জীবনযুদ্ধে সংগ্রামী এক ওএমএস’র ডিলার রনজু আরা বেগম

জীবন মানে যুদ্ধ, যদি তুমি লড়তে পারো। জীবন মানে সংগ্রাম, যদি তুমি করতে পারো। আর এই লড়াই-সংগ্রাম যদি হয় একজন নারীর জীবনে তাহলে জীবনের অর্থটাই যেন পাল্টে যায়। সময়ের সাথে সাথে যখন জীবনের গল্পটা বদলে যায় তখন জীবনটাও বদলে নতুনে মোড় নেয়। তবে জীবনের এই মোড়টা যখন সাদাকালো অধ্যায়ের হয় তখন চতুর্পাশটায় যেন ঘটে যায় প্রলয়। দিনে দিনে হার না মানা যত নারীর গল্প আমরা পড়েছি সবারই ছিল রঙিন জীবনের একপশলা সাদাকালো অধ্যায়।

রনজু আরা বেগম। জীবন যুদ্ধে হার না মানা এক সংগ্রামী নারী। সাতক্ষীরা পৌরসভার ঝুটিতলা বাজারে ওএমএস’র ডিলার তিনি। বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য অধিদফতরের বিশেষ ওএমএস’র ডিলার হিসেবে সপ্তাহে তিন দিন সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাউল বিক্রয় করে থাকেন। বর্তমানে করোনার মধ্যেও সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে প্রতি রবি, মঙ্গল ও বৃহষ্পতিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খাদ্য সরবারহ করে যাচ্ছেন এই সংগ্রামী নারী।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিস সাতক্ষীরার নির্দেশনা মোতাবেক সাতক্ষীরা পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের মাঝে একজন নারী হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে চাল সরবারহ করে মানুষের নজরে এসেছেন তিনি। বিশেষ ওএমএস কার্ড প্রাপ্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত নারী পুরুষ ভোর থেকে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। নারী ও পুরুষের পৃথক লাইনে সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ১০ টাকা কেজি দরের চাউল সংগ্রহ করছেন সবাই।

একজন নারী হয়ে রনজু আরা বেগমের এই কাজটা সহজ ছিল না। তবে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি আজ এখানে টিকে আছেন। মানুষের সহযোগিতা যেমন পেয়েছেন তেমনই ধাপে ধাপে তার বাঁধাটাও কম ছিল না। কোনো কিছুই সেদিন দমাতে পারেনি এই অদম্য সাহসী আর সংগ্রামী নারীকে।

স্বামীহারা এই নারীর কাঁধে দায়িত্বের বোঝা কম নয়। ২ মেয়ে আর ১ ছেলেকে ঘিরেই তার এমন জীবনযুদ্ধ। সন্তানরা এখন তার বেঁচে থাকার বড় প্রেরণা। দায়িত্বের বোঝা একদিন কমবে, জীবনের সাদাকালো অধ্যায়ও একদিন প্রিয় সন্তানদের ঘিরে রঙিন হবে এমন স্বপ্নগুলো যেন তাঁর এখনকার সারথী।

২০১৭ সালে ক্যান্সারে মারা যান রনজু আরা বেগমের স্বামী। শিশু বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্বামীর মৃত্যুর ৪১ দিন পর তিনি বাইরে পা রাখেন। দায়িত্ব নেন স্বামীর ওএমএস এর ডিলার শিপসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজও তিনি দাঁড়িয়ে আছেন স্বামীর রেখে যাওয়া ডিলার শিপ’টি আঁকড়ে। এই ডিলার শিপটিতে খুঁজে পান না ফেরার দেশে চলে যাওয়া প্রিয়তম স্বামীর সকল স্মৃতি।

একজন নারী হিসেবে ওএমএস ডিলার চালানো দুরূহ ব্যাপার হলেও শ্বশুর বাড়ির ও এলাকার মানুষজনের সহযোগিতা সেদিন তার শক্তি যুগিয়েছিল। পাশাপাশি ওএমএস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আর অন্যান্য ডিলারদের সহযোগীতার প্রতি তিনি আজও কৃতজ্ঞ।

নারী হয়েও ওএমএস’র চাল বিক্রিকালে তিনি যে সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করেছেন তাতে মুগ্ধ হোন খোদ ক্রেতারাও। শহরের উত্তর কাটিয়ার মোহিমেনুল ইসলাম বলেন, কার্ড জমা দিয়ে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি। শৃঙ্খলতার সাথে চাউল দিতে দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। কাটিয়া থেকে জরিনা খাতুন, আম্বিয়া বিবি তারাও একই মতামত প্রকাশ করেন।

ওএমএস ডিলার রনজু আরা বলেন, পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম পালনের মধ্যে প্রতিদিন ২ শতাধিক কার্ড জমা নিয়ে চাল বিক্রয় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের যাতে ভোগান্তি কমে যায় সে জন্য দ্রæততার সাথে সঠিক পরিমাপে নিয়ম অনুযায়ী চাউল বিক্রি করছেন। তাছাড়া একজন নারী হয়ে ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের হাজার হাজার মানুষের মাঝে চাউল বিক্রয় করা তাঁর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও সকলের সহযোগিতার কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে বলে জানান তিনি।

লেখক : আবু রায়হান মিকাঈল
গণমাধ্যমকর্মী



মন্তব্য চালু নেই