প্রধান ম্যেনু

ডেঙ্গু থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়!

একটা কথা প্রচলিত আছে, যে ঢোল বানায় তার ধারনা দেশের সমস্ত সমস্যার মূলে আছে ঢোলের ব্যবহার কমে যাওয়া। আমি তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করায় অনেকে মনে করতে পারেন যে আমি তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার না হওয়াকে দায়ী করব। আমি প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলব, সেটা হতে পারে তথ্য-প্রযুক্তি বা অন্য যে কোন প্রযুক্তি। এই একটি জিনিসই মানুষের জীবনকে সহজ করে দিতে পারে।

সত্যিই, তথ্য-প্রযুক্তির সঠিক ও কার্যকরী ব্যবস্থা গড়ে তুলে ডেঙ্গুর মতো অনেক রোগ ব্যাধি কমিয়ে আনা যায়। কলকাতা এর সীমিত ব্যবহার করে সুফল পেয়েছে। যাইহোক, প্রথমে আসুন একটু মশা নিয়ে কথা বলি।

বিবর্তনের পথ ধরে ঠিক কবে মশার উৎপত্তি হয়েছিল সেটা জানিনা তবে ১০ কোটি বছর পূর্বেও যে মশার উপস্থিতি ছিল সেটা মশার ফসিল আবিষ্কারের মাধ্যমে জানা গেছে। অনেক প্রজাতির মশা আছে, প্রায় ২৭০০। আমাদের দেশের সচারচার যে মশা সবচেয়ে বেশী, যা ঢোবা, নালা, নর্দমা, নোংরা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জন্মে তা কিউলেক্স। কিউলেক্স ফাইলেরিয়ার মত রোগ ছড়ায়। সিটি কর্পোরেশনের লোকজন কামান দাগিয়ে এই মশাই মারতে পারে, যা জনগনের মশার কামড়ের ভোগান্তি থেকে বাঁচাবে। কিন্তু ডেঙ্গুর জন্য যে এডিস মশা দায়ী তা এই কামানে, মেয়রদের তর্জন-গর্জন, কার্যকরী বা অকার্যকরী ওষুধ কেনার হরিলুটের মাধ্যমে মরবে না।

একটা সাধারন মশার জীবনকাল ২ সপ্তাহ থেকে ১ মাস। মশা এক ঘন্টায় এক থেকে দেড় মাইল পর্যন্ত দূরে যেতে পারে তবে সচারচর একটানা এমন ওড়ে না যদি আশপাশে তার জন্য যথেষ্ঠ খাদ্য, মানুষ, প্রাণী প্রস্তুত থাকে। জীবনের তাগিদে এর চেয়ে দূরেও যেতে পারে। একটি এডিস মশা বা এশিয়ান টাইগার যে নামেই তাকে ডাকুন, তার পুরো জীবনকাল ১৫ দিন থেকে ১ মাসে সাধারনত ৫০০ মিটার বা হাফ কিলোমিটার উড়াউড়ি করতে পারে। সর্বোচ্চ ২০/২৫ ফুট উচ্চতায় উঠতে পারে। উৎপত্তিস্থল থেকে সাধারনত ১০০-১৫০ ফিট পর্যন্ত উড়াউড়ি করে। তাহলে বুঝতেই পারছেন ২/৩ টা বাড়ি, ফ্ল্যাট, স্কুলের রুমেই এর বিচরন।

এডিস মশা সাধানত ভদ্র পরিবেশে থাকে। খুবই চালাক এই মশা। কোথায় পানি জমতে পারে তার জ্ঞান এরা রাখে। ঘরে, বাড়িতে, ছাদে, কোনায়, চিপায়, ভাঙ্গা পাত্রে, ফুলের টবে, টায়ারে এসব জিনিসের একেবারে কিনারে এরা ডিম পাড়ে। এই ডিম ১ বছর পর্যন্ত ভাল থাকতে পারে। কোন সময় ঐ পাত্রে পানি জমে কিনার পর্যন্ত পৌঁছালে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তাহলে কোন পাত্র যদি উপুড় করা থাকে বা কোন পানি জমার সম্ভাব্য স্থান যদি আপনার ঘর, বাড়ির ত্রি-সীমানায় না থাকে তবে এডিস মশা সেখানে ডিম দিবে না।

এডিস মশা থাকে ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানে যেমন সোফার নীচে, টেবিলের কোনায়। সকাল, সন্ধ্যায় অল্প আলোতে এরা বাইরে এসে কামড়ায়। একমাত্র স্ত্রী মশা মানুষকে কামড় দেয়। রক্ত এদের খাদ্য নয়। মশার খাদ্য হলো গাছের রস, নির্যাস। এদের ডিমের পরিপক্কতার জন্য গরম রক্তের প্রয়োজন হয়। এরা সাধারনত এ কারনে মানুষকে কামড় দেয়। মানুষের আশেপাশেই এদের বসবাস। মশা কিন্তু নিজে ডেঙ্গু বা অন্য রোগের ভাইরাস জন্ম দেয় না। একজন মানুষ থেকে অন্যজন মানুষের শরীরে এরা ডেঙ্গুর জীবানু ছড়িয়ে দেয়। মানে হলো আপনার আশে-পাশে যদি কারো ডেঙ্গু হয় এবং সেখানে এডিস মশা থাকে তবে সেই মশা প্রথম একদি সেই রোগীকে কামড় দিয়ে পরে আপনাকে কামড়ালে আপনারও ডেঙ্গু হতে পারে।

তাহলে সমাধান কি ? ডেঙ্গুর ভ্যকসিন কিন্তু আরো কয়েক বছর আগেই আবিষ্কার হয়েছে। এমনকি ফিলিপাইনে লক্ষাধিক শিশুর শরীরে তার প্রয়োগও হয়েছে। আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুমদোনও দিয়েছে। তবে এর কিছু বিতর্কিত দিক আছে যার কারনে এটি এখনো ব্যপকভাবে চালু হয়নি। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ, হয়র আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। তাহলে সমাধান ? সিটি কর্পোরেশন মশক নিধনের নামে হরিলুটের উৎসব করবে ?

