগষ্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মহান অাল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সঃ) এর অাদেশ অমান্য করে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৫% মানুষের মাতৃভাষা বাংলার স্থলে ৮% কম মানুষের মাতৃভাষা তথা শাসকগোষ্ঠীর মাতৃভাষা জোরপূর্বক বাঙ্গালীদের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।প্রতিবাদে গর্জে ওঠে এদেশের ছাত্র-জনতা। শুরু হয় ভাষা অান্দোলন।বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠেছিল পাকিস্তান জন্মের পূর্বেই। প্রথমে সাংস্কৃতিক অান্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক অান্দোলনে পরিণত হয়।

ভারত বিভক্তির পূর্বে স্বাধীন ভারতের সাধারণ ভাষা কি হবে, তা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়।বিশাল ভারত বর্ষে ভাষার সংখ্যা তখন প্রায় ২০০। ইংরেজী তখন রাষ্ট্রভাষার অাসন দখল করে অাছে।তাই স্বাধীন ভারতে ইংরেজী ভাষার মর্যাদা কি হবে তা নিয়ে ১৯১৮ সালে প্রথম প্রশ্ন তোলেন এম.কে. গান্ধী। তাঁর প্রশ্নের জবাবে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,”ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে ভাবের অাদান-প্রদানের ক্ষেত্রে একমাত্র হিন্দীকেই রাষ্ট্রভাষা করা সম্ভব”(রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী,প্রভাত মুখোপাধ্যায়)।

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন,”শুধু ভারতবর্ষে নয়,সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ”।বাংলাভাষা ভারতবর্ষের সাধারণ ভাষা হতে পারে কিনা এ বিষয়ে ১৯২০ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে শান্তি নিকেতনে একসভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় ড.শহীদুল্লাহ, ড.তারাপুরওয়ালা, বিধুশেখর প্রমূখ ভাষাতত্ত্ববিদগণ উপস্থিত ছিলেন।সভায় ড.শহীদুল্লাহ বলেন,ইংরেজী, উর্দু ও হিন্দীর পর অাবশ্যক সংস্কার করলে বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করা যেতে পারে।ড.তারাপুরওয়ালা বলেন,হিন্দী ছাড়া অার কোন ভাষা ভারতের সাধারণ ভাষা হতে পারেনা।সভাপতির ভাষণে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,দাক্ষিনাত্যের কথা বাদ দিলে হিন্দী ভারতের সাধারণ ভাষা হলে কোন অসুবিধা হবেনা বলে মনে করেন।

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মোঃ সোলায়মান। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে ১৯২১ সালে লিখিত প্রস্তাব করেন টাংগাইলের নবাব সৈয়দ নওয়াব অালী চৌধুরী। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে লিখেন, ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে।

১৯৩৭ সালের ২৩ এপ্রিল মাওলানা অাকরাম খান অাজাদ পত্রিকায় “ভারতের রাষ্ট্রভাষা”শীর্ষক সম্পাদকীয়তে , হিন্দী ও উর্দুর পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি পেশ করেন।১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার ২ বছরের মধ্যে কোলকাতা ও ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় যথাক্রমে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি ও পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ। উভয় সংগঠনই এদেশে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পক্ষে অভিমত প্রদান করেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে অালীগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ড.জিয়াউদ্দিন অাহমদ পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে ড. শহীদুল্লাহ এর তীব্র প্রতিবাদ করে বলেন,পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হবে(দৈনিক অাজাদ, ২৯/০৭/১৯৪৭)।

রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যখন তুমূল বিতর্ক তখন কবি ফররুখ অাহম্মদ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাসিক সওগাত পত্রিকায় লিখেন যে, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হলে বাংলা ভাষাই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর ভাষা অান্দোলনের সূত্রপাত ঘটে “তমদ্দুন মজলিস” এর মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক অাবুল কাশেম এর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও ছাত্রের সহযোগিতায় এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।এটি ভাষা অান্দোলনের জনক।এ সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম(পরবর্তীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি),শামসুল অালম ও ফজলুর রহমান ভূইয়া।পরে জড়িত হন অাজিজ অাহমেদ, অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়া,নঈমুদ্দীন অাহমেদ,অধ্যাপক শাহেদ অালী,সানাউল্লাহ নুরী প্রমূখ।এ সংগঠনের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সম্বলিত ভাষা অান্দোলনের অালোড়ন সৃষ্টিকারী প্রথম পুস্তক “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু”।এ পুস্তকে অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, অাবুল মনসুর অাহমেদ ও অধ্যাপক অাবুল কাসেমের লেখা সন্নিবেশিত ছিল।এ পুস্তকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দুইটি বাংলা ও উর্দু।এছাড়া, এ সংগঠন বিভিন্ন সভা-সমিতি ও স্মারকলিপির মাধ্যমে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়।

