জাপানি শিশুরা যে কারণে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী

জাপানি শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পুরো বিশ্বে প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সুস্বাস্থ্যের জন্য বিশ্বে তাদের আলাদা খ্যাতি রয়েছে। জাপানি শিশুরা কেন সবচেয়ে বেশি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে, তা নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

উপযোগী খাবার নির্ধারণ: আমরা সবাই আমাদের সন্তানের সুস্থতা এবং হাসিখুশি থাকা নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকি। কিন্তু দেখা যায় পরবর্তী প্রজন্মকে পুষ্ট করার উপযোগী খাবার নির্বাচনে অনেক পরিবার বিভ্রান্তির মধ্যে থাকে। দ্য ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী বড় একটি স্বাস্থ্য গবেষণার রেজাল্টে বলা হয়েছে, জাপানের শিশুরা দীর্ঘ আয়ু এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে, কেননা তাদের মা-বাবা তাদের খাদ্য বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। সমগ্র বিশ্বজুড়ে শিশুদের মেদবহুলতা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জাপানি শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঘটনার ব্যতিক্রম দেখা যায় অর্থাৎ তাদের দেহে স্বাভাবিক মেদ থাকে এবং দিনে দিনে তা আরও কমের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাপানি শিশুদের এমন স্বাস্থ্যের একমাত্র রহস্য হচ্ছে, তাদের জীবনধারা এবং খাওয়ার ধরন। তাদের মা-বাবারা খাদ্য বিষয়ে কঠোর সচেতনতা অবলম্বন করার ফলে তাদের খাদ্যাভ্যাস অন্যান্য শিশুদের তুলনায় আলাদা হয় এবং বিশ্বে তারা সবচেয়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়।

বাসার খাবার অনেক বেশি তৃপ্তিকর: জাপানিদের খাবারগুলো খুবই কার্যকর এবং পুষ্টিকর হয়ে থাকে। তাছাড়া শরীরের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পুষ্টি যদি আমরা পেয়ে যাই তাহলে অপ্রয়োজনীয় ক্ষুধা তৈরি হয় না এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা যায়। তার মানে এই নয় যে, আপনাকে সামুদ্রিক শৈবাল, সুশি, টফু ইত্যাদি খেতে হবে, বরং আপনার পরিবারের খাদ্যাভ্যাসকে কেবল একটু স্বাস্থ্যকর করে তুলুন। খাবারের তালিকায় বেশি করে ফলমূল, সবজি, শিমের বিচি, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ বেশি করে যোগ করুন। এই ধরনের খাবারগুলোতে ক্যালোরি কম কিন্তু পুষ্টিমান অনেক বেশি। চিনি এবং লবণমিশ্রিত প্রক্রিয়াজাতকৃত খাবার কম খান। এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসের ফলে স্থূলতা থেকে শুরু করে নানান শারীরিক সমস্যা দূরে রাখা যায় এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায়। জাপানের প্রধান খাদ্য সাধারণত ভাত। রুটি বা পাস্তার তুলনায় ভাতই জাপানিদের বেশি প্রিয়। ছোট দানার চালের ভাত, বাদামী চালের ভাত জাপানে খুবই জনপ্রিয়, তাছাড়া এই ধরনের চাল দিয়ে তৈরি ভাত প্রচুর পানিসমৃদ্ধ, নরম এবং বেশ পুষ্টিগুণসম্পন্ন। এ ধরনের ভাতে কম ক্যালরি থাকায় বেশি পরিমাণে পেট ভরে খেলেও মোটা হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং অন্যান্য অপুষ্টিকর খাবার এড়িয়ে চলা যায়।

