কোভিড ১৯ কোয়ারেন্টাইন চলাকালীন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা

Corona Food

বর্তমানে সারাবিশ্ব করোনা মহামারী সংক্রমণে আক্রান্ত। ভাইরাসের বিস্তার কমাতে সমস্ত দেশের মানুষ আজ কোয়ারানটাইনে।

আজ অবধি চিকিতসার কার্যকর কোনও ওষুধ এবং ভ্যাকসিন আবিস্কার হয় নি। সুতরাং কোভিড 19 এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সর্বশেষ অবলম্বন। এই প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প কিছু নেই।

আমরা এখন আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তন করে কেবল করোনাকে পরাস্ত করতে পারি।

আমরা আমাদের খাদ্য তালিকাকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত করতে পারি
1. ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টস – কার্বোহাইড্রেট , প্রোটিন এবং ফ্যাট
২. মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস- ভিটামিন এবং মিনারেলস

কোয়ারানটাইনের এই সময় আমাদের দৈনন্দিন কাজের রুটিনের পরিবর্তন হওয়ার কারণে আমরা একঘেয়েমি অলস জীবনযাপন করছি, যেটা আমাদেরকে বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট জাতীয় অতিরিক্ত ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণকে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই মহামারী চলাকালীন সময়ে প্রতিনিয়ত আমরা মানসিক চাপের মধ্যে জীবনযাপন করছি। এই মানসিক চাপ হ্রাস করার জন্য ‘সেরোটোনিন’ প্রয়োজন। যা আমরা উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কার্বোহাইড্রেট ডায়েট গ্রহণের মাধ্যমে পেয়ে থাকি।

এই সময়ে আমাদের ঘুমের ও ব্যাঘাত ঘটে যেটি আবার স্ট্রেসকে বহু গুনে বাড়িয়ে দেয় এবং এই ভিসিয়াস সাইকেলটি চলতেই থাকে এবং আমাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহনে অভ্যস্থ করে দেয় ফলশ্রুতিতে আমরা ওবেসিটি (Obesity) তে ভুগতে পারি যা হৃদরোগ,ডায়াবেটিস, লিভারের রোগ সৃষ্টি করে এবং কোভিড সংক্রমণের জটিলতাকে ডেকে আনে।

সিডিসি (CDC) Obesity কে করোনার সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসাবে ঘোষনা করেছে ।

সুতরাং পরিমিত পরিমানে সুষম খাদ্য গ্রহন এই সময়ের জন্য অতীব জরুরি।

স্ট্রেস কমাতে এবং নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য সেরোটোনিন এবং মেলাটোনিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাই আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় কার্বোহাইড্রেট এর বিকল্প সেরোটোনিন এবং মেলাটোনিন সমৃদ্ধ অন্যান্য স্বাস্থকর খাবারগুলি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির খাদ্য যেমন মাটির নিচের সবজি, শাক, ফল, এবং বাদাম, কলা, চেরি এবং ওটস, বিভিন্ন প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যগুলিতে মেলাটোনিন এবং সেরোটোনিন থাকে।

এই খাবার গুলি আমাদের ব্রেন এর স্যাটাইটি সেন্ট্রার কে নিয়ন্ত্রন করে এবং অধিক ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ কে নিয়ন্ত্রণ করে।

টক দইয়ের মতো দুগ্ধজাত খাবারগুলি শরীরের ইমিউনিটির ন্যাচারাল কিলার কোষের ক্রিয়াকলাপকে বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

দেহের Cell mediated immunity বাড়াতে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যা যে কোন ভাইরাল সংক্রমণের প্রধান অস্ত্র হিসাবে কাজ করে।

সুতরাং আমাদের ডায়েট চার্টে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস, ভিটামিন এবং মিনারেলস সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করতে হবে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় জানা গেছে যে, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহকারী ফল এবং শাকসবজি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কার্যকর করতে পারে কারণ কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যেমন- ভিটামিন ই, ভিটামিন সি, এবং বেটা ক্যারোটিনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস হিসাবে কাজ করে।

