ইসলাম বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম ও যুক্তিভিত্তিক ধর্ম || মাওঃ শেখ মো. আব্দুল হক

করোনাভাইরাসের মহামারী সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২১লক্ষ বনি আদম আক্রান্ত, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সরকারি হিসেব মতে মৃতের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৭ হাজারের কাছাকাছি। আসল হিসেব আল্লাহ মালুম! বর্তমান বিশ্ব নেতাদের ভাষায় মহামারি হলেও একজন মুমিনের দৃষ্টিতে এটা নিঃসন্দেহে বিশ্ব নিয়ন্তার পক্ষ থেকে আসা গজব! সন্মানিত পাঠক- গজব যখন আসে তখন শুধু মন্দলোককে আক্রমন করে না ভালো মানুষের উপরও এর ছোঁয়া লাগে। ইতিহাসও কুরআন -সুন্নাহ ঘাটাঘাটি করলে এর নজির পাওয়া যায়। ক্কাওমে লুত ও সামুদের উপর আসা গজবের কথা আলোচনা নাইবা করলাম, মহানবী (সা.)-এর প্রিয় সাহাবিদের (রেদ) সময়ে খোদা দ্রোহী শক্তির নাফরমানির কারণে আসা মহামারিতে সাহাবায়ে কেরামের কেউ কেউ আক্রান্থ হয়েছেন এমনকি আশারায়ে-মুবাশশারার অন্যতম সাহাবী হযরত আবু ওবায়দা (রা.) ১৮হিজরী সনে মহামারিতে এন্তেকাল করেন।

তাহলে কী আমরা সেই সাহাবিদের চেয়ে ও নেককার হয়ে গেলাম? বুজুর্গ হয়ে গেলাম? আরেকটি কথা খায়বার যোদ্ধের সময় জনৈকা ইয়াহুদি মহিলা রাসুল (সা.) কে দাওয়াত দেয় এবং খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে দেয়। এতে একজন সাহাবী মারাও যান। রাসুলের (সা.) কিছু না হলেও এন্তেকালের সময় বলেছেন আমি সেই মহিলার মিশ্রিত বিষাক্ত খাদ্যের প্রতিক্রিয়া অনুভব করছি।আমরা কি রাসুলের (সা.) চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেলাম?

১.আল-কুরআনে বলা হয়েছে: ولاتلقوابایدیکم الی التهلکة আর নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের অতলে নিক্ষেপ করো না। (বাকারা/১৯৫) জেনেশুনে সামাজিক দূরত্ব না রেখে virus দারা আক্রান্ত হয়ে নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা উপরোক্ত আয়াত দারা নিষেধ করা হয়েছে।

২. হাদীসে বলা হয়েছেঃ ان لجسدک علیک حقا: তোমার ওপর তোমার শরীরের হক বা অধিকার রয়েছে। একটু ভেবে দেখুন, একথা বলা হয়নি যে, শরিরের ওপর তোমার হক্ক আছে। তাই শরীর ও জীবন রক্ষা করার সাধ্য মতো চেষ্টা করা হাদিস থেকে প্রমাণিত। বর্তমানে burning issue হচ্ছে মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায় করা না করা নিয়ে। প্রথমত বলতে হয়, ইসলামে ঈমানের সাথে সাথেই সালাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআানে ৮২ জায়গায় সালাত প্রসঙ্গে আয়াত বর্ণিত হয়েছে। এবং জামায়াতে সালাত আদায়ের ব্যপারে বলা হয়েছে, তোমরা রুকু কারীদের সাথে রুকু কর।(বাকার/৪৩) এছাড়া হাদীসে জামায়াতে নামাজের উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি জামায়াত ত্যাগের ব্যাপারে কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে। তাই জামায়াতে সালাত আদায় মুমিন জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এটাকে কোনভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এখন কেন ঘরে সালাত আদায়ের কথা বলা হয়? এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ইসলামের মৌলিক সংজ্ঞা বুঝা জরুরী।

