প্রধান ম্যেনু

আনন্দে পিকনিকে একদিন || এইচ. এম নুর আলম

ফেব্রুয়ারি মাস চলছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পিকনিক- শিক্ষা সফরের সময়। এ সময় মেস-প্রতিষ্ঠান,বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা সফরের ভীর পড়ে। এছাড়াও পারিবারিকভাবেও বিভিন্ন স্থাপত্যশিল্প দেখতেও বের হয় মানুষ। সেই ধারাবাহিকতায় বার্ষিক সফর হিসেবে আমরাও রংপুরের সর্দারপাড়া থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ঠিক করলাম দিনাজুরের সিংড়া ফরেস্ট, কান্তজির মন্দির এবং রামসাগর ভ্রমণে যেতে।

কান্তজিউ মন্দির : আমরা যাচ্ছি রংপুর থেকে। গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে। দিনটি শুক্রবার। এছাড়াও অনেক দূর। তাই দ্রতই যেতে হবে। সকাল ৮ টার দিকে রংপুর থেকে ছেড়ে গাড়ি চলছে বিরামহীন। রান্না-বান্না হবে সিংড়া ফরেস্টে। তাই সময়ের সাথে তাল মেলাতে প্রথমে কান্তজির মন্দিরে গাড়ি দাঁড় করানো হলো। সময় দেওয়া হলো ২০ মিনিট।
কান্তজিই মন্দির যা কান্তজির বা কান্তনগর নামে পরিচিত। এছাড়াও এটা নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত। তিনতলাবিশিষ্ট মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন থেকে নবরত্ন নামে পরিচিত এটি। দিনাজপুর শহর থেকে ১৮/২০ কিমি. উত্তরে কাহারোল থানার অন্তর্গত কান্তনগর গ্রামের ঢেপা নদীর তীরে এটি অবস্থিত। মন্দিরের শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন (১৮ শতকে) দিনাজপুরের মহারাজা ও জমিদার প্রাণনাথ রায় এই মন্দিরের কাজ শুরু করেন। ১৭৭২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পোষ্যপুত্র রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন।
পরে বিংশ শতাব্দির শরুর দিকে মহারাজা গিরিজানাথ বাহাদুর নয়টি শিখর বাদে মন্দিরটি ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করেন।

মন্দিরটির স্থাপত্য শৈলী :

পাথরের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরটির উচ্চতা ৫০ ফুটেরও বেশি। পিরামডি আকৃতির নানা নকশাখচিত মন্দিরটি তিনটি ধাপে উপরে চলে গিয়েছে এবং এতে নয়টি অলংকৃত শিখা বা রত্ন রয়েছে। স্থাপত্যটির চারপাশে শক্ত দেয়াল নির্মিত। বর্গাকৃতির মন্দিরটি একটি আয়তাকার প্রাঙ্গনের উপর স্থাপিত। এর চারপাশে পূজারি বা সেবকদের আশ্রম রয়েছে। এগুলো টিন দ্বারা আচ্ছাদিত। দিনাজপুরের (গঙারাম) নিকট বনানগরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে নির্মাণ উপকরণ এনে এটি তৈরি করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ভিত্তির উপরে রামায়ণ- মহাভারতের বিস্তৃত কাহিনী, মনুষ্য মূর্তি, লতাপাতার মধ্যে প্রস্ফুটিত গোলাপ, সমসাময়িক সামাজিক চিত্র ও কাহিনী ফুটে উঠেছে। এছাড়াও রাজার শিকার করার দৃশ্যও ফুটে তোলা হয়েছে। নিচতলার চার প্রকোষ্ঠের বাইওে মোট ২১ টি খিলান দরজা রয়েছে আর দ্বিতীয় তলায় এ খিলান দরজার সংখ্যা ২৭ টি। ছোট তৃতীয় তলার মাত্র তিনটি প্রবেশ দরজা এবং তিনটি জানালা রয়েছে। পূজারিদের আশ্রমের বাইরে ছোট একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির রয়েছে।

দেবোত্তের স্টেটের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এটি বাংলাদেশ প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তর সার্বিকভাবে দেখাশুনে করে। এই মন্দিরের নামে এবং আশেপাশে মিলিয়ে প্রায় ৬২ একর জমি রয়েছে। মন্দিরের দেয়ালের বাইরে বেশ কিছু দোকান রয়েছে খাবারের জন্য। বর্তমান এটি ‘ভগবত মানব উন্নয়ন সংঘ’ পরিচালনা করে থাকে।
মন্দিরের উত্তর দিকে ভিত্তিবেদীর শিলালিপি আছে। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত¡বিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ জাকারিয়া এই শিলালিপি অনুবাদ করেছিলেন, যাতে বলা আছে-
প্রাসাদতুল্য অতিরম্য সুরচিত নবরত্ন দেবালয়ের নির্মাণকার্য নৃপতি প্রাণনাথ আরম্ভ করেন। রুক্সিণীকান্তের (শ্রী কৃষ্ণের) তুষ্টির জন্য (ও) পিতার সংকল্প সিদ্ধির নিমিত্ত ১৬৭৪ শালে (১৭৫২ খ্রি.) নৃপতি রামনাথ কান্তের নিজনগরে (কান্তনগরে) কান্তের (শ্রী কৃষ্ণের) উদ্দেশ্যে এই মন্দির উৎসর্গ করেন।

