দেশের ক্রান্তিলগ্নে ক্লান্তিহীন এক জেলা প্রশাসক

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভ‚তি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু…’- গানের এই লাইনগুলো তখন মনে পড়ে আঁধারের মধ্যে যখন একটু আলোর ছটার দেখা মেলে। হ্যাঁ, এমনই একজন মানবিক মানুষের কথা বলব আজ। যিনি সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সময়ে অসময়ে ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন সাধারণ মানুষের অন্তরে।

অদৃশ্য এক ভাইরাসের তাণ্ডবে পৃথিবী আজ দিশেহারা। ক্রমেই যেন এক অদ্ভুত আঁধার গ্রাস করতে চাইছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকেও।

করোনা ঠেকাতে, প্রান্তিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করার জন্য, মাঠ প্রশাসনে কাজ করছেন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা। ত্রাণ বিতরণ, সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবে ঝুঁকিতে থাকা বিশেষ এলাকায় কোয়ারেন্টিন বাস্তবায়নসহ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে সম্মুখভাগের যোদ্ধা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। তারপরও এই করোনা দুর্যোগের মধ্যেও যেন এক অকুতোভয় সৈনিক তারা।

এস এম মোস্তফা কামাল। যিনি দেশের দক্ষিণ জনপদের জেলা সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। প্রান্তিক মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সকাল-সন্ধ্যা ছুঁটে বেড়াচ্ছেন জেলার এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত।

বৈশ্বিক মহামারীর প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে বাংলাদেশ যখন সর্বোচ্চ সতর্কতাবস্থা অবলম্বন করেছেন তখন থেকেই সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালন করে চলেছেন জেলার এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তারই দিক নির্দেশনায় জেলার ৭টি উপজেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ দৃঢ় মনোবলে কাজ করে চলেছেন।

মোস্তফা কামাল শুধু সরকারি কর্মকর্তা নন, একজন মানবিক মানুষও তিনি। দায়িত্ব পালনে যেমন কঠোরতা দেখান, তেমনই অসহায় মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা অম্লান। সাদামাটা মনের এই মানুষটি রাতের আঁধারে ঘরবন্ধী ক্ষুধার্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। ইতোমধ্যে তিনি মানুষের ভালোবাসা আর ভরসার একটি জায়গায় উপনীত হয়েছেন।

হাট-বাজারে জনসমাগম কমাতে এবং সামাজিত দূরত্ব নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তিনি জেলায় চালু করেছেন ভাম্যমান বাজার। ‘নো প্রফিট, নো লস’র ভাম্যমান বাজারটি জেলা শহরের সাথে সাথে গ্রামাঞ্চলেও চালু হচ্ছে। আস্তে আস্তে এর সুফল পেতে শুরু করছে জনসাধারণ।

৩,৮৫৮.৩৩ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় জনবসতি কম নয়। করোনার প্রতিরোধে এখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হলেও নানা উদ্যোগের মধ্যদিয়ে তিনি সেটি বাস্তবায়ন করেছেন। নিজে ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তিনি পর্যাবেক্ষণ করছেন জেলার সার্বিক পরিস্থিতি। দিন শেষে ফেসবুক লাইভে এসে সাধারণ মানুষের সম্মুখে তুলে ধরছেন প্রতিদিনের সর্বশেষ অবস্থা।

দায়িত্ব পালনকালে ইতোমধ্যে দেশের কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবুও বিচলিত নন সাতক্ষীরার এই জেলা প্রশাসক। মহামারির মধ্যে জীবনবাজি রেখে সাধারণ মানুষের সচেতনায় উদ্যোগী তিনি। করোনা প্রাদুর্ভাবে মানুষকে ঘরে রাখতে কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কখনো নিজে হ্যন্ডমাইক হাতে বাজার ঘাটে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা করে চলেছেন। জেলার জনজীবন, সম্পদ ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে সর্বসম্মতিক্রমে একের পর এক নানামুখী কার্যকরী পদক্ষেপ নিচ্ছেন ২১তম ব্যাচের (বিসিএস) এই কর্মকর্তা।

দিনের শুরু থেকেই প্রতিটি কাজ করেন তিনি সুচিন্তার মাধ্যমে গভীর রাতঅব্দি। কখনও যেন তার সিদ্ধান্তে সমাজ, মানুষ ও দেশের ক্ষতি না হয় সে দিকটায় রাখছেন তী² নজর। জেলার ৭৮টি ইউনিয়নের ১৪২৩টি গ্রামের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে জেলা প্রশাসনের নানা বার্তা। প্রিয় সাতক্ষীরাবাসীকে সুরক্ষিত রাখতে তার এই বিরামহীন ছুটেচলা সাধারণের মানুষে মধ্যে বাড়িয়েছে প্রেরণা।

জনবান্ধব এই মানুষটি জেলার বিচারবঞ্চিত অবহেলিত জনগোষ্ঠীর এতদিনের পুষে রাখা ক্ষোভ বা যেকোন অভিযোগ সরাসরি শ্রবন করে সুস্থ সমাধানের ব্যবস্থা করেছেন অতি দ্রুত, যা অকল্পনীয়। সুবিধা বঞ্চিত মানুষের কথা শোনার লক্ষে জেলা পর্যায়ে তার শত কাজ থাকা সত্বেও সপ্তাহে প্রতি বুধবার তার কার্যালয়ে সকলের অভিযোগ নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। তবে, দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সেটি সাময়িক বন্ধ রয়েছে।

সুন্দরবনের কোল ঘেষা, হোয়াইট গোল্ড খ্যাত সাতক্ষীরা জেলাটি যেন জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামালের কাছে একটি সন্তানের মতোই। ‘ক্লিন সাতক্ষীরা, গ্রীন সাতক্ষীরা’ শ্লোগানে গতবছর তিনি একটি কর্মসূচী শুরু করেছিলেন। পরিবেশ রক্ষায় তার সেই কর্মসূচীটি জেলাব্যাপী ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। তিনি সাতক্ষীরায় জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলার শান্তি প্রিয় সকল স্তরের মানুষের খুব কাছ থেকে, নিজ ঘরের সন্তানের মত জেলার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন।

লেখক : আবু রায়হান মিকাঈল, গণমাধ্যমকর্মী।



মন্তব্য চালু নেই