মেইন ম্যেনু

কোটি টাকার নতুন ভবনের ছাদ ফুটো, ঠিকাদার যুবলীগ নেতা

ঘষা দিলেই উঠে যায় নতুন ভবনের ঢালাই। নয় মাস না যেতেই ভবনের ছাদ চুইয়ে পড়ছে পানি। বৃষ্টি বেশি হলে ভবনের ভিআইপি রুমটি পানিতে ভেসে যায়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোনো কিছুর ঘষা লাগলেই ছাদের প্যাটার্ন স্টোন (ওয়ারিং কোর্স) ভেঙে বেরিয়ে আসছে বালু আর ছোট ছোট পাথর।খবর জাগোনিউজের।

কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্য নির্মিত কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনের দোতলা ভবনের বর্তমান অবস্থা এটি। রেলস্টেশন ভবন নির্মাণে ভয়াবহ দুর্নীতির কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

এ ভবনের ঠিকাদার ছিলেন রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলী। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কাজ শেষে রেলস্টেশন ভবনটি হস্তান্তর করেন তিনি। এরই মধ্যে ভবনের অবস্থা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

খবর পেয়ে সোমবার বিকেলে কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনের নতুন ভবনটি পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এ সময় ভবনটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন তারা। তবে স্টেশনমাস্টার উপস্থিত না থাকায় নতুন ভবনের ভিআইপি রুমে প্রবেশ করতে পারেননি তারা। নতুন ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছর দুয়েক আগে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় রেলস্টেশনের নতুন ভবন। নির্মাণকাজ করেন ঠিকাদার রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলী। রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করেন ঠিকাদার। সেই সঙ্গে দুর্নীতি করে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবনটি নির্মাণের সময় প্রতিবাদ করলে কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও ঠিকাদারের রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রভাবের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় স্থানীয়রা। কাজ চলাকালীন স্থানীয় ভাড়াটে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে বেশ কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করা হয়। প্রতিবাদকারীদের মামলা আর হুমকির ভয় দেখানো হয়। ফলে দোতলা ভবনটি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি হয়।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, ভবনটি নির্মাণে নিম্নমানের ইট, খোয়া ব্যবহার ছাড়াও বেশি পরিমাণ বালু ও কম সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। প্যাটার্ন স্টোন ঢালাই খুবই নিম্নমানের হওয়ায় পানি জমে ছাদ বেয়ে পানি ঢুকছে ভবনের ভেতর। ভবনটি নির্মাণের সময় প্রতিবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু ঠিকাদার যুবলীগ নেতা পুলিশ দিয়ে আমাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়েছেন।

ভবনটি নির্মাণের এক রাজমিস্ত্রি বলেন, ‘আমি কাজের নকশা দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার দেখাননি। উল্টো আমাকে হুমকি দিয়ে যেভাবে নির্মাণ করতে বলেছেন, আমি সেভাবেই ভবনের কাজ করেছি। মূল ভবনসহ সবক্ষেত্রে কম রড ব্যবহার করা হয়েছে। ঢালাইয়ে খোয়া আর সিমেন্টের অনুপাত ৪:১ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ৬:১ ও ৮:১ দেয়া হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি, এভাবে ভবন নির্মাণ করলে টিকবে না। ঠিকাদার বলেছেন যতদিন টিকে টিকুক।’

শুরুতে ভবনের কাজ করা শ্রমিক রায়হান আলী বলেন, রড-সিমেন্ট কম দেয়ার প্রতিবাদ করায় আমাকে কাজ থেকে বাদ দিয়েছেন ঠিকাদারের লোকজন। পুরো ভবনটি ডিজাইনবহির্ভূতভাবে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের বৈদ্যুতিক সামগ্রীও নিম্নমানের। সেপটিক ট্যাংক, ভবনের রঙ, দরজা-জালানাসহ সব কাজেই অনিয়ম হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, দুই সপ্তাহ আগে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মিয়া জাহান আলী সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের দুরবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এরপরও কোনো ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেননি তিনি।

তবে রেলওয়ের লালমনিরহাট ডিভিশনের সহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান চৌধুরীর দাবি, কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি বলেন, অন্যান্য সরকারি কাজের চেয়ে এ ভবনের নির্মাণকাজ ভালো হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে ঢালাই হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুজ্জামান খোকা বলেন, রাজশাহী যুবলীগের নেতা রমজান আলী ভবনের কাজটি করেছেন। কাজের মান ছিল খুবই খারাপ। নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট, খোয়া ছাড়াও বেশি বেশি বালু দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করেছেন। সিমেন্টের ব্যবহারও ছিল নামমাত্র।

আগামী ১৬ অক্টোবর কুড়িগ্রাম থেকে একটি আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন উপলক্ষে স্টেশনজুড়েই চলছে কাজের তোড়জোড়। নতুন এ ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়া, নষ্ট হওয়া চুনকাম করতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যাচ্ছে মিস্ত্রিদের।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের বলেন, রেল বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ভবনের কাজ করেছে ঠিকাদার। প্রতিবাদ করলেই প্রশাসন আর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে ভয় দেখানো হয়েছে স্থানীয়দের।

হস্তান্তরের আট মাস যেতে না যেতেই ভবনের ভিআইপি রুমের দেয়ালে ফাটল ও ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে ভিআইপি রুমে জমে থাকা পানির ব্যাপারে জানতে চাইলে স্টেশনমাস্টার কাবিল উদ্দিন বলেন, এই বিল্ডিং সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কে কখন হস্তান্তর করেছে তাও আমার জানা নেই। আমাকে একটি রুম ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে মাত্র।

১৬ অক্টোবর কুড়িগ্রাম থেকে একটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন উপলক্ষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজ চলার সময় ভবনের রুমে পানি ও দেয়ালে বৈদ্যুতিক লাইনের কাজের অবহেলা চোখে পড়ে। এর মধ্যে ভবনের যেসব অংশের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে সেগুলো চুনকাম করা হয়েছে।

কাজের তদারকি করা আব্দুল ওয়াদুদের উপস্থিতিতে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি পা দিয়ে ঘষা দিয়ে ছাদের ঢালাই তুলে ফেলেছেন। পরে দেখা যায় ঘষা দিলেই উঠে যায় ঢালাই।

এমন অবস্থা দেখে আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, নতুন ভবনের ঢালাই ঘষা দিলেই বালু-রড বের হয়ে যায়। কাজের মান মোটেও ভালো হয়নি। তবে ওই সময় তদারকির দায়িত্বে আমি ছিলাম না।

এ ব্যাপারে ঠিকাদার যুবলীগ নেতা রমজান আলী বলেন, ভবনের কাজ সঠিক নিয়মেই হয়েছে। কাজ চলাকালীন স্থানীয় রাজনৈতিক গণমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ভবন ডিজাইনে ত্রুটির কারণে এমনটি হয়েছে। রুমে পানি ঢোকার বিষয়টি আগেই কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছিলাম। কিন্তু তারা গুরুত্ব দেয়নি।

রুমে বৃষ্টির পানি পড়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার যতটুকু মনে হচ্ছে, জানালার ওপর কার্নিশ না থাকায় ছাদের পানি চুইয়ে পানি ঢুকতে পারে। নকশায় না থাকায় আমি চাইলেও কার্নিশ দেয়া সম্ভব হয়নি।

কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন পরিদর্শনকালে ভবনের অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন রাজশাহী রেল বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার মো. শহিদুল হক।

জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, টেকনিক্যাল বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত টিম গঠন করা হবে। তবে ভবনটি দেখে আমার মনে হয়েছে আরও সুন্দর করে নির্মাণ করা যেতো। সেটি করা হয়নি। তদন্ত করে দেখা হবে।

কোটি টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রাম রেল স্টেশন ভবন নির্মাণে দুর্নীতির চিত্র। ঠিকাদার রাজশাহী মহানগর যুবলীগের সভাপতি রমজান অালী।

Posted by Abdul Khalek Faruk on Sunday, 29 September 2019



মন্তব্য চালু নেই