মেইন ম্যেনু

রামপাল নিয়ে আপত্তি থেকে ‘সরেছে’ ইউনেস্কো

বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আপত্তি থেকে জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো সরে এসেছে বলে দাবি করেছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকালে মন্ত্রণালয় থেকে এই বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে জানানো হয়, পোল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম অধিবেশন চলছে, সেখানেই এই ঘোষণা এসেছে।

২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ), বাস্তবায়ন চুক্তি (আইএ), যৌথ উদ্যোগ চুক্তির সম্পূরক, এসজেভিএ সই হয়। পরে গত বছরের ১২ জুন বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) এবং ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেডের (বিএইচইএল) মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট কনস্ট্রাকশন-ইপিসির (টার্নকি) মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকার চুক্তি হয়।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে এই চুক্তি সই অনুষ্ঠানে জানানো হয়।

তবে ভারতের সঙ্গে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র করা নিয়ে তীব্র আপত্তি উঠে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে। পরে বিএনপি-জামায়াত জোট এবং সমমনা দলগুলোও একই অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র বিশ্ব ঐহিত্যের অংশ সুন্দরবন ধ্বংস করবে।

বাগেরহাটের রামপালে যে স্থানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি হচ্ছে সেটি সুন্দরবনের প্রান্তসীমা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং বনের বিশ্ব ঐতিহহ্যের অংশ থেকে ৬৭ কিলোমিটার দূরে।

পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে গত অক্টোবরে ইউনেস্কো সরকারকে এক চিঠি দিয়ে এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানায়। পরে সরকার অবশ্য তার বক্তব্য ইউনেস্কোর কাছে তুলে ধরে।

পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উদ্বেগকে অমূলক আখ্যা দিয়ে সরকার বলছে, সেখানে সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি সুন্দরবনের পরিবেশের কোনো ক্ষতি করবে না। আর যেসব ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, তার প্রতিটির বিষয়েই ব্যবস্থা নিয়েই প্রকল্পটি এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

তবে সরকারের এই বক্তব্য আমলে নিচ্ছেন না বিরোধীরা। তাদের যুক্তির একটি অনুষঙ্গ ছিল ইউনেস্কোর আপত্তি।

রামপালের কট্টরবিরোধীদের একজন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। ইউনেস্কোর সবশেষ অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমি এই বিষয়টি নিয়ে জানি না। আর তাই এ নিয়ে এখন কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

জাতীয় তেল-গ্যাস ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, সরকার দেশের মানুষের টাকা খরচ করে ইউনেস্কোতে লবিং করেছে। আর সংস্থাটি এই লবিং এর কাছেই আত্মসমর্পণ করেছে।

ইউনেস্কোর এই অবস্থানের কারণে রামপাল বাতিলের দাবিতে আগামী ১১ জুলাই দেশব্যাপী সমাবেশ চলবে বলেও জানান আনু মুহম্মদ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়েছে

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি প্রস্তাবিত স্থানে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন সংক্রান্ত আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যসমূহের তালিকাভুক্তি হওয়া থেকেও সুন্দরবনকে বাদ দিয়েছে। পোল্যান্ডের ক্রাকো বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪১তম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ ও জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বাংলাদেশের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে সুন্দরবনের জীব-বিচিত্রয় রক্ষার উপর জোর দিয়ে সাম্প্রতিককালে ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারকে তাগিদ দেয় ইউনেস্কো। রামপালে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের বিষয়কে কেন্দ্র করে সুন্দরবনের ভেতরে পর্যাপ্ত অনুকূল পানি সরবরাহ এবং সুন্দরবনের নানা সম্পদ চুরির বিষয়টি আলোচনায় আনে ইউনেস্কো। এর আগে ২০১৬ সালে সুন্দরবনের উপর রামপাল প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষক দল প্রকল্পটি অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করেছিল।

দীর্ঘ আলোচনার পর, প্রকল্পের নানা পরিবেশগত প্রভাব যতটুকু সম্ভব কমিয়ে এনে বর্তমান প্রস্তাবিত স্থানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দেয়। বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সভায় সুন্দরবন রক্ষায় ২০১৬ সাল থেকে গৃহীত সরকারের নানাবিধ পদক্ষেপ এর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। কমিটির অনুরোধে সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে একটি কৌশলগত পরিবেশগত সমীক্ষা পরিচালনা বিষয়ে সরকারপক্ষ একমত হয়।

ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর। সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য এবং বিপুল সম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার তার পূর্ণ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে ইউনেস্কোকে আশ্বস্ত করেন তৌফিক।’

অন্যান্যদের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব আহমেদ কায়কাউস, ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রাইসুল আলম, পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালিদ মাহমুদ, বিদ্যুৎ সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সুলতান আহমেদ বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে ইউনেস্কোর এই সভায় অংশ নিয়েছেন।

বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত প্রশস্ত ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।






মন্তব্য চালু নেই