মেইন ম্যেনু

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আলহাজ্ব নূর হোসাইন মোল্লা’র জীবন ও কর্ম

মোস্তফা কামাল মাহদী : আমার প্রিয় শিক্ষক আলহাজ্ব নূর হোসাইন মোল্লা জন্মগ্রহণ করেন পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলাধীন ৯ নং সাপলেজা ইউনিয়নের বুখইতলা বান্ধবপাড়া গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত সম্ভ্রন্ত মুসলিম পরিবারে। আমার জন্মও এ গ্রামে।সম্পর্কে তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন ফুফাতো ভাই। এসএসসি সনদপত্রে তাঁর জন্ম তারিখ বর্ণিত আছে ২মে, ১৯৫২ খৃষ্টাব্দ।জন্মের এ তারিখটি যে সঠিক তা হলফ করে বলা যাবেনা। কারণ,তাঁর মাতা পিতার ভাষ্যে ,তাঁর জন্ম পাকিস্তান জন্মের ২ বছর পর।তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব ইকরাম আলী মোল্লা এবং মাতার নাম হাকিমুন নেসা।তাঁর দাদা মোঃ ইব্রাহীম মোল্লা ১৯২০ সাল পর্যন্ত ছিলেন পরাধীন ভারত বর্ষের পিরোজপুর মহকুমা বর্তমানে জেলা এর মঠবাড়ীয়া থানার ৫টি গ্রামের্(উত্তর সোনাখালী,মধ্যম সোনাখালী,দক্ষিণ সোনাখালী,কবুতরখালী ও গুলিসাখালী)একজন পঞ্চায়েত।নূর হোসাইন মোল্লা সাপলেজা ইউনিয়নের বুখইতলা বান্ধবপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করলেও কৈশরের অধিকাংশ সময় কেটেছে গুলিসাখালী গ্রামে।এ গ্রামের আজাহার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ১৯২০ -১৯২৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য।এ গ্রামটি ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে কিছুটা উন্নত।

আমাদের গ্রাম বুখইতলা বান্ধবপাড়া ছিল ব্রিটিশ নাগরিক এডওয়ার্ড প্যারী কেশপার সাহেবের নিস্কর জমিদারীর অধীন।তাঁর জমিদারীর অধীনে ছিল সমগ্র সাপলেজা ইউনিয়ন।জমির পরিমাণ ৩২ হাজার একর।জমিদার সাহেব প্রতি বছর শীতকালে আসতেন এবং বসন্তকালের মাঝামাঝি অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সস্ত্রীক কলকাতা হয়ে ব্রিটেনে চলে যেতেন। বুখইতলা বান্ধবপাড়া গ্রাম ছিল অবহেলিত।রাস্তা-ঘাট ছিল না।এ গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে একটি প্রাইমারী স্কুল আছে।এ স্কুলের সাথে তার পাড়া তথা তাঁর বাড়ির সাথে রাস্তা-ঘাট না থাকায় এ স্কুলে তাঁর লেখাপড়ার করার সুযোগ হয়নি।লেখাপড়ার জন্য তাঁর পিতা পাড়ার কতিপয় ব্যক্তিকে নিয়ে একটি মক্তব স্থাপন করেন।তিনি এ মক্তবে লেখাপড়া করেন।লেখাপড়ার চাইতে তিনি খেলাধুলায় বেশী মনোযোগী ছিলেন।তিনি হা-ডু-ডু,ভলিবল ও ফুটবল খেলতেন।স্কুল ও কলেজ জীবনে তিনি একজন ভাল ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন।১৯৬২ সালে ৫ম শ্রেণী পাস করেন এবং ১৯৬৩ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন তাঁর বাড়ী থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরবর্তী জি.কে ইউনিয়ন হাইস্কুলে।এ স্কুলের ছাত্র ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহভাজন ও সাবেক এমপি সাওগাতুল আলম সগীর।

স্কুলে যাওয়ার যাতায়াত ভালো না থাকায় বর্ষাকালে নৌকায় স্কুলে যেতেন।১৯৬৯ সালে এ স্কুল থেকে এস এস সি পাস করেন।এরপর তিনি মঠবাড়ীয়া কলেজে ভর্তি হন।ওই বছরই তিনি ছাত্রলীগে যোগদান করেন।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন।এ জন্যে রাজাকাররা তার পিতাকে ধরে নিয়েছিল।নানাবিদ তদবীরে পরবর্তীতে তিনি মুক্তি পান। ১৯৭১ সালে(১৯৭২ সালের অনুষ্ঠিত)এইচ এস সি পরীক্ষায় তিনি বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ হন।অতঃপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন।তিনি জহুরুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।১৯৭৪ সালে তিনি অর্থনীতি,রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জুনিয়র মিলিটারী সাইয়েন্সসহ ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ডিগী অর্জন করেন।১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক আইনসহ সমসাময়িক ইতিহাসে এম এ এবং ১৯৭৭ সালে আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসে এম এ ডিগী অর্জন করেন।১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি আওয়ামীলীগের মঠবাড়ীয়া থানা শাখার শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হন।