উত্তরের সুন্দরবন সিংড়া ফরেস্ট :

স্থাপনাটি দেখা শেষ করে আমাদের গাড়ি এবার সিংড়া ফরেস্ট এর দিকে রওয়ানা হলো। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দিনাজপুরের সিংড়া ফরেস্টে পৌঁছলাম আমরা। সেখানে গিয়ে একটি জায়গা পছন্দ করলাম রান্না-বান্নার জন্য। স্পটে কিছু সিনিয়র থেকে বাকিরা সিংড়া ফরেস্ট বা দিনাজপুর জাতীয় শালবন উদ্যান ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য বের হয়ে গেলো।
পিকনিক স্পটে যেতে অনেক দূর বন পেরুতে হয়। এই বনে অনেক শালগাছসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। বনের মাঝখানে একটি স্থানে কিছু অস্থায়ী দোকান ও টিনের তৈরি মসজিদ রয়েছে। এখানেই রান্না-বান্না করা যায়। পাশেই বাঁশ দিয়ে তৈরি খাচায় বেশ কিছু শকুন রয়েছে। পাশে একটি বাগানও রয়েছে। স্পট থেকে উত্তর দিকে একটি ছোট ব্রীজ রয়েছে গভীর বনে প্রবেশ করার জন্য। ব্রীজের ওপারে অনেক ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে যারা প্রত্যেক ব্যক্তিকে ৪০ টাকার বিনিময়ে পুরো বন ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। ঔ রাস্তার দু’পাশেই বন। বন থেকে কয়েক কিমি. দূরে ক্ষুদ্র উপজাতিদের বসবাস। তাদের গ্রামের বাড়িঘর গুলো মাটি দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি। কিছু কিছু বাড়ি তাদের নিজস্ব নানা নকশা দিয়ে তৈরি।

সিংড়া জাতীয় উদ্যানের বৈশিষ্ট্য :

স্থানীয়ভাবে এটি সিংড়া শালবন নামে পরিচিত। দিনাজপুর জেলা শহর থেকে সড়ক পথে ৪০ কিমি উত্তরে এবং বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে ১৫ কিমি উত্তরে দূরে ভোগনগর ইউনিয়নে এর অবস্থান। ডালাগ্রাম, চাউলিয়া, সিংড়া ও নর্তনদী এই ৪ মৌজায় অবস্থিত। সিংড়া মৌজার নামানুসারে এ বনের নামকরণ করা হয়।

দিনাজপুর সামাজিক বন বিভাগের তথ্যানুয়ায়ী, ৮৫৯ দশমিক ৩৩ একর জমির উপর অবস্থিত। ১৮৮৫ সালে এটি অধিভুক্ত করা হয় এবং ১৯৭৪ সালে বন বিভাগের অধীনে নিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। সবশেষ ২০১০ সালের ১০ অক্টোবরে বন বিভাগ এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে বীরগঞ্জ উপজেলার ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বনভূমির মোট আয়তন ৩৫৫ হেক্টর এবং এর মধ্যে জাতীয় উদ্যানের পরিমাণ (সংরক্ষণ) ৩০৫ দশসিক ৬৯ হেক্টর।

সিংড়া ফরেস্টের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে নর্ত নদী। উদ্যানে একটি রেস্ট হাউজ ও দুটি পিকনিক স্পট রয়েছে। এই বনে নানা আদিবাসীসহ সাওতালদের বসবাস বেশি। এখানে একটি পুকুর এবং ‘গিলালতা’ বৃক্ষ রয়েছে। ধারণা করা হয়, অনেক দিন পূর্বে লতায় জড়ানো একটি বড় বৃক্ষ ঝরে পড়ে যায়। সে থেকে এটিকে ঘিরে রাখা হয়েছে। ঘুরতে আসা মানুষ এটিকে দেখতে যায় এবং নানাভাবে ছবি তুলে।

