মেইন ম্যেনু

আপনিই কেন চাকরিটি পাবেন?

‘স্যার, আমাকে একটি চাকরি দিন। আমি যে কোনো কাজ করতে পারব।’ আমি জানি অনেকেই এভাবে উত্তর করেন। ভালো সিভি না থাকার কারণে প্রথমত অনেকে ইন্টারভিউ কল পান না। বহুদিন পর যদি কোনো একটা কল পান তখন আর মাথায় কাজ করে না। ইন্টারভিউ বোর্ডে যখন জিজ্ঞেস করা হয় অন্যদের না নিয়ে কেন আপনাকে নেয়া উচিত তখন প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে অনেকেই ইমোশনাল হয়ে পড়েন।

‘স্যার, আমার বাবা দোকানে কাজ করেন। অনেক কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। এখন স্যার একটা চাকরি আমার খুব দরকার। চাকরিটা না হলে স্যার বোনের বিয়ে দিতে পারছি না।’ এরকম উত্তরও খুব কমন। পারিবারিক দুর্বলতা প্রকাশ করে কিছু একটা ঘটানোর বৃথাচেষ্টা।

‘স্যার, আমি অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। আমি স্যার কষ্ট করতে পারব। আমি স্যার খুব বিশ্বস্ত ও কর্মঠ। আমি খুব যত্ন সহকারে আপনার কাজ করব’, এরকম উত্তরও বেশ কমন।

‘স্যার, এখন যেখানে আছি, মালিক অনেক খারাপ ব্যবহার করে। আমার বিশ্বাস স্যার আপনারা ভালো হবেন।’ অনেকে এটাও বলেন জানি। আমার নিজেরই খুব কষ্ট লাগে যখন দেখি, মানুষ কত অসহায়ের মতো একটি চাকরি খুঁজছে। আমি জানি আপনারা অনেকেই আসলে জানেন না যে কিভাবে নিজেকে যোগ্য হিসেবে তুলে ধরবেন। অন্যদের চেয়ে কেন আপনি সেরা প্রমাণ করবেন কিভাবে? চলুন, আজকের ষষ্ঠ পর্বের এই লেখায় আপনাদের সেটাই জানাব। আবেদন করার সময় দুটি বিষয়ের প্রতি নজর দিবেন।

১। প্রতি ক্ষেত্রে আবেদন করার সময় কোথায় কোন পদের জন্য আবেদন করছেন ভালো করে দেখে নিন। কাজের বৃত্তান্ত না পড়ে আবেদন করবেন না। এতে হয় আপনার সিভি রিজেক্ট হবে নয়তো আপনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে ধরা খেয়ে যাবেন। লক্ষ্য করুন, কাজ জানা লোক কোম্পানিটি খুঁজছে, আপনি সেগুলো জানেন তো? জানা থাকলেই আবেদন করুন।

২। আবেদন করার পর অনেকেই কোথায় আবেদন করেছিলেন মনে রাখেন না। পরে যখন ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হয় তখন তারা যে কি কি কাজের কথা বলেছিল মনে করতে পারেন না। খুব কমন সমস্যা এটি। প্রত্যেকটি আবেদনের পর পুরা সার্কুলারটি কেটে রাখুন। অনলাইনের ক্ষেত্রে সেভ করে রাখুন কম্পিউটারে।

এবার চলুন, সহজ একটি উদাহরণ দেই। আপনি আর আমি, দুইজন কুস্তি লাগলে কে জিতবে? সহজ উত্তর যার শক্তি বেশি সে। প্লিজ আবার পড়ুন, যার শক্তি বেশি সে। পার্থক্যটা হচ্ছে কিসে? শক্তিতে। তার মানে হল শক্তি নির্ধারণ করবে আমি জিতব নাকি আপনি জিতবেন। শক্তি আসবে কোথা থেকে? পুষ্টিকর খাবার থেকে। তাই না? অর্থাৎ আপনার লেখাপড়া, কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজ আপনাকে যতটুকু পুষ্টি জুগিয়েছে, সেটা দিয়েই আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আপনার শক্তি বেশি, মেধা বেশি, তাই আপনিই সেরা, তাই নয় কি? এখানে আবেগের কোনো স্থান নেই।

