মেইন ম্যেনু

দুই বন্ধু দেশের মধ্যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া কেন?

পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের অদূরেই ফুলবাড়ি-বাংলাবান্ধা আন্তর্জাতিক সীমান্ত চেকপোস্ট, আর তার বাঁদিকে কাঁটাতারের বেড়ার পাশ ঘেঁষে চলে গেছে ‘বর্ডার রোড’।

রাস্তার পাশেই তিন স্তর-বিশিষ্ট কাঁটাতারের বেড়া, প্রায় আট ফিট উঁচু সেই দেওয়াল টপকানো একরকম অসম্ভব।

কয়েকশো গজ পর পর রাস্তার পাশে বিএসএফের নজরদারি পোস্ট, বন্দুকধারী জওয়ানরা সেখানে চব্বিশ ঘন্টার পাহারায়।

বস্তুত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে সুদীর্ঘ চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি স্থল-সীমান্ত, তার প্রায় পুরোটা জুড়েই এই ধরনের কাঁটাতারের বেড়া বসানোর কাজ সেরে ফেলেছে ভারত।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান বা নেপালের মতো ভারতের আরও যে সব মিত্র দেশ আছে, তাদের সীমান্তে এধরনের কোনও বেড়া না-থাকলেও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের চরিত্রই পুরোপুরি বদলে দিয়েছে এই কাঁটাতার।

কিন্তু সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে এই বেড়া? চোরাকারবার কি এতে কমছে? দুপারের মানুষের যোগাযোগে কি বাধার দেওয়াল তৈরি হচ্ছে?

বাংলাদেশই বা এই কাঁটাতারের বেড়াকে কী চোখে দেখছে?

‘কাঁটাতারের ওপাশে পৈতৃক জমি’

বর্ডার রোড ধরে কিছুটা এগিয়েই গিয়ে পড়লাম সর্দারপাড়া গ্রামে, কাঁটাতারের বেড়া যে জনপদের জীবনযাত্রাকেই আমূল বদলে দিয়েছে।

সর্দারপাড়ার যুবক জিয়াউল হোসেন চাষীর ছেলে, কিন্তু এখন চাষবাস ভুলে তাকে শিলিগুড়িতে রোজ দিনমজুরের কাজ করতে যেতে হয়।

কারণটা আর কিছুই নয়, কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে পড়ে তাদের পৈতৃক চাষের জমি একরকম ‘খরচের খাতা’য় চলে গেছে।

জিয়াউল বলছিলেন, “আমাদের যে তারকাঁটা হয়েছে, তারকাঁটার ভেতরে যে জমিগুলো পড়েছে সেখানে এখন কিন্তু আমরা আবাদ করতে পারি না।”

“আমাদের অন্তত সাত বিঘা জমি ছিল ওপাশে, কিন্তু চাষ হয় না – যেতেই দেয় না ওদিকে। কী বলব বলেন, বর্ডার এখন একটা কারাগারে পরিণত হয়েছে।”

গভীর আক্ষেপের সঙ্গে জোবেইদা খাতুনও পাশ থেকে যোগ করেন, “কৃষিকাজই করতে দেয় না। যেতে দেয় না ওদিকে, এটাই অসুবিধা।”

“কার্ড দেখিয়ে যেতে দেওয়ার কথা, কিন্তু অন্য গ্রামে দিলেও আমাদের সেটাও দেয় না। আমরা গরিব মানুষ, যেতে না-দিলে কী করে কাজ করব বলুন?”

তিনি যে কার্ডের কথা বলছিলেন, সেই পরিচয়পত্র ইস্যু করেছেন বিএসএফের স্থানীয় কর্মকর্তারাই।

এই কার্ড দেখিয়ে তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গেট খুলে কাঁটাতারের ওপাশে চাষ করতে যেতে দেওয়ার কথা – কিন্তু বিষয়টা আসলে নির্ভর করে বিএসএফের খেয়ালখুশির ওপর।

সর্দারপাড়ার গ্রামবাসী আনজুআরা বেগমও জানাচ্ছিলেন, “ওখানে কার্ড দেখালেও বিএসএফ কিছুতেই যেতে দেয় না।”

“কিছুই করতে পারি না, এদিকে ওর বাবারও কাজ-কাম নেই, ঘরেই বসে থাকে।”

“জমি-জায়গা তো সব আমাদের তারকাটার ভেতরে পড়েছে, কিন্তু বিএসএফ ওখানে যেতেই দেয় না।”

‘কাঙ্খিত নয়’ এই বেড়া, মানেন অনেকেই

দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে এমন কৃত্রিম দেওয়াল যে কাঙ্ক্ষিত নয়, দিল্লিতেও সে কথা মানেন অনেক বিশেষজ্ঞই।

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও ঢাকাতে দিল্লির প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত মুচকুন্দ দুবের যেমন বলতে দ্বিধা নেই, এর মধ্যে একটা ‘চরম স্ববিরোধিতা’ আছে।

তার কথায়, “এই সব দেওয়াল-টেওয়াল হল মান্ধাতার আমলের ভাবনা।”

“বার্লিন দেওয়াল কবে ভেঙে পড়েছে, আজকের যুগে এই সব ভাবনা আসলেই অপ্রয়োজনীয়।”

“প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা আবার শুরু করতে চান সেটা অন্য কথা – কিন্তু দুটো বন্ধু দেশের মধ্যে আসলে এভাবে দেওয়াল খাড়া করা যায় না, যেটা আমরা করেছি।

“এটা দৃষ্টিকটু – এবং অবান্তর! আমি বলব এটা ব্যাখ্যারও অতীত।”