খাবারকে উপভোগ করা এবং কিছুটা সংযম থাকা: আপনার শিশুকে মাঝেমধ্যে বাইরের বিভিন্ন খাবার খেতে উৎসাহিত করুন। তবে খেয়াল রাখবেন তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়ে যায়। জাপানে শিশুদের মধ্যে বাইরের বিভিন্ন খাবার খাওয়ায় প্রবণতা বেশ কম। তোমোমি তাকাহাসি নামে জাপানি এক পুষ্টিবিদ বলেন, ‘আপনার বেশি কঠোর হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করুন যাতে সে স্বাচ্ছন্দ্যে খেতে পারে। খাবার অনেক মজার হয়েছে, তার সামনে এমন ভাব করুন।’ আপনার শিশুর খাদ্য সম্পর্কিত ধারণার বিকাশের জন্য তার সঙ্গে একসাথে খাওয়ায় অভ্যাস করুন। আপনি যতই ব্যস্ত থাকেন না কেন দিনে অন্তত একবার তাকে সঙ্গে নিয়ে খেতে বসুন। ভালোবাসা এবং আনন্দের সঙ্গে আপনার সন্তানের জন্য রান্না করুন। এতে করে তাকে খাওয়ানোর প্রতি আপনার আগ্রহ বাড়বে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসকল পরিবার একসঙ্গে বসে খাবার খায় তাদের মধ্যে অন্যান্য পরিবারের চেয়ে সম্পর্কের দৃঢ়তা বেশি থাকে।

শিশুকে নিত্যনতুন খাবার খেতে উৎসাহিত করা: শিশুদের খাবারের পছন্দ-অপছন্দ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হতে থাকে। সেকারণে নানা ধরনের পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আপনার সন্তানকে অভ্যস্ত করতে পারেন। বিভিন্ন রকমের পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে কোনো শিশুর যত তাড়াতাড়ি এবং অধিকমাত্রায় পরিচয় ঘটবে, ভবিষ্যতে তার স্বাস্থ্য তত বেশি চমকপ্রদ হবে। একটি শিশু যত বেশি স্বাস্থ্যকর খাবারের সংস্পর্শে আসবে, তার খাবার খাওয়ার চাহিদা বাড়বে, ইচ্ছা বাড়বে এবং সে খাবার উপভোগ করতে শিখবে। আপনি চাইলে লাগাতার আপনার সন্তানকে নতুন নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। একেবারে ছোট শিশুদের মাত্র একটি খাবারের অভ্যাস থাকলে চলে, ২ বছরের উপরের বাচ্চাদের অন্তত ২০টি ভিন্ন খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা উচিত। সুতরাং আপনার সন্তানকে প্রতিনিয়ত নতুন খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে দিন। প্রয়োজনে প্রতিটি ভিন্ন খাবারের সামান্য করে অংশ তাদের খেতে বাধ্য করুন। জাপানি এক প্রবাদে বলা হয়েছে, ‘নতুন একটি খাদ্য একটি মানুষের আয়ু বাড়িয়ে দেয়।’

তৈজসপত্র জাপানি কায়দায় সাজানো: আমরা সবাই বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের খাবার পরিবেশন করার পদ্ধতি জানি। তাদের পরিবেশনের এরকম পদ্ধতির ফলে আমরা প্রতিনিয়ত বেশি খাবার খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। আপনি যদি খাবারের পরিমাণ কমাতে চান তাহলে বড় আকারের প্লেট ব্যবহার বাদ দিয়ে সালাদ বা পাউরুটি রাখার মতো ছোট প্লেটে খাবার পরিবেশন করুন। প্রায় সবাই ৪-৬ ইঞ্চি পরিধির খাবার প্লেট ব্যবহার করে থাকেন। তাছাড়া অধিকাংশ পরিবারে ১-৩ ইঞ্চি পরিধির বাটি ব্যবহৃত হয়। খাবার নিয়ে গবেষণাকারী বিভিন্ন সংস্থা ইদানিং ছোট আকারের তৈজসপত্রে খাবার পরিবেশনের পরামর্শ প্রচার করছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বড় পাত্রে খাবার দিলে শিশুরা তা সুষ্ঠুভাবে খেতে পারে না এবং প্রচুর খাবার নষ্ট করে। একারণে বাচ্চাদের ছোট পাত্রে খাবার দিলে তারা তাদের ক্ষুধা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার খেতে পারে। জাপানিরা ছোট পাত্রে খাবার খায় এবং তাদের খাদ্যতালিকায় ফলের পাশাপাশি সবজি থাকেই।

