প্রধান ম্যেনু

আমি প্রধানমন্ত্রী হলে বাংলাদেশের হিন্দুদের ‘দেশপ্রেম পদক’ দিতাম

মডারেট মুসলিমদের দেশ বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় আছে, এ রকম এক সময় বলতাম। এখন আর বলি না। দেশের মুসলিমও আর আগের মতো মডারেট নেই। ধর্মটা সেই ষাট-সত্তরের দশকে এত মূখ্য ছিল না মানুষের জীবনে। এখন মূখ্য হয়ে উঠেছে। সদা সত্য কথা বলবে, দুর্নীতি করবে না, মানুষকে ঠকাবে না, প্রতারণা করবে না, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে না, সকলের সঙ্গে দুঃখ সুখ ভাগাভাগি করবে, সহমর্মী হবে, সমতায় বিশ্বাস করবে; এই সব নীতিপালনের বদলে ধর্মপালনই যখন মূখ্য হয়ে ওঠে, তখন খানিকটা সমস্যা তৈরি হয়। কারণ তখন দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি, সহনাগরিকের প্রতি যে মানুষের স্বাভাবিক দায়িত্ব থাকে, নারী- পুরুষের মধ্যে সমতা তৈরির যে দায়িত্ব থাকে, সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ বজায় রাখার যে দায়িত্ব থাকে তা একেবারেই অনুভব করে না। কেউ যদি অনুভব করেও, তা মূখ্য নয়, নিতান্তই গৌণ।

ভোলার বোরহানুদ্দিন উপজেলায় যা ঘটেছে কিছুদিন ধরে, তা সত্যিই ভয়াবহ। কোনও এক বিপ্লব চন্দ্র শুভর আইডি হ্যাক করে ওই আইডি থেকে শরিফ আর ইমন নামে যে দুজন মুসলমান মহানবীকে গালি দিয়ে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তা চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে, যেন তাবৎ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে, যেন বিপ্লব চন্দ্র মুসলমানদের চাপাতির কোপ খেয়ে মরে; তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের কুকর্মের জন্য, কিন্তু বিপ্লবকে কেন একইসঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটিই আমার বোধগম্য নয়! অপরাধ না করেও কেউ কেন জেলে পড়ে থাকবে!

পুলিশের কাছে বিপ্লব চন্দ্র জানিয়েছে যে তার আইডি হ্যাক হয়েছে। পুলিশও বেশ ভালো করেই জানে যে বিপ্লব দোষী নয়, দোষী যদি কেউ হয়েই থাকে, সে শরিফ আর ইমন। তৌহিদী জনতাও সে কথা জানে। তারপরও জামাতি ইসলামীর আমির বিপ্লবের ফাঁসি দাবি করছেন। আসলে হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে উন্মত্ত ধর্মান্ধ জনতাকে লেলিয়ে দিয়ে ইসলামি দলগুলো রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে। সরকার যদি কঠোরভাবে এই সাম্প্রদায়িক ঘৃণা আর ষড়যন্ত্র খুব শীঘ্র দমন না করেন, তাহলে খুব বেশিদিন নেই বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যা শূন্য হতে।

বিপ্লবের ভগ্নিপতি বিধান চন্দ্র মজুমদারকে কে বা কারা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। একটি কালো কাঁচ মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন লোক নেমে ডিবি পরিচয় দিয়ে বিধানকে তার জুয়েলারি দোকান থেকে ডেকে নিয়ে মাইক্রোবাসে তুলেছে, সেই থেকে বিধানের ফোন বন্ধ। তার কোনও খোঁজ নেই। অপরাধ না করেও বাংলাদেশের হিন্দুরা নিরপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে না। তারা যে মুসলমান নয় এটিই তাদের দোষ! পাকিস্তানে হিন্দু মেয়েদের অপহরণ করে ধরে বেঁধে ধর্মান্তরিত করা হয়, মুসলমান পুরুষদের সঙ্গে বিয়েও জোর করে দেওয়া হয়।