অনেকেরই চোখে পড়েছে হয়তো এমন বিজ্ঞাপন, ‘এসএসসি পাস করা একজন হিসাব জানা, সৎ ও উদ্যমী সেলসম্যান চাই’ এই পদের জন্য যোগ্যতা বিচার করা হবে কিসের ভিত্তিতে বলুন তো? ১। হিসাব জানা ২। সততা ও ৩। উদ্যম

আপনি না হয় হিসাব জানেন, যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, ভগ্নাংশ ও কিছু টুকিটাকি পাটিগণিত আপনি জানেন। কিন্তু সবাই তো বলবে আমি সৎ ও উদ্যমী, সবার মধ্যে আপনিই যে সেই সেরা ক্যান্ডিডেট সেটা প্রমাণ করবেন কিভাবে? উদাহরণ দেই, আমরা যখন নটরডেম কলেজে পড়তাম, আমাদের সুশান্ত স্যার একদিন ফিজিক্সে ১৬০ জনের ক্লাসে ১০ জনের যোগে ইচ্ছা করে ভুল করে বেশি নম্বর দিয়ে আমাদের খাতা দেখতে দিয়েছিলেন। ১০ জনের মধ্যে ৩ জন তাদের যোগে ভুল হয়েছিল স্বীকার করে, স্যার তাদের সততার জন্য তাদের সেই নম্বরই দিয়ে দেন। এরকম কোনো একটি ঘটনা নিজের সম্পর্কে বলুন। যে ঘটনার নায়ক ছিলেন আপনি। আপনি কিছু একটা করেছেন যেটা আপনার সততা প্রমাণ করে। আমি সৎ, আমি সৎ, আমি সৎ, তিনবার বললেই তো রিক্রুইটার কবুল বলে আপনাকে মেনে নিবে না। আরও যে ১০ জন ইন্টারভিউ দিতে এসেছে তারা হয়তো গুছিয়ে বলতেই পারল না। আপনি যেহেতু পারলেন তার মানে আপনিই সেরা।

একজন ড্রাইভার যখন নিয়োগ দেয়া হয় ভেবে দেখুন তো কি কি জিনিসের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়? ১। তার লাইসেন্স আছে কি না, ২। গাড়ি সম্পর্কে তার জ্ঞান আছে কি না। ৩। সে রাস্তার ট্রাফিক রুল জানে কি না ৪। তার চোখের জ্যোতি ঠিক আছে কি না ৫। তার ব্যবহার ভালো কি না। ৬। তার কোনো বাজে অভ্যাস আছে কি না।

কাউকে ছোট করতে উদাহরণটা দেইনি। উদাহরণটা দিয়েছি আপনাদের বোঝাতে। যে কোনো পদে কাজ করার জন্য কিছু জ্ঞানের দরকার, স্কিল দরকার। আপনার কি সেগুলো আছে? থাকলে শুধু সেগুলো ধরে কথা বলুন, ‘স্যার, আমার লাইসেন্স আছে, এই হচ্ছে তার কপি। আমি একটি গ্যারেজে কাজ করেছি। রিপেয়ার ও মেইনটেনেন্সের কাজ আমি জানি। আমি এক বছর গাড়ি চালিয়েছি, ট্রাফিক নিয়ম আমার জানা। আমার চোখে কোনো সমস্যা নেই। আমি স্যার টুকটাক ইংরেজিও জানি ও বুঝি। এজন্যই আমি আমাকেই সেরা ক্যান্ডিডেট বলে মনে করছি।’

ধরুন আপনি একটি কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি পদের জন্য আবেদন করেছেন। ভেবে দেখুন তো, একজন বিক্রয় প্রতিনিধির কি কি গুণ থাকা দরকার? ১। পড়াশোনা (হয়তো বিবিএ অথবা এমবিএ), ২। প্রোডাক্ট নলেজ ৩। বিক্রয় করতে পারার যোগ্যতা ৪। মানুষের সঙ্গে মেশা, টিমে কাজ করা ৫। কোনো ক্ষেত্রে বাইক চালাতে পারা ৬। ভ্রমণে পারদর্শিতা ৭। মার্কেট রিসার্চ করতে জানা ৮। ব্রান্ডিং ও প্রমশনাল কাজ জানা ৯। রিপোর্ট তৈরি করা ১০। এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্টের কাজ জানা। এই তো, তাই না? আপনাকেই কেন নিবে তাহলে কিভাবে উত্তর করবেন?