শিশুদের দৌড়ঝাপ করা শেখানো: এখনকার বাচ্চাদের ভিডিও গেমস বা অন্যান্য মনোরঞ্জক বিষয় থেকে সরিয়ে আনা খুবই কঠিন একটা কাজ। তারপরও সারাদিনে মাত্র এক ঘণ্টা হলেও তাদের শারীরিক কসরতের পিছনে সময় দেওয়া উচিত। আনন্দের সঙ্গে স্কুলে হেঁটে যাওয়া বা কোথাও ঘুরতে গেলে হাঁটাহাঁটি করা জাপানি শিশুদের একরকম অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় জাপানে শতকরা ৯৮.৩ শতাংশ ছেলেমেয়ে হেঁটে স্কুলে যায় এবং প্রচুর সাইকেল চালায়। এ কারণে জাপানি শিশুদের মেদ বৃদ্ধির হার কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা অনুযায়ী, ৫-১৭ বছর বয়সীদের শারীরিক কসরতের ফলে তাদের সুন্দর স্বাস্থ্য গঠিত হয়। প্রতিটি শিশুই খেলতে পছন্দ করে এবং এটা প্রাকৃতিক একটা ব্যাপার। তারা উপযুক্ত পরিবেশ পেলে সবধরনের খেলাধুলা করে থাকে। আপনার সন্তানকে খেলাধুলার জন্য বাইরে পাঠান যাতে সে অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলার মাধ্যমে পরিচিত হতে পারে। এর ফলে তাদের স্বাস্থ্য সঠন এবং সামাজিকতা দুটিই শেখা হয়।

খাওয়া-দাওয়ার পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা: খাদ্যগ্রহণের জন্য পুরোদস্তুর পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করুন। নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে খাবার খাওয়া এবং সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ আপনার সন্তানের জন্য উপকারী। শিশুদের বিভিন্ন খাবার রান্নার সঙ্গে পরিচয় করানোর জন্য তাদের নিয়ে একটি গবেষণাও করা হয়। শিশুদেরকে বিভিন্ন খাবার রান্না দেখানোর জন্য ৬-১০ বছরের কয়েকজন শিশুকে বেশ কয়েকটি রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে করে তারা খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি রান্নাপ্রণালী সম্পর্কে জানতে পারে। এর ফলে তাদের খাদ্যের পছন্দ তৈরি হয় এবং খাবার খাওয়ার রুচিও তৈরি হয়। কিন্তু এখনকার দিনে সবার কর্মব্যস্ততা বেশি থাকায় সপরিবারে একসঙ্গে খেতে বসার প্রথা পালন করাটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপরিবারে খাবার খেতে বসার ব্যাপারটা পুরোপুরি না মানা গেলেও জাপানিরা কিন্তু তাদের এই প্রথা ধরেই রেখেছে। এ কারণে জাপানি শিশুরা সাধারণত উন্নত স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে।

বাচ্চাদের ওপর কর্তৃত্ব খাটানো: কিছু মানুষ এমন আছেন যারা তাদের সন্তানের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু সন্তানের স্বাস্থ্য এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপারটা দোষের কিছুই নয়। জাপানি অভিভাবকগণ তাদের সন্তানের ওপর আধিপত্য বিস্তারকে সন্তানের জন্য উপকারী বলে মনে করেন। সন্তানদের ওপর আধিপত্য বজায় থাকলে তারা ধীরে ধীরে নিয়ম-শৃঙ্খলা শিখতে শুরু করে। তাদের মানসিক বিকাশের নানান দিক এভাবে উন্মোচিত হয়। তবে কিছু অভিভাবক সন্তানদের পিছনে সবসময় ঘ্যান ঘ্যান করেন। এতে করে আপনার সন্তান আপনার প্রতি বিরক্ত হয়ে আপনাকে ঘৃণা করা শুরু করতে পারে। তাই আপনার সন্তানকে সঠিক রাস্তায় হাঁটার পথ দেখান, পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া শেখান।

তথ্যসূত্র: দ্য হেলদি



মন্তব্য চালু নেই