মেইন ম্যেনু

যে ১০ কারণে দিল্লির মসনদে মোদী

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন (২০১৯)ভারতের রাজনীতির জন্য এক অনন্য উপলব্ধির নির্বাচন। এযাবৎ কালের রাজনীতির গতানুগতিক ধারায় এই নির্বাচনের ফলাফলকে দেখতে চাইলে এই ফলাফলের যথার্থ কারণ অনুধাবন করা সম্ভব হবে না।

কেননা রাজনীতিকে দেখার আমাদের যুক্তি আসলে কংগ্রেস নির্ধারিত যুক্তি, উত্তর ভারতকে বিশ্লেষণ করার যুক্তি মণ্ডলায়িত যুক্তি, দক্ষিণ ভারতকে দেখা দ্রাবিড় রাজনীতি ও ভাষা বিচ্ছিন্নতার যুক্তি, পূর্ব ভারতকে দেখা দেশের মধ্যে অন্য দেশ এবং বামপন্থী বৌদ্ধিক অনুশীলনের যুক্তি।

এই সব নির্দিষ্ট ন্যারেটিভের ফাঁদে পড়ে দেশটা আর দেশ থাকে না-আলাদা আলাদা বেশ কয়েকটা দেশে পরিণত হয়। কংগ্রেস রাজনীতির আঞ্চলিক মনসবদারিতার মৌল সূত্র এই ব্যাখ্যায় দাঁড়িয়ে আছে, তারা বিভিন্ন স্থানীয় মনসবদারদের নেতা রূপে স্বীকৃতি দিয়ে একটি কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা তৈরি করেছিল যার ভাঙ্গন ধরলেও বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি।

লক্ষ্যনীয় বিষয় ঠিক এইখানেই পরিবর্তন এসেছে। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের বিজেপি রাজনীতির এই প্রচলিত ন্যারেটিভটি পাল্টে দিয়েছেন। দলীয় ভাবে বিজেপি পরিচালনার পূর্ববর্তী সঙ্ঘ নিয়ন্ত্রিত ভাবটি তো কমেছেই সেই সাথে রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু শিফট অর্থাৎ বদল হয়েছে।

জাতিয়তাবাদ, সেনার শৌর্য, সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সংখ্যালঘু তোষণের বিরোধিতা এবং দায়িত্বশীল একক নেতৃত্ব ইত্যাদি এই লোকসভা নির্বাচনের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। অথচ আপনার মনে থাকবে বিগত সাধারণ নির্বাচনে ইস্যু ছিল দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, কর্মহীনতা, দেশের বিকাশ হার স্লথ হয়ে যাওয়া, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং রাজধানী সহ দেশে নারী নিরাপত্তা।

কিন্তু এই ইস্যু ও ননইস্যুদের ইস্যু হয়ে ওঠার বিতর্কের বাইরে একটা জিনিস আমরা লক্ষ্য করছিনা তা হল প্রায় পাঁচ দশক পর দেশে একটি সম্পূর্ণ প্রো-ইনকামবেন্সি ভোট দেখা গেল। ইন্দিরা জমানার পর আবার একটি সরকার সম্পূর্ণ নিজের রাজনৈতিক যোগ্যতায় পুনরায় পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। বস্তুতঃ বিজেপি তথা মোদি-শাহ জুটি মানুষকে বোঝাতে পেরেছে দেশ একটি শক্তিশালী নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে যাকে দুহাত তুলে সমর্থন করা যায়।

আপাতভাবে আমার মনে হয়েছে এই জনমত একটি ইতিবাচক সরকারপন্থী মত। স্বাভাবিক ভাবেই যেকোনো রাজনৈতিক ফলাফলের পিছনে একাধিক কারণ থাকে। উনিশের এই জনাদেশের পিছনেও সেই কারণসমূহ আছে, খুব সংক্ষেপে আমি দশটি কারণ চিহ্নিত করলাম-

১) সপ্তদশ লোকসভার জনাদেশ মূলতঃ একটি সরকারপন্থী বা প্রো-ইনকামবেন্সি রায়। এই রায়ে বিগত পাঁচ বছরে এই সরকারের নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচীর প্রতি স্পষ্ট সমর্থন ঘোষিত হয়েছে। নোটবন্দী, জিএসটি, উজ্জ্বলা জ্যোতি যোজনা, জনধন প্রকল্প, কেন্দ্রীয় সরকারের সড়ক নির্মাণ, রেলের আধুনিকীকরণ প্রকল্প, সেনার ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন, দেশব্যাপী শৌচাগার প্রকল্প, আয়ুষ্মান ভারত, অটল পেনশন যোজনা, তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিল, ডিজিট্যাল ইন্ডিয়া এবং সন্ত্রাসবাদের উপর তিনবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য – ইত্যাদি বিষয় মানুষের মনে যথেষ্ট দাগ কেটেছে।

