রাত পোহালেই ৭৮ উপজেলায় ভোট : অনিয়ম হলেই বন্ধ

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট রোববার (১০ মার্চ)। এ পর্যায়ে ভোট হবে ৮২ উপজেলায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সব দলের অংশগ্রহণ না থাকায় এই ভোটে তেমন উৎসবের আমেজ নেই। তাই প্রাণ হারাতে বসেছে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। একপেশে এই নির্বাচনের ফলে উপজেলা পরিষদব্যবস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। স্বশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূলের গণতন্ত্র অকার্যকর হয়ে যাবে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসঙ্কেত।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সাবেক তত্ত্বাধায়ক সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিল। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২০০৭ সালে সুপারিশ করে, গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালী করতে একটি সমন্বিত আইন দরকার। কিন্তু অদ্যাবধি সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ চলছে। উপজেলা চেয়ারম্যানদের ক্ষমতা নেই বলে তারা বিভিন্ন সময় আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন।

প্রথম দফার ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও, দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দফায় কেন্দ্র দখল, বোমা হামলা, জাল ভোট, কারচুপি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও ব্যাপক সহিংসতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এতে ২৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আহত হন পাঁচ শতাধিক বেশি মানুষ।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন উপলক্ষে চার বিভাগের এসব উপজেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার (৮ মার্চ) মধ্যরাতে শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। ভোটগ্রহণে ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

এদিকে উপজেলা নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম দেখা গেলে, তাৎক্ষণিকভাবে সেই কেন্দ্রের নির্বাচন বন্ধ করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মোখলেছুর রহমান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এবার অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকায় উপজেলা নির্বাচন জৌলুস হারাতে বসেছে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা শুক্রবার (৮ মার্চ) বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নির্বাচনকে অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। নির্বাচন সার্বিকভাবে অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না, এই সত্যকে মেনে নিয়েই নির্বাচন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের মতো স্থানীয় পর্যায়েও গণতন্ত্র একটি সুনির্দিষ্ট অবকাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির জন্য স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম। দারিদ্র্য নির্মূল আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার এবং এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। তবে এতে পরিপূর্ণ সফলতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন হবে একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা।

দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যে ধরনের উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা দরকার, তার সামর্থ্য বা সদিচ্ছা কোনোটাই এই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নেই… আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়, একমাত্র বিকেন্দ্রীকৃত রাষ্ট্রব্যবস্থাই দারিদ্র্য দূরীকরণের কর্মসূচি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন ও তাতে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। এটা করার জন্য দক্ষ প্রতিনিধিত্বশীল একটি স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটি নিশ্চিত হবে না বলে অনেকের মত।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজমুদার বলেছেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন বর্তমানে আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এর জন্য এসডিজির স্থানীয়করণ তথা স্থানীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় উদ্যোগ ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতায়ন আবশ্যক। এর জন্যও প্রয়োজন হবে একটি বিকেন্দ্রীকৃত ও প্রয়োজনীয় সম্পদপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। কিন্তু দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনব্যবস্থা যেদিকে চলে গেছে তাতে তৃণমূলের গণতন্ত্র কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এখন পর্যন্ত অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরই মধ্যে জানা গেছে, চেয়ারম্যান হতে ভোট লাগবে না ৯৬ উপজেলায়। ফলে একতরফা নির্বাচন হলে নির্বাচনে উৎসবের আমেজ অনেকটাই হারাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আজ্ঞাবহ হয়ে পড়েন। এ অবস্থা কখনোই কাম্য নয়।

সূত্র জানিয়েছে, ইসি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচন আইনানুগ হতে হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের দায়িত্ব পালনে কোনো শিথিলতা সহ্য করা হবে না। কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন হতে দেওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন থেকে সংশ্লিষ্টদের চিঠিও দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের পর কিছুটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ায় সরকার উপজেলা নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে চায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে শওকত আলীর নেতৃত্বে ২০০৭ সালে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গতিশীল ও শক্তিশালীকরণ কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটি এমন একটি সমন্বিত আইনের সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। সেটি এখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। আইনের সংস্কার আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক স্থানীয় সরকার আইন অত্যন্ত পশ্চাৎপদ এবং এগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি। উদাহরণস্বরূপ সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ভাষায় বর্তমান জেলা পরিষদ আইন একটি ‘অথর্ব’ আইন।