কিন্তু নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে কাঁটাতারের বেড়ার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ বিশ্লেষক জয়িতা ভট্টাচার্য যেমন বলছিলেন, “এটা কিন্তু অনেক ধরনের জিনিস থেকে সুরক্ষাও দিয়েছে।”

“বস্তুত বাংলাদেশ নিজেরাও তো মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ করছে। কারণ এটা প্রমাণিত যে বেড়া বহু নেতিবাচক ইস্যুতে একটা বাধার কাজ করে।”

“তা ছাড়া এই সীমান্ত এলাকাটা নিশ্ছিদ্র নয় – খুবই ‘পোরাস’, নানা ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধও এখানে জড়িত সেটাও মনে রাখতে হবে।”

দিল্লির আর একটি নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্তও মনে করেন, নানা ভালমন্দ বিচার করেও বলতে হবে ‘আসলে কাঁটাতারের বেড়ার কোনও বিকল্প নেই’।

ড: দত্ত বলছিলেন, “বলতে পারেন এনআরসি-কে কেন্দ্র করে যে অনুপ্রবেশ আটকানোর অভিযান শুরু হয়েছে, এই কাঁটাতারের বেড়া তারই একটা কোল্যাটারাল ড্যামেজ।”

তবে কাঁটাতারের বেড়াও কিন্তু চোরাকারবার, ট্র্যাফিকিং-সহ অন্যান্য সীমান্ত অপরাধ পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি, সঙ্গে রয়ে গেছে গ্রামবাসীদের নানা ভোগান্তিও।

সর্দারপাড়ার লিয়াকত আলি বলছিলেন, “অনেক গ্রাম আছে যাদের শুধু এই বিএসএফের বর্ডার রোড দিয়েই যাতায়াত।

“কখনও যদি চোরাকারবারিরা বেড়ার তার কেটে দেয়, তখন বিএসএফ ওদেরকে খুবই হেনস্থা করে। এমন কী রাস্তাও বন্ধ করে দেয়, যাতে ওদের চলাচলে খুবই অসুবিধা হয়।

সীমান্তের যেখানে নদীনালা, সেখানেই শুধু এখনও কাঁটাতার বসেনি – মোটামুটি দশ শতাংশ এলাকায় এখনও কাজ বাকি রয়ে গেছে।

তবে সেখানেও নৌকায় বা স্পিডবোটে বিএসএফের টহল চলছে, আর চলছে লেসার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ বসানোর কাজ।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও অর্থনীতিবিদ সঞ্চারী রায় মুখার্জি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন ধরে।

তার অভিজ্ঞতা বলে, প্রাক-কাঁটাতার যুগে যেভাবে ওই অঞ্চলে তামাক বা পাটের প্রায় অবাধ বাণিজ্য চলত – তা এখন অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে।

আবার সীমান্তের গ্রামগুলোতে রাতবিরেতে গরু চুরি নিয়ে মানুষের প্রচুর ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল, সেগুলো কিন্তু দেওয়াল বসার পর অনেকটাই প্রশমিত।

কিছু ক্ষেত্রে ‘শাপে বর’ হয়েছে এই বেড়া?

অধ্যাপক রায় মুখার্জির কথায়, “কাঁটাতারের সীমান্তে আসলে আরও ট্রানজিট পয়েন্ট তৈরি করা উচিত।”

“সামাজিকভাবে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কটাকে আরও সহজ করতে পারলে অনেক ক্ষোভই কমে যাবে।”

“যেভাবে ছিটমহলগুলোর অনেকটাই যত্ন নেওয়া গেছে, সেভাবে সীমান্তে টার্মিনাল পয়েন্টও বাড়ানো দরকার।”

“তাতে মুভমেন্টে সুবিধা হবে, দূরত্ব কমবে, চোরাকারবারের বদলে বৈধ বাণিজ্যও বাড়ানো যাবে।”

কাঁটাতারের বেড়ায় অবশ্য বাংলাদেশেরও একরকম শাপে বর হয়েছে – যেমন গরু চোরাচালান কমায় বাংলাদেশের খামারিরা এখন উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন।

এমন কী কোরবানির ঈদের আগেও ভারতীয় গরুর চাহিদা তেমন ছিল না। তবে তার পরেও ভারত সীমান্তে এই ধরনের প্রাচীর তারাও দেখতে চান না।

দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলি এই কাঁটাতারের বেড়া প্রসঙ্গে বলছিলেন, “একদিকে তো আমাদের জন্য ভালই হয়েছে, ভারতের গরু না-আসায় আমরা স্বাবলম্বী হতে পারলাম।”

“অনুপ্রবেশ নিয়েও অনেক কথা ভারত বলেছিল, তবে সাম্প্রতিক নানা ডেটায় এখন প্রমাণিত বাংলাদেশ থেকে ভারতে এখন অনুপ্রবেশ ঘটার কোনও কারণ নেই।”

“ফলে যে সব কারণে ভারত কাঁটাতার চেয়েছিল, সেই কারণগুলো না-থাকলে কাঁটাতারের বেড়াও অপ্রাসঙ্গিক।”

“আর আমাদের অবস্থান জিজ্ঞেস করলে আমি তো বলব বাংলাদেশ সেদিনও কাঁটাতারের বেড়া চায়নি, আজও চায় না।”

“বস্তুত দুটো বন্ধু দেশের মধ্যে সীমান্তে এধরনের বেড়া থাকার কোনও প্রয়োজন নেই বলেই আমার বিশ্বাস!” বলছিলেন বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত।

তার পরেও দুই বন্ধু দেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াই এখন দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, যা হয়তো অচিরে বদলাবেও না।



মন্তব্য চালু নেই