বিরোধীরা যতই এই প্রকল্পগুলিকে জুমলেবাজি বলে খারিজ করুক, নির্বাচনের ফল প্রমাণ দিচ্ছে মানুষের কাছে এই সিদ্ধান্ত ও প্রকল্পগুলির লাভ এসে পৌঁছেছে। সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ও উত্তরপ্রদেশে মহাজোটের হাল প্রমাণ করে রাজনৈতিক সমীকরণের চেয়ে সরকারী প্রকল্প ও কর্মসূচীর জোর অনেক বেশী।

২) এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদ অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছিল। আমি রাজনীতি ও নির্বাচনে জাতীয়তাবাদের ব্যবহারের সমালোচনার বিশেষ পক্ষে নই, কারণ জাতীয়তাবাদ এমন একটি বিষয় যা বিগত একশ বছর ধরে পৃথিবীর রাজনীতিকে প্রভাবিত করে এসেছে। এই মুহুর্তে দিকে দিকে বৈশ্বিকীকরণের ফলে সঙ্কটে থাকা সভ্যতা ও সংস্কৃতিগুলি আবার জাতীয়তাবাদের দিকে পুনরায় হাঁটতে শুরু করেছে।

এখানে মনে রাখার বিষয় যদিও ভারতে বিশ্বায়নের প্রতিক্রিয়ায় নয় তবুও ভারতের রাজনৈতিক সত্ত্বা ও ধর্মীয় পরিচিতির উপর একটা আঘাতের আশঙ্কা শাসক দলের তরফে বারবার প্রচার করা হয়েছে যা জনমানসে গ্রাহ্য হয়েছে।

রাষ্ট্ররক্ষার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সাড়া পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু তাকে মানুষের মনের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া কঠিন ছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার দল এই কাজে সফল।

৩) সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মোদী সরকারের সক্রিয়, আপসহীন মনোভাব জনগনের মনে একটা নিরাপত্তাবোধ এবং যুবসমাজের কাছে একটা ইতিবাচক, সক্রিয় সরকারের ভূমিকা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

চিরকালীন গান্ধীবাদী আদর্শে বিশ্বাসী এই দেশে অযাচিত আঘাতের জবাবে পাল্টা মারের প্রয়োজনীয়তা মানুষ স্বীকার করে। মুম্বাই হামলার মতো বীভৎসও হামলা তথা সোজা কথায় চাপিয়ে দেওয়া সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের পরিণতিতে শান্তির কথা বলা যে জনমানসে গ্রহণীয় নয় তা বালাকোট বায়ুসেনা অভিযানের পর জনগনের বিপুল উল্লাস এবং সমর্থনের মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যায়।

৪) আর্থিক বিকাশ ও সংস্কারের প্রশ্নে জনগন মোদী ক্যাবিনেটকে সম্ভবত আরও সময় দিতে চেয়েছে। আচ্ছে দিন, কালো টাকা ফেরানো এবং আর্থিক বিকাশের প্রশ্নে দেশ ইতিপূর্বেও মনমোহন সিং সরকারকে সময় দিয়েছিল।

বস্তুতঃ আমরা যতই নোটবন্দীর ব্যর্থতার কথা বলিনা কেন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন সেদিন সরকার কালো টাকার উপর ব্যবস্থা নিতে আন্তরিক ছিল। আপনারা যারা সাধারণ মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেশেন তারা জানবেন আজও মানুষ সেই পর্বের স্মৃতি মনে রেখে নগদে অর্থ সঞ্চয় বা গচ্ছিত করা থেকে বিরত থাকেন।

এছাড়াও জি এস টি ইত্যাদি সংস্কারের মাধ্যমে সাময়িক অসুবিধে হলেও ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ব্যাপক সরলীকরণ হয়েছে। প্রাথমিক রিভার্স এফেক্ট চার রাজ্যের বিধানসভাতে দেখা গিয়েছিল কিন্তু জিএসটির মাধ্যমে বিপুল করফাকি ও মধ্যসত্ত্ব ভোগীদের ভূমিকা হ্রাস ছোট ব্যবসায়ীদের খুশি করেছে। লক্ষ্য করবেন ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে কম ফলে বড় ব্যবসায়ীদের করের নামে গোপন মুনাফা করার ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় তারা খুশি হয়েছিলেন।

৫) ডিজিট্যাল ইন্ডিয়ার মতো প্রকল্প যুব সমাজকে আকর্ষণ করেছে। বিগত পাঁচ বছরে প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং পরিষেবা ব্যবহারে খরচ কমা তথ্য সংগ্রহ এবং যোগাযোগকে সহজ করে তুলেছে। স্বাভবিক ভাবেই এই লাভ শাসকদলের ঘরে উঠেছে।

৬) নরেন্দ্র মোদীর আমলে বিশ্বমঞ্চে ভারতের দরাদরির সামর্থ্য বেড়েছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সম্মান ও ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রচারের কাজে দক্ষ প্রধানমন্ত্রী এই সাফল্যের রাজনৈতিক ফসল আপন ঘরে তুলেছেন।