যেহেতু এই এশিয়ান টাইগার ওরফে ডেঙ্গু মশা ঘরে বাড়িতে ২ মিলি পর্যন্ত জমে থাকা পরিষ্কার স্বচ্ছ পানিতে জন্মে সেজন্য সেই উৎসগুলো নির্মূল করতে হবে। আমি করলাম, আমার পাশের বাড়ির লোক করলো না। তখন ? এখানেই সরকারের ভূমিকা। সর্বপ্রথম মানুষকে ব্যাপক সচেতন করতে হবে। সেটা মন্ত্রী, বলদ অভিনেতা অভিনেত্রীদের রাস্তা ঝাড়ু নয়, কার্যকরীভাবে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে করতে হবে। মানুষ যেনো ডেঙ্গুর লক্ষন দেখলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে টেস্ট করে এমন সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় তথ্য সার্ভার দরকার যেখানে দেশের/ঢাকার সমস্ত রোগীর রোগ ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকবে। আগের না হলেও এখন থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে টেস্টসমূহ হবে তার সকল তথ্য ও ফলাফল সরকারের একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে যাবে। এমনভাবে সিস্টেম/সফটওয়্যার ডেভেলপ করতে হবে যেনো রিপোর্টের তথ্যসমূহ প্রিন্ট করার সঙ্গে সঙ্গে সার্ভারে জমা হয়। একটি টিম সেই তথ্য বিশ্লেষণ করবে প্রতিদিন। ধরে ধরে প্রতিটি রিপোর্ট দেখতে হবে না। কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেমন কোথাও ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত হলে একটি কুইক রেসপন্স টিম সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নেমে পড়বে। সেই রোগীর বাড়ি, ফ্ল্যাট, আশপাশের বাড়ি ঘর সব তন্ন তন্ন করে দেখবে কোথাও এডিস মশার ডিম, লার্ভা বা স্বয়ং মশার উপস্থিতি আছে কিনা বা ডিম পাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ আছে কিনা। সেই টিম সেগুলো ধ্বংস করবে। তাহলে সেই রোগী থেকে আর ডেঙ্গু ছড়াবে না আশপাশের কারো। বাড়ি/ফ্ল্যাটের মালিকের কোন ভুল ও গাফিলতি চোখে পড়লে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করবে, টিমের ঐদিনের সমস্ত খরচ বাড়িওয়ালা বহন করতে বাধ্য থাকবে।

এমন একটি রোগের তথ্য সার্ভার শুধু ডেংগু নয়, অন্য সমস্ত ভয়ংকর রোগ ব্যাধি মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকরী হবে। একদম কম খরচে এই ম্যানেজমেন্ট সবচেয়ে উপযোগী হবে যদিনা ২০ জন আমলা আমেরিকায় প্রমোদ ভ্রমনে গিয়ে অভিজ্ঞতা না আনতে যায়। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জিং তথ্য-প্রযুক্তির বাস্তবায়নেও সরকারের অনেক দক্ষ চৌকস কর্মকর্তা আছেন। আমি একজন উপ সচিবের কথা জানি যিনি এই দায়িত্ব পেলে সফলতার সঙ্গে তার করে দেখাতে পারেন। এই যুগ তথ্যের। যার কাছে যত বেশী তথ্য সে ততো বেশী স্মার্ট। আপনার কাছে যদি উপযুক্ত তথ্য থাকে তবে তা বিশ্লেষন করে ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সহজ হয়। সমস্যাকে লুকিয়ে নয়, সমস্যা স্বীকার করেই সেটা মোকাবেলা করতে হবে।

যেহেতু একজনের ডেঙ্গু হলে অন্য একজনের হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় সেহেতু কোথায় কার কখন ডেঙ্গু হচ্ছে এই তথ্য জানা ও সেমতে ব্যবস্থা নেয়াটা খুবই জরুরী। মানুষকে বাধ্য করতে হবে তার বাড়ি ও আশপাশের এডিস মশার বৃদ্ধি রোধের ব্যবস্থা নিতে। এটা মোটেই খরচ সাপেক্ষ কিছু নয়। শুধু বর্ষাকাল নয়, সারাবছর জুড়েই তৎপর থাকতে হবে ডেঙ্গু মোকাবেলার কুইক রেসপন্স টিম কে। এই বছরের ডেঙ্গুতে এটা কার্যকর না হলেও ২/৩ বছরের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা নয়, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাই কমে দাঁড়াবে ২০-৫০ জনে মাত্র। চ্যালেঞ্জ ! ছোট্ট একটা কুইক রেসপন্স টিম, নাগরিকদের রোগ পরীক্ষার তথ্য সম্বলিত একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার। এইটুকুই। শুধু দরকার কিছু মানুষের স্বদিচ্ছা।

শেষে একটি কথা, যদি এইডস/এইচ, আই ভি ছড়াতো কোন মশার মাধ্যমে তবে কি হতো পৃথিবীর অবস্থা ? আশার কথা হলো, এই এইডস এর ভাইরাস মশার শরীরে বাঁচে না, শরীরে ঢুকলেও হজম হয়ে যায়।

এস এম সাইফুর রহমান এর ফেসবুক থেকে নেওয়া


 



মন্তব্য চালু নেই