এদিকে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ভয়ে পালাচ্ছে। মুসলমানদের এই অসহিষ্ণুতার উদাহরণ টেনে বিশ্বের মানুষ তো ইসলামের আর মুসলমানেরই দুর্নাম করছে। ইসলামী মৌলবাদীরাই কি তাহলে মুসলমানের সবচেয়ে বড় দুষমন নয়? এরা দাংগা বাঁধাবে, সংখ্যালঘুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করাবে, অত্যাচার করে দেশ থেকে তাড়াবে, রাস্তায় নেমে বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উন্মাদনা দেখাবে, অমুসলমানদের কতল করতে চাইবে, বুদ্ধিজীবিদের ফাঁসি চাইবে — এমন দেশে বিদেশিরা কেন আসবে অর্থ বিনিয়োগ করতে? এই দেশে কী কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে? গুলশান ক্যাফের ঘটনায় তো অনেকে পিছু হটেছে।

এদিকে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ যেভাবে হিন্দুদের অত্যাচার করছে, তা দেখে ভারতেও হিন্দুদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে, তারাও সুযোগ পেলে প্রতিবেশি মুসলমানদের অপকর্মে প্রতিশোধ নিচ্ছে নিজেদের মুসলমানদের মেরে। মুসলমান হিন্দুকে মারবে, তারপর হিন্দু মুসলমানকে মারবে, তখন মুসলমান আবার হিন্দুকে মারবে- এটি একটি চক্রের মতো। কে এটিকে সম্পূর্ণ বন্ধ করবে, কবে সম্প্রীতি ফিরে আসবে, কবে ধর্মান্ধরা মানুষকে মানুষ বলে বিচার করবে, তা আমি জানিনা। আমি শুধু কায়মনোবাক্যে কামনা করি, যেন শুভবুদ্ধির উদয় হয়। যেন মানুষ মানুষকে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান ইহুদি হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে দেখে। যেন মানুষ মানুষের বেদনায় সমব্যাথি হয়।

আই ডি যে হ্যাক করা যায়, সেটা পুলিশেরা বিপ্লবের ঘটনা দিয়ে না বুঝতেও পারেন, নিজেদের ঘটনা দিয়েই নিশ্চয়ই হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন। কারণ ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সারের ফেসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে। থানায় তিনি জিডি করেছেন। বিপ্লব চন্দ্রও জিডি করেছিল। এতটা সতর্ক হওয়ার পরও সে মুক্তি পায়নি। মানুষ ভেবেই নেবে নিশ্চয়ই সে অপরাধী, তা না হলে তাকে আটকে রাখা হয়েছে কেন। তাকে কি নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে? যদি দেওয়া হয়, তাহলে জানিয়ে দেওয়া হোক, যে, তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। মানুষ সত্যটা জানুক।

ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো বহু যুগ ধরে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার পায়ঁতারা করছে। জেলায় জেলায় সমাবেশ করে এখন হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লেলিয়ে দেওয়ার কাজে ভীষণভাবে তারা লিপ্ত। ভোলার হিন্দুদের ওপর আগেও হামলা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে অনেকগুলো হিন্দু গ্রামই তো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর আবারও নির্যাতন শুরু হয়েছে।প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা বাংলাদেশের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী দেশ ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ। দেশটির পেটের ভেতর বসে আছে ছোট্ট বাংলাদেশ। এই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে তিক্ত সম্পর্ক তৈরি করা কোনও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিকদের কাজ নয়।

ভোলা থমথমে। ইসলামী গোষ্ঠীগুলো নাশকতার সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে। হিন্দুদের বাড়িঘর মন্দির দোকানপাট ধংস করছে। মারাত্মক আতংকের মধ্যে ভোলার হিন্দুরা বাস করছে। আপাতত এসব খবর বিবিসি ছাড়া আর কোনও মিডিয়া প্রচার করছে না। ৪ বা ৫ হাজার দাংগাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে বলে বলছে। জামাতে ইসলামীর আমীর ৬ দফা দাবি করছে, বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে, বিল্পব চন্দ্রকে ফাঁসি দিতে হবে, ৪ নিহত পরিবারকে ক্ষতিপুরণ দিতে হবে, পোস্ট মর্টেম চলবে না ইত্যাদি। সবই ঠিক আছে, কিন্তু বিপ্লবকে কেন শাস্তি দিতে হবে, সেটিই বোধগম্য হলো না। বিপ্লব যে মেসেঞ্জারে মহানবীর বিরুদ্ধে কিছু লেখেনি, হিন্দুকে ফাঁসানোর জন্য দুজন মুসলমান যে লিখেছে, সে তো প্রমাণিত।