৭) এই লোকসভা নির্বাচনে মেরুকরণের রাজনীতি বিরাট জায়গা জুড়ে ছিল। সরকারী প্রকল্প রূপায়নে মানুষের হয়রানি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মোদী সরকারের ব্যর্থতার মতো বিষয়গুলো সুলভ থাকা সত্ত্বেও বিরোধীরা তা নিয়ে প্রচারে ঢেউ তুলতে পারেনি। কিন্তু বিজেপি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মরুকরণের সুক্ষ্ম আবেগে হাওয়া দিতে সফল হয়েছে মানতেই হবে।

৮) দৃঢ় ও স্থায়ী সরকার গঠনের প্রশ্নে বিজেপি বিরোধী দুই পক্ষকে দশ গোল দিয়েছে। যেখানে মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি তথা এনডিএ সরকার গড়ার স্পষ্ট দাবী দিয়ে হাজির সেখানে ইউপিএতে রাহুলে গান্ধীর দ্বিধান্বিত নেতৃত্ব এবং ইউনাইটেড ফ্রন্টে ১৪জন ক্ষমতালোভী প্রধানমন্ত্রীপদের দাবিদারের জটিল ঘোঁট- মানুষ স্পষ্ট ও স্থায়ী সরকারে আস্থা রাখা উচিত বলে মনে করেছে।

৯) বিজেপির প্রচার, বিজ্ঞাপন, নির্বাচনী কৌশল, পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে আসন বাড়ানোর রাজনৈতিক ছক, বিরোধী নেতৃত্বের অপারগতা তুলে ধরা, কর্পোরেটের সমর্থন লাভ, মিডিয়াকে সঠিক ভাবে ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ার দুর্দান্ত প্রয়োগ, প্রচারে রাজনৈতিক ভিত্তিহীন নেতাদের গুরুত্ব দিয়ে কংগ্রেসকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া।

এছাড়াও ষোলটি রাজ্য সরকারে থাকার সুবিধে লাভ এবং সর্বোপরি অমিত শাহের ক্ষুরধার রাজনৈতিক মস্তিষ্ক বিজেপিকে শুরু থেকেই লড়াইয়ে এগিয়ে রেখেছিল – এই অবস্থায় বিরোধীদের নরেন্দ্র মোদীকে সরাসরি ব্যক্তি আক্রমণ ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’র মতো স্লোগান বুমেরাং হয়েছে।

জনপ্রিয়তায় নরেন্দ্র মোদী এখনও দেশে বিপুলভাবে এগিয়ে এবং তার ভাবমূর্তিও স্বচ্ছ – তাঁকে ব্যক্তি আক্রমণ সুপ্রিম কোর্ট থেকে জনতার কোর্ট সর্বত্র বিরোধীদের ব্যাক ফায়ার করেছে।

১০) বিগত সাত বছরে (২০১২ গুজরাট বিধানসভা থেকে) জনগনের মধ্যে জাতীয় নেতা রূপে একটি ব্যক্তির ভাবমূর্তি নির্মিত হয়েছে। ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদী অসম্ভব ভালো বক্তা, ম্যানেজমেন্ট গুরু, উপস্থাপনে পটু, মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তিতে স্বচ্ছন্দ, জনগনের সাথে দূরত্ব রেখে যোগাযোগে পটু, ভাবমূর্তি সচেতন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক মিথ নির্মাণে পারদর্শী এবং উদ্ভাবনী রাজনেতা। তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা ইস্যু, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দমনে সিদ্ধহস্ত।

এহেন শাসক মোদী বিগত পাঁচ বছরে বিরোধীদের আশঙ্কা করা তথাকথিত গৈরিকিকরণের পথে হাঁটেননি। তিনি দল, সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মোদীকরণের পথে হেঁটেছেন।

তাই ৭৮ সালের পর দেশে আরেকবার একটি ব্যক্তি কেন্দ্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আকারে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন সংঘটিত হল। অথ আগামী পাঁচ বছরে অনিবার্য ভাবেই প্রধানমন্ত্রীপদের আমরা রাষ্ট্রপতিকরণ দেখতে চলেছি।

আপাতভাবে এই প্রবণতা বৃহত্তর অর্থে গনতন্ত্রের পথে বিপদ মনে হলেও ভারতবর্ষের মতো দেশে বহুদিন ধরে জমে থাকা কিছু জটিল ও গুপ্ত রোগ নিরাময়ের জন্য বেশ দরকারি। জনগন আশা রেখেছেন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক প্রিয় প্রধানমন্ত্রী এই রোগ নিরাময় করে দেশকে মুক্তি দেবেন।

কিন্তু তিনি পারবেন কিনা সময় বলবে… আপাতত জনগণের রায়কে সম্মান করুন। সরকারকে সমর্থন ও সমালোচনা জারি রাখুন।

(লিখেছেন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নন্দন সাহা)



মন্তব্য চালু নেই