ধরুন আপনি ফ্রেশার। আপনার উত্তরটি হতে পারে এরকম, ‘স্যার, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিষয়ের উপর বিবিএ করেছি। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি ‘কর্পোরেট আস্ক’ নামক একটি ট্রেনিং ফার্মের ক্যাম্পাস ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলাম। কেন প্রত্যেকেরই ছাত্রাবস্থা থেকে ট্রেনিং করা দরকার সেটা সবাইকে বুঝাতাম। তাদের একটি ইভেন্টও অ্যারেঞ্জ করেছিলাম আমাদের ক্যাম্পাসে। আমি ভার্সিটির টুরিস্ট ক্লাবের মেম্বার। আমি প্রায় ৩০টি জেলা ঘুরেছি। আমি বাইক চালাতে পারি ও আমার লাইসেন্স আছে। আমি ওয়ার্ড ও এক্সেলের কাজ জানি। পড়াশোনার সময় প্রায় ৪০০ রিপোর্ট করতে হয়েছে চার বছরে। বিজনেস রিসার্চ যখন আমরা পড়ি, তখন আমরা রিসার্চের কাজও করেছিলাম। আমার এক্সেলের ওপর ট্রেনিং ও বিশেষ দক্ষতা আছে। আমি ড্যাশবোর্ড বানাতে পারি। এই পদের জন্য যতগুলো কাজ জানা দরকার তার সবগুলোই আমি জানি। তাই আমি আমাকেই এই পদের জন্য যোগ্য মনে করছি।’

চাকরির আবেদনের সময় সার্কুলার কেটে রাখতে বলেছি এই জন্য যাতে কথা বলার সময় ঠিক তাদের দরকার অনুযায়ী কথা বলতে পারেন। অনেক সময় আবেদনের দুই মাস পর কল আসে, সেক্ষেত্রে যেন ভুলে না যান কিছু।

টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টে যারা আবেদন করছেন, তারা কিভাবে উত্তর দিবেন? সার্কুলারটা পড়ুন, কি কি চাচ্ছে? ইলেকট্রিক্যাল সার্কুলারের ক্ষেত্রে হয়তো ইলেকট্রিক ডিভাইস, মেকানিক্যালের ক্ষেত্রে হয়তো মেশিন, পাম্প, কম্প্রেশার, কম্পিউটারের ক্ষেত্রে প্রোগ্রাম ও সফটওয়্যার সম্পর্কে আইডিয়া আছে এরকম লোক খুঁজছে কোম্পানি। আরও হয়তো চাইছে, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্টে কাজ জানা লোক। আপনি কি সেগুলো জানেন? আপনি সেগুলোর রিলেটেড কি কি কাজ জানেন? কবে কবে কি কি করেছেন? ভাবুন। উত্তর দিতে পারবেন এবার?

ধরুন, একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কোনো একটি কোম্পানিতে আবেদন করেছে সেফটি অফিসার পদের জন্য। কেন আপনাকে নিব? উত্তর হতে পারে, ‘স্যার, চার বছরের পড়াশোনার মধ্যে অনেক ধরনের মেশিনের সঙ্গে আমি পরিচিত হয়েছি। আমাদের স্যাররা যখনই আমাদের কোনো মেশিনের সঙ্গে পরিচিত করাতের তখনই আমাদের জানিয়ে দিতেন সেগুলোর সেফটি ফিচারগুলো। আমি পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট সম্পর্কে জানি। আমি আইএসও-এর ওপর তিন দিনের কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি বিভিন্ন টেস্টিং সম্পর্কে জানি। তাছাড়া মেশিন কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কেও আমার ধারণা আছে। আপনাদের ফ্যাক্টরিতে যেহেতু বয়লার, পাম্প, কম্প্রেশার ইত্যাদি আছে এবং আমি যেহেতু এগুলোর বেসিকটা খুব ভালো জানি তাই আমি নিজেকে এই পদের উপযুক্ত বলে মনে করছি।’ (উত্তরটি আরও বিশদভাবে দেয়া ভালো)