মিষ্টি আলু, গাজর এবং সবুজ শাকসব্জিতে প্রচুর পরিমাণে বিটা ক্যারোটিন পাওয়া যায়, ভিটামিন সি লাল সমৃদ্ধ খাবার যেমন- মরিচ, কমলা, পেয়ারা, স্ট্রবেরি, ব্রোকলি, আম, লেবু এবং অন্যান্য ফলমূল এবং শাকসব্জী অন্তর্ভুক্ত। এই সময়ের জন্য সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ভিটামিন সি ব্যবহার করা যেতে পারে।

ভিটামিন ই এর প্রধান খাদ্য উত্স হ’ল উদ্ভিজ্জ তেল (সয়াবিন, সূর্যমুখী, কর্ন, এবং আখরোট), বাদাম, পালং শাক এবং ব্রোকলি। এই সময়ের জন্য সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ভিটামিন ই ব্যবহার করা যেতে পারে।

কোয়ারানটাইনের এই সময় আমাদের বাইরে কম বের হওয়ার কারনে খুব কম রোদের সংস্পশে আসি এবং ফলশ্রুতিতে শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি দেখা দেয়।

ভিটামিন ডি শ্বাসযন্ত্রকে সুরক্ষা দেয় এবং করোনার মতো এনভেলপড ভাইরাসগুলিকে মেরে ফেলে।শীতের সময়ে একারনে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ জনিত রোগ বেশি হয়।ভিটামিন ডি এর অভাবে ডায়েবেটিস, হাইপারটেনসন, স্ট্রোক, হৃদরোগ,ক্যান্সার এর ঝুকি বাড়ায় এবং যার ফলে কোভিড ১৯ এর সংক্রমনের ঝুকিও অনেকগুন বেড়ে যায়।

সুতরাং কোয়ারেন্টাইনের এই সময়ে খাদ্য তালিকায় ভিটামিন ডি এর উপস্থিতি অপরিহার্য ।মাছ, যকৃত, ডিমের কুসুম, দুধ, দই ভিটামিন ডি এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস, প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্ট হিসাবে ভিটামিন ডি ব্যবহার করা যেতে পারে।

আরেকটি প্রয়োজনীয় ট্রেস উপাদান হল জিংক যা ইমিউন ফাংশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা গেছে জিংক সার্স করোনভাইরাসের আরএনএ-নির্ভর আরএনএ পলিমেরেজকে বাধা দেয়। সাধারণত জিংকসমৃদ্ধ খাবারগুলো হচ্ছে মুরগি, লাল মাংস, বাদাম, কুমড়োর বীজ, তিলের বীজ, মটরশুটি এবং মসুর ডাল ।

পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি রক্তে পুষ্টি এবং যৌগগুলি পরিবহন করে, আপনার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, বর্জ্য থেকে মুক্তি দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিদিন ৮-১০ কাপ পানি খাওয়ার পরামর্শ দেয়।

একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে গরম পানি, চা বা কফি কোভিডের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। এটির পক্ষে কোনও শক্ত প্রমাণ নেই।

স্বাস্থ্যকর ডায়েটের পাশাপাশি আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন করা উচিত। ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা যোগব্যায়াম দিনে কমপক্ষে 30 মিনিট করা উচিত যা আমাদের দেহ এবং মন উভয়কে সতেজ করে তোলে। আমাদের সকলের সাবান দিয়ে কমপক্ষে 20 সেকেন্ডের জন্য ঘন ঘন হাত ধোওয়ার মতো কিছু স্বাস্থ্যকর নিয়ম মেনে চলা উচিত এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা।
ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।

———————————-

ডাঃ মোঃ রোকন-উজ-জামান
এমবিবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (মেডিসিন),
এমডি (নিউরোলজি)
মেডিসিন ও নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস এন্ড হসপিটাল, ঢাকা



মন্তব্য চালু নেই