তাই বিশিষ্টজনরা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় সরকার আইনের সংস্কারের সুপারিশ চেয়ে এসেছেন। আমাদের দেশে দুই ধরনের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান। গ্রামীণ ও নগর স্থানীয় সরকার। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের অন্তর্ভুক্ত। আর পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নিয়ে নগর স্থানীয় সরকার।

অনেকে বলছেন, বিরোধী জোটের অংশ ছাড়াই উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটার শঙ্কা কম। তা ছাড়া ক্ষমতাসীনদের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতা অগ্রগতি হচ্ছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন না হওয়ায় সহিংসতা তেমন হবে না। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ায় দলগুলোর মধ্যে কোন্দল বাড়বে বলেও মনে করেন তারা।

পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট আজ রোববার। এ ধাপে ৮২ উপজেলায় ভোট হবে। নির্বাচন উপলক্ষে চার বিভাগের এসব উপজেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার (৮ মার্চ) মধ্যরাতে শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। ভোটগ্রহণে ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপের প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর বিরামহীন প্রচার চালিয়েছেন। উপজেলা নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী ভোটগ্রহণের ৩২ ঘণ্টা আগে সব প্রচার-প্রচারণা নিষিদ্ধ। ফলে টানা ১৬ দিন প্রচারণার শেষ হয়েছে গতকাল শুক্রবার রাত ১২টায়। আগামীকাল ১০ মার্চ রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ হবে।

দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিতব্য পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২৯ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে ১৬ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ছয়জন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাতজন।

৮৩ উপজেলায় এক কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার পাঁচজন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ৩ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১২ জেলার ৮৭ উপজেলায় ভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়। পরে আদালতের আদেশে রাজশাহীর পবা উপজেলার ভোট স্থগিত করা হয়। আর জামালপুরের মোলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও নাটোর সদরে সব প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে ওই তিন উপজেলায় ভোট হচ্ছে না।

এ ছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৬ জন চেয়ারম্যান, ছয়জন ভাইস চেয়ারম্যান ও সাতজন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি ৮৩ উপজেলায় ২১৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী, ৪০৬ জন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং ২৭৩ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রথম ধাপে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ছয় হাজার ২১৯টি এবং ভোটকক্ষ ৩৯ হাজার ১৫৯টি।

ভোটের আগে দুই দিন, ভোটের দিন ও ভোটের পরে দুই দিন মিলিয়ে পাঁচ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ড, আর্মড পুলিশ, ব্যাটালিয়ন সদস্যরা থাকবেন শৃঙ্খলা রক্ষায়। নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম থাকবেন আচরণবিধি প্রতিপালনে।

রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন-পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেবেন। সেই সঙ্গে ভোটের সাত দিন আগে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়া অন্য যে কারো অস্ত্র বহন, প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসার, ভিডিপি সদস্য ও গ্রাম পুলিশ থাকবে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রভেদে। সাধারণ কেন্দ্রে ১৪ জন, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৫ জন; বিশেষ এলাকায় (পার্বত্য, হাওর ও দ্বীপ) সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ জন ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৬ জন নিয়োজিত থাকবে।

উল্লেখ্য, আগামী ১০, ১৮, ২৪ ও ৩১ মার্চ চার ধাপে পঞ্চম উপজেলা পরিষদের ভোট হবে। পঞ্চম ধাপে বাকি উপজেলার ভোট হবে ১৮ জুন। গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল। এবার ছয় বা সাত ধাপে ৪৯২টি উপজেলায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। এরপর ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার, ২০০৯ সালে তৃতীয়বার এবং ২০১৪ সালে কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন।