সৌদি শাসকরা কী আসলে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করেন?

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনায় সারা বিশ্ব দেশটির রাজতন্ত্র বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে দায়ী করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত খাসোগি তার রাজনৈতিক কলামের জন্য আরবি ও ইংরেজি ভাষাভাষীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর নিখোঁজ হন তিনি।

এরপর ১৯ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে, খাসোগিকে কনস্যুলেটের ভেতর হত্যা করা হয়েছে। এই স্বীকারোক্তির ফলে সৌদি রাজতন্ত্রের মানবাধিকারের করুণ অবস্থা এবং সমালোচনার প্রতি তাদের চরম অসহিষ্ণুতাই আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে।

এই ঘটনায় সৌদি আরব অন্যায় করায় ইসলামও তাদের সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সৌদি সরকারের হীন কার্যকলাপের উৎস মনে করা হয় ইসলামকে। খাসোগির ঘটনাতেও ইসলামেরই সমালোচনা করছেন সাধারণ মানুষ।

ধর্ম সম্পর্কে মোটা দাগের ধারণা নিয়ে চলেন এমন মানুষেরা সৌদির সরকারের কর্মকাণ্ডের উৎস মনে করছে ইসলামকেই। এই ঢালাও ধারণার চেয়েও ক্ষতিকারক হচ্ছে এর পেছনে থাকা অনুমান অর্থাৎ সৌদি আরবই ইসলামের প্রধান প্রতিনিধি।

কিন্তু, বাস্তবতা হলো, সৌদি আরব ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে না। নিজেদের ‘ইসলামের কেন্দ্র’ ও প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও সৌদি রাজতন্ত্র অল্প কয়েকজন মানুষ, বিশেষ করে মোহাম্মদ বিন সালমানেরই প্রতিনিধিত্ব করে।

ইসলামের দুই পবিত্রতম শহর মক্কা ও মদিনা সৌদিতে থাকায় এগুলোর অভিভাবকত্ব করার মাধ্যমে ধর্মের বিষয়ে তাদের অন্যায্যতাকে ঢাকতে চেষ্টা করে শাসকগোষ্ঠী। বিশ্বের ১৮০ কোটি মুসলিমকে তাদের দেশে গিয়ে হজ পালনের অনুমতি দেয়ারও ক্ষমতা তাদের হাতে।

তাদের খনিজ তেলের অনিঃশেষ উৎসের ওপর নির্ভর করে সৌদি শাসকরা পেট্রোডলারের সঙ্গে ওয়াহাবি মতবাদের প্রচার চালিয়ে সৌদি আরব ও ইসলামকে সমার্থক করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছে।

একটা জিনিস স্পষ্ট করা দরকার, ইসলাম আর সৌদি আরব একই জিনিস এবং সৌদি মোল্লা, শেখ, রাজারা ইসলামেরই আদিরূপ এটা ওরিয়েন্টালিস্টদের মতবাদ থেকে উদ্ভুত হলেও সৌদি আরব নিজে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য মুসলিম দেশ এবং পশ্চিমে এই ধারণা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিল।

বাস্তবতা হচ্ছে, ওয়াহাবি চিন্তাধারায় অন্যান্য ইসলামী ঐতিহ্যগুলোর প্রতি অসহিষ্ণু। তারা শুধুমাত্র নিজেদেরই প্রকৃত ইসলামী অনুশাসন বলে মনে করে। এর সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে সৌদি আরবকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ চালিয়ে গেছে।

কিন্তু, দেশটি আগেও ইসলামের প্রতিনিধি ছিল না আর এখন তারা মোটেও তা নয়। সৌদি আরব কেবল একটি দেশ মাত্র, যা সুন্নি ইসলামের কঠোর ও সেকেলে ব্যাখ্যা ওয়াহাবি মতবাদ অনুসরণ করে।

আর সৌদির ৩.২ কোটি মানুষ এবং তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রভাবে থাকা কয়েকটি দেশ এই মতবাদ মেনে চলে।

প্রকৃতপক্ষে, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতে সৌদি আরবের চেয়ে অনেক বেশি মুসলিম থাকে। নাইজেরিয়ার মুসলমানদের সংখ্যা সৌদির জনসংখ্যার আড়াই গুণ। সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ককেই বড় করে তুলে ধরতেই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ— মানুষ উভয়ই সৌদির ওয়াহাবি মতবাদকে ইসলাম হিসেবে চিত্রিত করে। যদিও ইসলামের মধ্যেই বেশ কয়েকটি চিন্তাধারা প্রবাহিত হচ্ছে।

আবারো উল্লেখ করতে হচ্ছে, এর জন্য মূলত বিশিষ্ট ওরিয়েন্টালিস্টরা দায়ী। কিন্তু, সৌদি আরবও এই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে। সৌদি আরব বড়জোর সংকীর্ণ ও নিশ্চল ওয়াহাবি মতবাদের প্রতিনিধি। কিন্তু, দেশে-বিদেশে তাদের কর্মকাণ্ড দেখলে এটাও অসত্য মনে হবে। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এক সৌদি যুবরাজের উচ্চাভিলাষ ও তার পেছনে থাকা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে দেশটি।

সততা, ন্যায়, সাহস ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রতিনিধিত্বকারী খাসোগি ওই দেশে একদম বেমানান ছিলেন। সৌদি আরবের লোক বললে পৃথিবীর মানুষের মনে যে ছবি ভেসে ওঠে, তার জলজ্যান্ত ব্যতিক্রম ছিলেন খাসোগি। তিনি তার বিশ্বাস ও জাতীয়তা নিয়ে গর্বিত ছিলেন। তার কাজ ও এমনকি তার অস্তিত্বও সৌদি শাসকদের জন্য অপমানজনক ছিল। স্বেচ্ছাচারী মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্থানের পথে তিনি ছিলেন একটা বাধা।

খাসোগির সাহসী সাংবাদিকতা অনেকাংশে ইসলামের দ্বারাই অনুপ্রাণিত ছিল। সৌদি শাসকদের অপকর্মের জন্য ইসলামকে দোষারোপ করলে দ্বিগুণ অন্যায় করা হবে।

প্রথমত, এতে সাহসী এই সাংবাদিকের স্মৃতির প্রতি অন্যায় করা হবে। মৃত্যুর পরও তিনি সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে থাকবেন, যে স্বাধীনতা সৌদি আরবে নেই।

দ্বিতীয়ত, এতে বৈশ্বিক একটা ধর্মের প্রতি অন্যায় করা হবে, যা সৌদি শাসকদের অপকর্ম থেকে আলাদা তো বটেই, জাগতিক বাসনা পূরণ করতে ব্যগ্র এমন যেকোনো দেশ বা সরকারের থেকেও এটা পৃথক।

[খালেদ এ বেয়দুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বে ইসলাম-ভীতি সম্পর্কে গবেষণায় নিযুক্ত। তিনি ‘আমেরিকান ইসলামোফোবিয়া: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য রুটস অ্যান্ড রাইজ অফ ফিয়ার’ বইটির লেখক। ২০ অক্টোবর আলজাজিরায় প্রকাশিত তার লেখা ‘The Saudi regime does not represent Islam’ নিবন্ধটির ঈষৎ সংক্ষিপ্ত আকারে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ মামুনূর রশিদ ]