জনাব নূর হোসাইন মোল্লা কে এম লতীফ ইনষ্টিটিউশনের তৎকালীন মঠবাড়ীয়া এর সুযোগ্য ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক মোঃ শামসুল হক সাহেবের পরামর্শে ১৯৭৯ সালের জানুয়ারী মাসে নলী ভীম চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন এবং পেশার স্বার্থে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সংস্রব ত্যাগ করেন।তিনি ১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম-এড ডিগ্রী লাভ করেন।এর আগে১৯৮১সালে ঢাকা বিঃ থেকে তিনি ডিপ-ইন-এড ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি তুষখালী আদর্শ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বড় মাছুয়া হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন।শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৫ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।তিনি জাতীয় নেতা মহিউদ্দীন আহমেদ এর স্নেহভাজন ছিলেন এবং তারই পরামর্শে ১৯৯৫ সালের জানুয়ারী মাসে তাঁদেরই প্রতিষ্ঠিত জি.কে ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়(গুলিসাখালী)-এ প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন।আমি মোস্তফা কামাল ঠিক এর কিছুদিন পরে জনাব নূর হোসাইন মোল্লা স্যারে আহবানে ওই স্কুলে পড়াশুনা শুরু করি এবং তারই বাসায় অবস্থান করে পড়াশুনা করতাম।

জনাব মোল্লা স্যার শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্যে তিনি বিভিন্ন সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেন।তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি মঠবাড়ীয়া উপজেলা শাখার সভাপতি,জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।তিনি শিক্ষকগণের দাবী-দাওয়া আদায়ে সোচ্চার ছিলেন।তিনি ২০০২ সালে হজ্বব্রত পালন করেন।তিনি ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল অবসরগ্রহণ করেন।তিনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে লেখালেখি শুরু করেন এবং এখনো তিনি প্রিন্টিং এবং অনলাইন মিডিয়ায় লিখে যাচ্ছেন নিয়মিত।তিনি” বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি এবং জননন্দিত খান সাহেব হাতেম আলী জমাদ্দার” শিরোনামে ২ খানা বই রচনা করেন যা এখনও অপ্রকাশিত।বর্তমানে তিনি মঠবাড়ীয়াস্থ শেরেবাংলা সাধারণ পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি,মঠবাড়ীয়া উপজেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা ও মঠবাড়ীয়া পৌরসভা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সদস্য।তিনি বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট এর পিরোজপুর জেলা ইউনিটের আজীবন সদস্য।তিনি ২ পূত্র সন্তানের জনক।বর্তমানে বই পড়া,লেখালেখি এবং নাতী নাতনী আরাফাত,দীনা ও শিফা,অসংখ্য গুণগ্রহী নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন।

জনাব মোল্লা স্যার ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালীন সময়ে বুখইতলা বান্ধবপাড়া পোষ্ট অফিস প্রতিষ্ঠা করেন এবং আমার বাবা এই প্রতিষ্ঠানে তার চাকুরী জীবন শুরু করেন।১৯৮৮ সালে নূর হোসাইন মোল্লা পিরোজপুর জেলার সর্ববৃহৎ”সাপলেজা ইউনিয়ন পরিষদ”এ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ৫টি ভোটকেন্দ্র দখল করে তার বিরোধীপক্ষ জয়লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে সঠিক ভোটাধিকার প্রয়োগ হলে ৬০শতাংশাধিক ভোট পেয়ে জনাব মোল্লা স্যার বিজয়ী হতে পারতেন। ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সনে আমি তার বাসায় (প্রধান শিক্ষক কোয়ার্টার)থাকার সুবাদে জাতীয় নেতা মহিউদ্দীন আহমেদকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।ওই সময় জনাব মহিউদ্দীন আহমেদ মোল্লা স্যারের বাসায় এসে তাকে নিয়ে রাজনৈতিক আলাপ সহ নানাবিধ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে দেখেছি। জনাব মহিউদ্দীন আহমেদ আলহাজ্ব নূর হোসাইন মোল্লা স্যারের পারিবারিক আত্মীয়। জাতীয়নেতা মহিউদ্দীন আহমেদ মঠবাড়ীয়ায় আগমন করলে ডাকবাংলোতে থাকতেন তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার জন্য মাঝে মাঝে জনাব নূর হোসাইন মোল্লা স্যারকে ডেকে পাঠাতেন। মোল্লা স্যার আমার ফুফাতো ভাই হলেও তিনি আমার বাবার সিনিয়র। নূর হোসাইন মোল্লা আমাদের উপজেলার একজন আলোকিত মানুষ।

আলহাজ্ব নূর হোসাইন মোল্লা দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়।তিনি তার জীবনের প্রতিটিক্ষেত্রে শতভাগ সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছেন এবং কোন অসৎ কিংবা কোন রক্তচক্ষুকে কখনো তিনি প্রশ্রয় দেননি।তিনি তার মায়ের নামে” হাকিমুন্নেসা গ্রন্থাগার”প্রতিষ্ঠা করেছেন যাতে প্রায় তিন হাজারের মতো দূর্লভ গ্রন্থ রয়েছে।ছাত্রজীবন থেকে তিনি এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় কাজে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে আসছেন।অনেক খ্যাতিমান শিক্ষকেরা অবসরগ্রহণ করে নিস্ক্রিয় হলেও জনাব মোল্লা স্যার সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন প্রতিটি কর্মকান্ডে।তিনি উপজেলার অন্যতম প্রধান ইতিহাসবিদ হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন তার ইতিহাস সংক্রান্ত লিখণীর মাধ্যমে।শুধু তাই নয় ধর্মীয় সংক্রান্ত লিখণীতেও তিনি বেশ সিদ্ধহস্ত।তিনি দেশে-বিদেশে অনেক পাঠক সৃষ্টি করেছেন।আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে তিনি বেশ প্রশংসিত হয়েছেন।তার অনেক ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের বিভিন্ন উচ্চমহলে সুপ্রতিষ্ঠিত।মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন জনাব মোল্লা স্যারের সকল সৎকর্ম কবুল করে তাকে শতায়ু দীর্ঘ জীবন দান করুন।আমীন।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক , সাপ্তাহিক দেশগ্রাম এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান , বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সোসাইটি



মন্তব্য চালু নেই