এবার আসি যারা ট্রাক চেঞ্জ করবেন ভাবছেন তাদের প্রসঙ্গে। যেমন ধরুন, আপনি সাপ্লাই চেইনে কাজ করছেন, কিন্তু ভালো লাগে না। আসতে চান মানবসম্পদ বিভাগে। সেসব ক্ষেত্রে কোম্পানি কেন আপনাকে নিবে এই প্রশ্নের উত্তর করবেন কিভাবে? সার্কুলারটি পড়ুন। কি কি কাজ জানা লোক তারা চেয়েছে? তার মধ্যে কি কি কাজ মিলছে? কি কি কাজ মিলছে না? মার্ক করুন। যেগুলো মিলছে না সেগুলো কিভাবে মিলাবেন ভাবুন। সাপ্লাই চেইন মানে কি? একটা রেস্টুরেন্টের উদাহরণ দেই। রেস্টুরেন্টে কি হয়? বাজার থেকে মাছ, মাংস, সবজি কিনে আনে। নিজস্ব নিয়মে রান্না হয়। কাস্টমার আসে। অর্ডার করে খায়। সিম্পল। তার মানে হচ্ছে, কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে পণ্য তৈরি করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া পুরাটাই সাপ্লাই চেইন, তাই না? তো আপনি এখন সেরকমই একটি কাজ করছেন। আপনি নিজেই ভেবে দেখুন আপনি কত লোকের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলছেন, প্রোডাক্ট, চালান, বিল, গুদাম, স্টক কত কিছু করছেন। প্রত্যেকটা কাজই কি মানুষের সঙ্গে মিশে করছেন না। এখন হয়তো প্রোডাক্টের স্টক মিলান। মানবসম্পদ বিভাগে এলে হয়তো পে-রোল মিলাতে হবে, পেটি ক্যাশ সামলাতে হবে। এখন হয়তো সাপ্লাইয়ার, বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। মানবসম্পদ বিভাগে এলে হয়তো আপনাকে মালিক-শ্রমিক ব্যাল্যান্স করে চলতে হবে। সুতরাং, আপনি কিন্তু পারেন। আপনি কিন্তু সবই জানেন, করেছেন। কাজের ফিরিস্তি ধরেই বলা সম্ভব যে কেন আপনি সেরা, কেন আপনাকে নেয়া উচিত।

‘কেন আপনাকে নিতে হবে?’ খুব ট্রিকি প্রশ্ন। অনেকেই বাদ যায় এই প্রশ্নের উত্তর করতে না পারার জন্য। বেশ কিছু উদাহরণ দিয়েছি। সবার লাইফের সঙ্গে মিল করে তো আর এই ছোট্ট লেখায় তুলে ধরা সম্ভব না। তবুও যাদের এই প্রশ্নটির উত্তর করতে সমস্যা হয় আমাকে ইমেইল করবেন। প্রত্যেককে সহযোগিতা করতে চেষ্টা করব।

কোনো জড়তা নয়, কোনো অনুনয় বিনয় নয়। কাজ চাই না। কাজ জানি, কাজ পারি, তাই আমি আত্মবিশ্বাসী, তাই আমিই সেরা। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ লেখা পড়ার জন্য।

লেখক :

নিয়াজ আহমেদ

(ট্রেইনার ও প্রফেশনাল সিভি রাইটার)

চিফ নলেজ ডিস্ট্রিবিউটর, কর্পোরেট আস্ক

ই-মেইল : [email protected]



মন্তব্য চালু নেই