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সিলেবাস থেকে বাংলা ভাষা বাদ দেওয়ায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির প্রশ্নটিতে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটার মত কাজ করে।এর প্রতিবাদে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর কয়েক শত বিশিষ্ট ব্যক্তি পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনকে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম দিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব গৃহীত হলে ঢাকার শিক্ষক-ছাত্র-জনতা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করতঃ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ এবং গণ অান্দোলন সৃষ্টির জন্যে তমুদ্দন মজলিস ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়াকে অাহবায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। এ সংগঠন সভা-সমিতি ও স্মারকলিপির মাধ্যমে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।

কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত গণ পরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী গণ পরিষদে উর্দু ও ইংরেজীর সাথে বাংলাকে গণ পরিষদের ভাষা ঘোষণা করার প্রস্তাব করেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত অালী খান তাঁর প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে তা গণ পরিষদে বাতিল হয়ে যায়।ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের প্রস্তাব গণ পরিষদে বাতিল হওয়ায় ঢাকায় তীব্র বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।দেশব্যাপী প্রবল অান্দোলন গড়ে তোলার জন্যে তমদ্দুন মজলিস ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ সংবাদপত্রে যৌথ বিবৃতি দেন।ছাত্র সমাজের অাহবানে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারী ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়।

ভাষা অান্দোলনকে তড়ান্বিত করার জন্যে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ বরণ্যে বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সম্প্রসারণ ও পূনর্গঠন করে শামসুল অালমকে অাহবায়ক মনোনীত করেন।পুনর্গঠিত পরিষদ ১১ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল অাহবান করেন।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়।ঢাকায় পিকিটিং এর প্রথম পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক ও কাজী গোলাম মাহাবুব গ্রেফতার হন। পরে গ্রেফতার হন অলি অাহাদ, অাব্দুল মালেক উকিল,অাব্দুল মতিন,মোঃ তোয়াহা,গোলাম অাজম সহ অারো অনেকে। সভা,শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিল করার সময় শেরে বাংলা একে ফজলুল হক সহ ৫০ জন অাহত হন।এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়।

অান্দোলনের তীব্রতা ও পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ অালী জিন্নাহ এর অাসন্ন ঢাকা সফরের কর্মসূচীর কারণে পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে ১৫ মার্চ ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্তানুসারে গ্রেফতারকৃতদের নিঃশর্তে মুক্তি দেওয়া হয় এবং সংবাদপত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।চুক্তির অন্যান্য শর্ত ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে গণ পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন, পূর্ব বাংলার শিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা,অান্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা,দেশের বিভিন্ন স্থানে জারি করা ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার এবং পুলিশের নির্যাতন তদন্ত করে মূখ্যমন্ত্রী একটি বিবৃতি প্রদান করবেন ইত্যাদি।

মোহাম্মদ জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় অাসেন এবং ২১ মার্চ বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষাধিক জনতার সামনে ও ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেন যে, “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অন্য কোন ভাষা নহে।ছাত্ররা এর প্রতিবাদ করেন।এদিন সন্ধ্যায় জিন্নাহ সাহেব রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি দলকে সাক্ষাৎ দান করেন।সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সম্বলিত স্বারকলিপি প্রদান করা হয়।প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক,কামরুদ্দিন অাহম্মদ, অধ্যাপক অাবুল কাসেম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম,মোঃ তোয়াহা,অাজিজ অাহম্মদ, নঈমুদ্দিন অাহম্মদ,তাজউদ্দিন অাহমেদ,লিলি খান প্রমূখ। স্বারকলিপি পাঠকালে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।রাষ্ট্রভাষা নিয়ে অালোচনার শেষ পর্যায়ে জিন্নাহ সাহেব বলেন,”My boy,two men may differ on one point. Let us differ respectfully.You can go with your point with constitutional way. Any unconstitutional movement will crush ruthlessly”.২৬ মার্চ বিকেলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।এরপর তিনি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে কোন কথা বলেননি।

১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ অালী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করলে খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল এবং নূরুল অামীন পূর্ব বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত হন।জিন্নাহ এর মৃত্যুর পর কিছু দিনের জন্যে ভাষা অান্দোলন স্থগিত থাকলেও পূর্ব বাংলার অর্থনীতি,রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অান্দোলন সংঘটিত হয়।

১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত অালী খান সস্ত্রীক ঢাকায় অাসেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ২৭ নভেম্বর তাঁকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও পূর্ব বঙ্গের অন্যান্য দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করেন।প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিটি কৌশলে এড়িয়ে যান।স্বারকলিপি প্রনয়ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ইংরেজী জানা ছাত্রনেতা বরিশালের অাব্দুর রহমান চৌধুরী(পরবর্তীতে হাই কোর্টের বিচারপতি)অার এটি পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক গোলাম অাজম।

সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নানা কৌশল গ্রহণ করলে এবং রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ অনেকটা নিষ্ক্রিয় হলে ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাবনার অাব্দুল মতিনকে অাহবায়ক করে গঠন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।এ পরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও গণ পরিষদের স্পীকার সহ গণ পরিষদের প্রত্যেক সদস্যর নিকট স্মারকলিপি প্রেরন করেন।এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গ সন্তান খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে ঘোষণা করেন যে,পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।এর প্রতিবাদে শুরু হয় অান্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারী ঢাকায় সভা-সমাবেশ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল অাহবান করেন।বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবি করে সভা ও মিছিল হয়।এদিন বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরীতে অাওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা অাব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দলের নেতাদের সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় বরিশালের কাজী গোলাম মাহাবুবকে অাহবায়ক করে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ গঠিত হয়।এ পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারী দেশব্যাপী হরতাল সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অাহবান করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী নূরুল অামীন ১ মাসের জন্যে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ করেন।এ সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মঠবাড়িয়ার মহিউদ্দিন অাহমেদ কারাগার থেকে ভাষা অান্দোলনকে সমর্থন জানান এবং ১৬ ফেব্রুয়ারী থেকে অনশন করার ঘোষণা দেন।উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু এবং মহিউদ্দিন অাহমেদ জননিরাপত্তা অাইনে বন্দী হয়ে দীর্ঘদিন যাবত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।ছাত্ররা ১৪৪ ধারা মেনে নেন নি।১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারী বেলা ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অামতলায় (বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বর) সমবেত হন।ছাত্ররা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা চাই স্লোগান দিয়ে পূর্ব বঙ্গ অাইন পরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে পুলিশ গুলি চালায়।গুলিতে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দিন , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এম.এ. ক্লাসের ছাত্র সালাহউদ্দিন ,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এম.এ.ক্লাসের ছাত্র অাবুল বরকত,ময়মনসিংহের গফরগায়ের অাব্দুল জব্বার ও অারো অনেকে নিহত হন।গুরুতর অাহত হন শিল্প মন্ত্রনালয়ের কর্মচারি ও ফেনী জেলার অাব্দুস ছালাম সহ ১৭ জন। গ্রেফতার হন ৬২ জন।উল্লেখ্য,অাব্দুস ছালাম ৭ এপ্রিল মারা যান।

২১ ফেব্রুয়ারী পূর্ব বাংলার অাইন পরিষদের অধিবেশন চলছিল।এ হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানান কংগ্রেস দলীয় সদস্যগণ।মুসলিম লীগের সদস্যগণের মধ্যে পাবনার মাওলারা অাব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ,ঢাকার অানোয়ারা খাতুন, রংপুরের খয়রাত হোসেন, কুমিল্লার অালী অাহমেদ,কুষ্টিয়ার শামসুদ্দিন অাহমেদ এ হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং অধিবেশন মুলতবি রাখার প্রস্তাব করেন।প্রস্তাব গৃহীত না হলে তাঁরা অধিবেশন বর্জন করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।

২১ ফেব্রুয়ারী হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ২২-২৪ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়।২২ ফেব্রুয়ারী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গনে শহীদদের গায়েবী জানাজায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। জানাজা শেষে শোক মিছিল বের হলে হাই কোর্টের সামনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ লাঠিচার্জ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করলে তাঁরা নাজিমুদ্দিন রোডে একত্রিত হয়। এরপর মিছিলকারীরা বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ কালে পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করলে ঢাকা হাইকোর্টের কেরানী শফিউর রহমান, রিক্সা চালক ঢাকার অাব্দুল অাউয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ এবং তাঁতী বাজারের সেরাজউদ্দিন প্রমূখ নিহত হন।অাহত হয় ১২৫ জন এবং গ্রেফতার হন ৩০ জন।এ হত্যাকান্ডে জনতা উত্তেজিত হয়ে মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসে অগ্নিসংযোগ করে।এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে দৈনিক অাজাদ পত্রিকার সম্পাদক অাবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মাওলানা অাব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ পূর্ব বাংলা অাইন পরিষদের সদস্য পদে ইস্তেফা দেন।

২১-২২ ফেব্রুয়ারীর ঘটনা জেলা, মহকুমা ও থানা শহর অতিক্রম করে গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। নারায়নগঞ্জ, মানিকগঞ্জ,ময়মনসিংহ,গফরগাও,কিশোরগঞ্জ,ফরিদপুর, বরিশাল,গোপালগঞ্জ,পিরোজপুর,মঠবাড়িয়া,চট্রগ্রাম, ফেনী,নোয়াখালী,কুমিল্লা,ব্রাম্মনবাড়িয়া,রাজশাহী,বগুড়া,রংপুর,দিনাজপুর,যশোর,কুষ্টিয়া,খুলনা,সাতক্ষীরা, সিলেট,সুনামগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালের ভাষা অান্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে সুদুর প্রসারী প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটি ছিল বাঙ্গালীর প্রথম বিদ্রোহ।অান্দোলন রাজনীতি,অর্থনীতি,সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।এ অান্দোলন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার প্রেরনা যুগিয়েছে।১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারীকে অান্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় ভাষা অান্দোলনের গুরুত্ব এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।বাংলা এখন শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা নয়,পশ্চিম অাফ্রিকার সিয়েরালিয়নের ২য় রাষ্ট্রভাষা।বাংলাকে জাতিসংঘের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি গণকে সবিনয় অনুরোধ করছি।এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিনীতভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : কলামিস্ট ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।


(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। আওয়ার নিউজ বিডি’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


 



মন্তব্য চালু নেই