তাহলে কেন বিপ্লবকে শাস্তি দিতে চাইছে তারা? রসরাজের বেলায় ঠিক এমনই তো হয়েছিল। এক হিন্দুবিদ্বেষী মুসলমান রসরাজ নামের এক অশিক্ষিত হিন্দু জেলের নামে ফেসবুক আইডি খুলে মহানবীকে গালি দিল, ব্যস হিন্দু বাড়িঘর পুড়িয়ে দিল উন্মত্ত মুসলমানরা। নাসিরনগরে হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়ে যেতে কি আমরা দেখিনি সেদিন? যেসব মাদ্রাসার শিক্ষকেরা কদিন পর পরই শিশুদের ধর্ষণ করেন, মসজিদের যে ইমামরা প্রায়ই ধরা পড়েন ইয়াবা মাদকের ব্যবসা করতে গিয়ে, তারা সবাই আজ তৌহিদি জনতার মিছিলে শরীক হয়েছেন। নিরপরাধ হিন্দুদের নির্যাতন করার জন্য সকলেই তারা প্রস্তুত। ইমামদের এবং মাদ্রাসার মাওলানাদের সমাবেশ হচ্ছে দেশের সর্বত্র। তারা ঘোষণা করছেন ইসলামের অবমাননা বরদাস্ত করবেন না তারা।

আবারও বলছি, ইসলামের অবমাননা যদি কেউ করে থাকেন, তারাই করছেন। তারাই প্রমাণ করতে চাইছেন, ইসলাম একটি অসহিষ্ণু ধর্ম। প্রমাণ কর্তে চাইছেন, ইসলাম কোনও অমুসলিমকে, সে নিরপরাধ হলেও, ক্ষমা করে না। এই ধর্মান্ধ অপশক্তি বার বারই দেশকে উচ্ছন্নে নিয়ে যাচ্ছে। কারা দেশ জুড়ে এই মোল্লাতন্ত্রের উত্থানের জন্য দায়ী? এর উত্তর- সরকার, রাজনৈতিক দলগুলো, এবং অতি অবশ্যই বুদ্ধিজীবি সমাজ। এই বুদ্ধিজীবি সমাজ কিছুদিন আগে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার হত্যার বিরুদ্ধে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল, আজ তারা চুপ। এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবো, আরেক অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকবো, এই হলো আজকালকার বুদ্ধিজীবী চরিত্র।

ভারতেও ঠিক তাই, যারা মুসলমানদের ওপর হিন্দুর অত্যাচারকে বন্ধ করার জন্য চিৎকার করেন, তারা হিন্দুর ওপর মুসলমানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনও শব্দ উচ্চারণ করেন না। একই রকম যারা হিন্দুর ওপর মুসলমানদের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য চিৎকার করেন, তারা মুসলমানদের ওপর হিন্দুর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। বাংলাদেশে আসলে কতগুলো স্বার্থপর সুযোগসন্ধানী টকবাজ ঠগবাজ লোকদের বুদ্ধিজীবি বলা হয়। এদের বুদ্ধিজীবি হিসেবে সম্মান করাটা একেবারেই উচিত নয়।

প্রিয়া সাহা বোধ হয় হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পকে যা বলেছিলেন, তা খুব ভুল বলেননি। আমি যদি হিন্দু হতাম, আমি অনেক আগেই ওই দেশ ত্যাগ করতাম। যারা আছেন, কতটুকু ভালোবেসে আছেন সে দেশে, বুঝি। কিন্তু শত হুমকি সয়ে, মার খেয়ে, স্বর্বসান্ত হয়েও যারা ওদেশে আছেন, তাদের দেশপ্রেম কত প্রচণ্ড, ভেবে অবাক হই। আমি প্রধানমন্ত্রী হলে দেশে বাস করা হিন্দুদের ‘দেশপ্রেম পদক’ দিয়ে সম্মান জানাতাম। শেখ হাসিনা কী করবেন জানি না।

-প্রখ্যাত নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজ থেকে। এই লেখার সমস্ত দায়-দায়িত্ব লেখকের।



মন্তব্য চালু নেই