মেইন ম্যেনু

১০ বছরে ব্যাংক খাতে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাট!

রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে একধরনের দুরবস্থা বিরাজ করছে। ইতিমধ্যে খেলাপি ঋণ এক লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠন, ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন যোগ করলে খেলাপির প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ব্যাংকিং কমিশন গঠনের দাবি এবং তা মেনে নিয়ে আবার সে সিদ্ধান্ত থেকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরে যাওয়ার পর এবার দেশের ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র চিহ্নিত করতে নাগরিক কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। জাতীয় নির্বাচনের পরই এ কমিটি গঠন করা হবে। এ নাগরিক কমিটি ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরবে।

শনিবার সকালে রাজধানীর খাজানা গার্ডেন রেস্টুরেন্টে ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে আমরা কী করব’ শীর্ষক এক সংলাপে এ তথ্য জানান সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি জানান, নাগরিক কমিশন ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরবে। ব্যাংক খাত নিয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হবে। সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনসহ বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরবে এ কমিশন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংক খাত অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এ হৃৎপিণ্ড সচল রাখতে সবাইকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি বলেন, অনেকে বলছেন কঠিন সময় যাচ্ছে। আসলে কঠিন সময়ে কঠিন সমাধান খুঁজতে হবে। ব্যাংকিং খাতে একসময় নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটত। এখন ব্যত্যয় থেকে বেরিয়ে অপরাধ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তার মতে, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে নিষ্কৃতি দিতে হবে। সব রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার ঘোষণা দিতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। সংলাপে দেশের আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, সাবেক অর্থমন্ত্রী, গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকার ও আমলারা নানা সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের পরামর্শ দেন। তারা সবাই ব্যাংক খাত ঠিক রাখতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা আশা করেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী সুবিধা পায়, এমনকি তারা একের পর এক ব্যাংক অধিগ্রহণ করলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা নীরব। একই চিত্র ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। যে অপরাধে একজন গ্রাহক শাস্তি পাচ্ছেন, একই অপরাধে অপর প্রভাবশালী গ্রাহক ছাড় পাচ্ছেন। এ ধরনের দ্বৈতনীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের থাকতে পারে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সব গ্রাহকের মর্যাদা সমান। সংলাপে মূল প্রবন্ধে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরের সূত্র ধরে বলেন, গত ১০ বছরে ব্যাংক খাতে ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলিয়ে ১৪টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসব অর্থ খোয়া গেছে।

এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ অনুমোদন, ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যাংকারদের পেশাদারিত্বের অভাবে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় এখন দেশের ব্যাংকিং খাত। একইসঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের অনুমোদন, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যুক্ত করা, পরিচালকদের দুর্বৃত্তায়ন, দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও সবশেষে ঋণ দেয়ায় সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ভঙ্গুর হচ্ছে দেশের ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্তিশালীকরণ, নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিচারিক ব্যবস্থাসহ জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের উন্নতি হয়েছে। তবে ব্যাংক খাতে উন্নয়নের বদলে অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে নিয়মনীতি লংঘনের খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে এ খাত। অথচ ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। পুরো অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার করে এখান থেকে। ব্যাংকিং খাত ছাড়া মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া যাবে না। ব্যাংক খাতকে ভালো অবস্থায় নিতে চাইলে রাজনৈতি সদিচ্ছা দরকার। এ জন্য ভালো লোককে নিয়োগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত হলো আস্থার বিষয়। দেশে এই প্রথম সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে আমানত নিরাপদ থাকবে। আগে কখনো এ রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। সবাই মনে করত সরকার আছে, যে কোনো ব্যাংকেই টাকা রাখলে ফেরত পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর এ রকম প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আস্থা নড়বড়ে হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে।

বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংকিং খাত থেকে নিয়ম ভেঙে লুটপাট করে সব নিয়ে যাচ্ছে। বলা হলো ঋণখেলাপি হলে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে না। কিছু ক্ষেত্রে এটা কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। যারা প্রভাবশালী তাদের ক্ষেত্রে এমন সুযোগ দেয়া হচ্ছে যে নতুন ঋণ নিয়ে আগের খেলাপি ঋণ পরিশোধ করছে। এখন সবার প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতা এবং অনৈতিক অর্থ লাভের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করবো না। আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসবেন তারা ব্যাংকিং খাতকে লুটপাটের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেবেন না।

ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সব সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অনৈতিকভাবে ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়ে পার পেয়ে যান। তবে সব খেলাপি ঋণ রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের তা নয়। কোনো কারণে ১০ ভাগ লোক যদি রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ খেলাপি হন, অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেন তাহলে বাকি অংশের নিয়ন্ত্রণ করার মতো নৈতিক মনোবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার থাকে না। এর আগে আশির দশকে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ঠিক না করেই ব্যাংক দেয়া হয়। পরে দেখা গেলো আমানতের ৩০ শতাংশের মতো তারা নিয়ে নিয়েছেন। এরপর অনেক গড়-খুটো পুড়িয়ে বিভিন্ন বিধান করে ৬০ জনের মতো উদ্যোক্তা পরিচালককে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর ১০০ উদ্যোক্তার ঋণ ফেরত দিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে পরবর্তীতে উদ্যোক্তা পরিচালকরা নিজেদের ব্যাংক থেকে যত টুকু ঋণ নেয়ার সীমা তাও আর নিচ্ছিলেন না। এখন আবার পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণক সংস্থার ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পেছনের দিকে যাচ্ছি। এটা দুঃখজনক।

তিনি বলেন, দেশের কয়েকটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়েছিল। এখন বিভিন্ন ব্যাংক অধিগ্রহণ হচ্ছে। এটিও হচ্ছে কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই। একচেটিয়া অধিগ্রহণ শুরু হলে, একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের হাতে অনেক ব্যাংক চলে গেলে পুরো অর্থনীতিতে জিম্মিদশা নেমে পড়বে। ব্যাংকগুলো আমানতের জিম্মাদার। ফলে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, অধিগ্রহণ কীভাবে হবে তা অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিতভাবে হতে হবে। পুরো অর্থনীতি একটি গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি করা হবে একটা বড় ভুল। নতুনভাবে ভুল করা ঠিক হবে না। ব্যাংকিং খাতকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়নি, তবে অনিয়ম ও লুটপাটে আক্রান্ত। কেউ টাকা মেরে দিলে সেখানে বিকৃত প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এটি খারাপ লক্ষণ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে ব্যাংকিং খাতকে রক্ষা করা যাবে না। ব্যাংকিং খাতের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত হয় রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পর্ষদ সভায়। রাজনৈতিক পরিচয় যে কোনো ব্যক্তির থাকতে পারে। সেটা যেন ব্যাংকের বোর্ড সভায় প্রভাব না ফেলে, সেদিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের গাটস থাকতে হবে। ‘না’ করার সাহস থাকতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর তাই করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এ যাবৎকালের মধ্যে ব্যাংকিং সেক্টরের অবস্থা খুবই নাজুক। ১০ শতাংশ মূলধন জোগান দিয়ে উদ্যোক্তা পরিচালকরাই সব। কিন্তু ৯০ শতাংশ মূলধন জোগান দিয়ে আমানতকারীদের পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই। সরকারের ধনী মালিক শ্রেণির স্বার্থ দেখা হচ্ছে। বঞ্চিত আমানতকারীরা।

তিনি প্রশ্ন করেন-সরকার কি আইনের উর্ধ্বে? সে কারণেই কি সরকারি ব্যাংকে ৩০ শতাংশের ওপরে? বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ একসময় ২ শতাংশ ছিল। লুটপাট অনিয়মের পর তা ৮০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ব্যাংক থেকে ভদ্র লোকজনকে সরিয়ে লুটপাটকারীদের দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংকের মালিকদের জমিদার বানানো হচ্ছে। গণতন্ত্র থেকে জমিদারতন্ত্রে যাওয়া যাবে না। এক পরিবারের চারজন পরিচালক থেকে দুজনে নামিয়ে আনতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ যেন ভূমিকায় যেতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে

বিশ্বব্যাংকের ঢাকার অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং খাতে ২২ হাজার কোটি টাকার ব্লেডিং হচ্ছে। এটা থামাতে হবে।

বিএনপি নেতা তাবিত আউয়াল বলেন, ব্যাংকিং খাতে ঋণখেলাপি কাউকে নির্বাচনে মননোয়ন দেয়া যাবে না। সে যে দলেরই হোক।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিজাম চৌধুরী বলেন, সব কিছুতে নেতিবাচক ধারণা পরিহার করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে অনেক কিছু হচ্ছে।



মন্তব্য চালু নেই