“আল্লাহ প্রদত্ত রাসুল (সা.) প্রদর্শিত জীবন ব্যবস্থা নামক আদর্শের নাম ইসলাম।” এ সংজ্ঞানুযায়ী মহান আল্লাহর প্রত্যেকটি হুকুম রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী হতে হবে। মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায় করার নির্দেশ যেমন রাসুল (সা.) দিয়েছেন তেমনি আপদ কালীন সময়ে মসজিদে না আসার নির্দেশ রাসুলই (সা.) দিয়েছেন। বুখারী শরীফের হাদীসঃ الا صلوا فی رحا لکم তোমারা যার যার অবস্থানেই সালাত আদায় করো। জুম’আর দিন ঘুর্ণিঝড়, বজ্রপাত ও প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হওয়ায় রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং এ হুকুম দিয়েছিলেন।

who এর কথামতে করোনাভাইরাস অপ্রতিরোধ্য প্রাণঘাতি ব্যাধি। এবং তা মানুষ হতে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এখন পর্যন্ত এর কোন vaccine বা treatment আবিস্কার হয়নি। তাদের মতে বাচার একমাত্র উপায় Social distancey বা সামাজিক দূরত্ব। লকডাউন, আইসোলেশন, হোম কোয়ারান্টাইন এসবই সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে। যেহেতু মসজিদে গিয়ে জামায়াতে নামাজ আদায় করলে দূরত্ব রক্ষা অসম্ভব। শুধু এ কারণেই অর্থাৎ জীবন রক্ষার সার্থেই মসজিদে গিয়ে জামায়াত আদায় করতে সাময়িক সময়ের জন্য নিরুতসাহিত করা হচ্ছে। এটা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী নয়।

তারপর যে প্রশ্নটি থেকে যায় তা হলো, ইসলামে ছোঁয়াছে আছে কি? এ প্রসঙ্গে যে হাদিসটি বহুলপ্রচলিতঃ لا عدوی ولاطیرة ولاحابة ولا صفر الخ অর্থাৎ, ইসলামে ছোঁয়াছুঁয়ি বলতে কিছুই নেই এভাবে অনুবাদ প্রচলিত। এবং একারণে মুসলমানদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণার জন্ম নিয়েছে যে, ইসলামে ছোঁয়াছুয়ি বলতে কিছুই নেই। কিন্তু এই অর্থ বা অনুবাদ কতটা সঠিক তা বুঝা মুশকিল। কারণ হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে ،وفر عن المجذوم فرارک من الاسد কুষ্ঠ রুগী থেকে এমন ভাবে পালাও যে ভাবে সিংহ থেকে পালিয়ে থাকো। একই হাদীসের শেষাংশে কুষ্ঠ রুগী থেকে পালানোর কথা বলে রাসুল (সা.) রোগ সংক্রমন থেকে দূরত্ব সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছেন, এটা সুস্পষ্ট। অতএব এক তরফা ভাবে ছোঁয়াছে বলতে কিছু নেই এ কথা বলার সুযোগ নেই। সবশেষে বলা যায় ইসলাম হচ্ছে স্বভাব ধর্ম। মানবিক ধর্ম। বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম ও যুক্তিভিত্তিক ধর্ম! ইসলামে সংকীর্ণতা নেই। মহান আল্লাহ বলেন, لایکلف الله نفسا الا وسعها আল্লাহ মানুষের সাধ্যাতীত কোন বোঝা চাপিয়ে দেননি। তাই মানুষের safety and sicurity র জন্য প্রয়োজনে মসজিদে না গিয়ে নিজ অবস্থানে নামাজ আদায় করা বেঠিক নয়।

মাওঃ শেখ মো. আব্দুল হক
বিশিষ্ট মোফাচ্ছিরে কুরআন।
প্রিন্সিপাল, জামেয়া ইসলামিয়া মৌলভীবাজার।
খতিব, বায়তুল আমান জামে মসজিদ মৌলভীবাজার।
সভাপতি, জাতীয় ইমাম সমিতি, মৌলভীবাজার জেলা।



মন্তব্য চালু নেই