সিংড়া জাতীয় উদ্যানে মূলত পত্রঝরা শালবৃক্ষের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে শালবৃক্ষ ছাড়াও এখানে শিমুল, শিলকড়ই, জারুল, তরুল, সেগুন, গামার, আকাশমনি, হরিতকি, বয়রা, আমলকি, মিনজিরি এবং নাম না জানা আরো উদ্ভিদ। এখানে বেতবনও রয়েছে। এখানে নানা ধরণের পাখি থাকার কথা থাকলেও এখন আর দেখা যায়না। উদ্যানের মাঝে মাঝে নানা আকৃতির উইয়ের ঢিবিও রয়েছে প্রচুর। আল্লাহর রহমতের অপার দৃশ্যের একটি এই উদ্যান। এখানে কিছু বৃক্ষ রয়েছে হেলানো আবার কিছু বৃক্ষে লতা যেন গিলে রেখেছে।

ভালো জানাশোনা ব্যক্তির সাথে না ঘুরলে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন বনের গহীনে। উদ্যানের গহীনে বেশ ঔষধি গাছও রয়েছে। পুরো বনের একপাশ ঘুরে আসতে আপনার দুই ঘন্টার মতো সময় লাগবে। এই উদ্যানে দর্শনার্থীদের জন্য এখন তেমন সুবিধা তৈরি হয়নি। একটি মসজিদ থাকলেও এখনো কাঁচাই রয়ে গেছে। তবে শীঘ্রই পাকা হবে বলে বনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি আশ্বস্ত করেন।

উদ্যান ঘুরে পিকনিক স্পট এসে খাবার খেয়ে চারটার দিকে রামসাগর এর উদ্দেশ্যে আমাদের বাস রওয়ানা দিলো।

রামসাগর:

সিংড়া ফরেস্ট থেকে বেরিয়ে যখন রামসাগরে আমাদের গাড়ি পৌঁছলো তখন প্রায় বিকেল পাঁচটা। সেখানে নেমে একঘন্টায় ছোট্ট পরিসরে ঘুরলাম আর কিছু ছবি তুললাম। রামসাগরে ঢুকে সাগর নামের নদীর পাড়ের দৃশ্য যারা দেখেননি তারা অনেক কিছুই মিস করবেন।

নদীটির পানিতে ঘুরতে নৌকা রয়েছে। এর চারপাশে নানা খেলনা এবং খাবারের দোকান রয়েছে। রামসাগর এ শিশুদের জন্য পার্কও রয়েছে। একটি হোটেল রয়েছে তবে সেটি পরিত্যক্ত। একটি বাংলোও রয়েছে বিশ্রামের জন্য। আছে একটি মিনি চিড়িয়াখানাও। এছাড়াও দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে ৭ টি পিকনিক কর্নার। নদীটির চারপাশে আম, জাম, কাঁঠাল, হরিতকী, জারুলসহ নানা প্রজাতির গাছ রামসাগরের সৌন্দর্য সুশোভিত করেছে। একটি একটি মাদরাসা ও মসজিদও রয়েছে। রয়েছে বড় উচু টিলাও।

রামসাগরের নদী খননের ইতিহাস:

রামসাগর দিনাজপুর জেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে অবস্থিত। এটি দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিমি দূরে অবস্থিত। দিনাজপুরের বিখ্যাত রাজা রামনাথ ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই দিঘী নির্মাণ করেন। এটি খনন করতে তৎকালীন ১৫ লাখ শ্রমিকের ১৫ দিন লেগেছিলো। তটভূমিসহ এ সাগরের আয়তন ৪,৩৭,৪৯২ বর্গমিটার। এর গড় গভীরতা প্রায় ১০ মিটার।

কথিত আছে, সে সময় (১৭৫০ সালে) এক প্রচন্ড খরায় পানির অভাবে অনেক মানুষ মৃত্যু বরণ করে। এ সময় রাজা স্বপ্নে আদেশপ্রাপ্ত হন তাঁর ছেলেকে বলি দিতে। ফলে যুবরাজকে সাজিয়ে ঘোড়ায় উঠালে তিনি সিড়ি ধরে পানিতে নামলে পানি টাইটুম্বুর হয়ে যায় এবং তিনি পানিতে তলিয়ে যান। এ থেকে দিঘীটির নামকরণ করা হয় ‘রামসাগর। রামসাগর বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আসে ১৯৬০ সালে এবং ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে একে আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০১০ সালে ১০ অক্টোবর ‘রামসাগর গ্রন্থাগার’ গড়ে তোলা হয়।

ঘন্টাখানেক ঘুরে আমরা এবার রংপুরের দিকে রওয়ানা দিলাম। উল্লেখ্য, রংপুর থেকে এই তিনটা স্পটে যেতে-আসতে বাসে ৮ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছিলো।

আপনি যদি এসব স্পটে রংপুর থেকে যেতে চান তাহলে দিনাজপুরগামী বাসে যেতে পারেন সহজেই।



মন্তব্য চালু নেই