ধর্ষণের মহোৎসব || নাজমীন মর্তুজা

“যা ঘটেছে সেদিন তার জন্য আমি দায়ী নই”
এমন মনোভাব ক’জন নারী বহন করতে পারে
আমাদের সমাজে?

চারদিকের ধর্ষণ উৎসব দেখে আমাকে নানা ভাবে নানা কারণ ভাবায়, আপনাদের কে এ কথা গুলো কি ভাবায় না?
দেশে ধর্ষণ তো নয় যেন ধর্ষণ প্রতিযোগিতায় নেমেছে ঘোডা ফাঁকা মাঠে, গোল দিয়েই যাচ্ছে একটার পর একটা। না আইনের ভয় না সামাজিকতার, না ধর্মীয় অনুশাসনের। সমস্ত কিছুর আগল ভেঙ্গে ধর্ষকগণ মনের সুখে ডাল পালা ছড়িয়ে দেশটাকে গ্রাস করে ফেলছে। এক ফিচার পড়ে জানলাম, আইন ও শালিস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের সংখ্যা নাকি ২৮০ জন,এর মধ্যে ধর্ষণের কারনে মারা গেছে ১০ জন ও ধর্ষণের কারনে আত্মহত্যা করেছে ৫ জন।অন্যদিকে শিশু ধর্ষনের হার প্রাপ্ত বয়স্কদের চেয়ে ৩ গুন বেশি, তাহলে বছর শেষে কত গুলো মৃত্যু এবং কতগুলো মানসিক রোগী, কতগুলো ধর্ষণের তকমা মাথায় নিয়ে ঘুরছে, সেই জরিপ করলে খুব ভালো ভাবে বোঝা যায় তালিকা কত লম্বা হবে। দেশে ধর্ষণকে সহজ ও বিচারহীন করে বহাল তবিয়তে রাখার জন্য আসলে শুধু কি আইন শৃঙ্খলা দায়ী নাকি আরো কিছু দায়ী, যা আমরা ইগনোর করছি।
একটা উদাহারণ টানছি – ফেসবুকে সংগৃহীত একটা লেখায় পড়েছিলাম , গুছিয়ে বলা কথা গুলো , তবে এই কথা গুলো জানি, এবং আপনাদেরকে বলছি –
আপনারা নিশ্চই মহাভারত পড়েছেন বা দেখেছেন। “মহাভারতের দুটি চরিত্র ব্যাসদেব ও কর্ণ। এরা দুজনই মায়ের কুমারী আবস্থায় জন্ম গ্রহন করেছিলেন। ব্যাসদেবের জন্য আমাদের সমাজ আজ অনেক কিছু পেয়েছে। যেমন: বেদ, গীতা, মহাভারত, পুরান। তিনি আমাদের সমাজে আজও পূজীত। অপর দিকে কর্ণকে দেখুন কি অপমান, কি ধীক্কারে , কি লজ্জাকর মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। এসব হয়েছিল তাঁদের মাতার জন্য। সত্যবতীর সত্যের জন্য ব্যাসদেব সমাজের কাছে পূজীত। সত্যবতী প্রকাশ করেছিল তাঁর সন্তান হওয়ার ঘটনা। অপর দিকে কুন্তীর সত্য অপ্রকাশের জন্য কর্ণ আমাদের সমাজে লান্চিত। কুন্তী চাননি তাঁর ছেলে বেঁচে থাকুক। কর্ণকে নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন। কিন্তু ছেলের ভাগ্যক্রমে কর্ণ বেঁচে গেল।
সমাজের প্রত্যকটা মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মাতার জন্য সন্তান ভালো বা র্ধামিক হয়। আবার একজন মাতার জন্য সন্তান খারাপ বা অর্ধামিক। মাতারাই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। যদি তাঁদের সন্তানদের সুশিক্ষা দেয়। সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বলছি যাদের ঘরে এমন দু চারজন লিঙ্গধারী সাধু সন্তান আছে সে সব প্রোডাকশন দাতাদের কে। আমরা একটা গ্রাম্য প্রবাদ জানি ‘কু সন্তান যদিও বা হয়, কু মাতা কখনো নয়’
এই যুগে এই কথাটা কতটা সত্য তা একবার ভাবতে হয় বৈকি! ব্যস্ত জীবনের ঘেরাটোপে জীবন এখন কাজ আর কম্পিটিশন তার সাথে টিভি বিজ্ঞাপণ এই করতেই যে সব তথা কথিত মা যারা সন্তান প্রেডাক্ট করেছেন, বাচ্চাকে সময় না দিয়ে নীতি কথার সবক না দিয়ে, যারা ছোট বেলায় বাবুকে বিদেশী চকলেট দিয়ে ডিভাইসে বসিয়ে দিয়ে, দিব্বি নিজের পার্সনাল লাইফের মজাটা নিচ্ছেন, সেই সময়েই বাবু পেকে গিয়ে.. প্রথমেই নিজের লিঙ্গ সাবলোম্বী করতে বাসার কাজের মেয়েটির মুখ টিপে বাথরুমে নিয়ে যায়। তারপর আপনি কি করেন মাতৃস্নেহে কাজের মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে বলেন তুই আমার মেয়ের মতো। বাবুর কথা কাউকে বলিস না, কাপবোর্ডের সবচেয়ে
নতুন জামাটা মেয়েটাকে পরিয়ে দিয়ে বলছেন, তোর বাবা মা আসলে কিছু বলিস না। পুঁজিবাদের ফাঁদে শুধু মেয়েটিকে না, আপনি আপনার ছেলেটিকেও প্রশিক্ষিত যৌনচারি বানাতেও ছাড়লেন না কিন্তু!
কমপ্ল্যান, বর্নভিটা, হরলিক্স মাইলো দিয়ে হাড্ডি মাংস সবল করতে গিয়ে তাদের যে অতি যৌনক্ষুধা আপনি বাড়িয়ে দিয়েছেন… এখন তো আর সেই বয়স নাই যে ফর্মুলা খাবে,তাই মাংস খায়, রক্ত খায়। ছেলে বড় হয়েছে , বিয়ে করানোর পর বউয়ের সাথে এরা শ্যালিকার দিকেও হাত বাড়ায়। তারপর টিচার, তারপর সহপাঠি, তারপর সহযাত্রী, তারপর সুযোগের শেয়াল হয়ে থাকে মুরগী ধরার জন্য।
শুনেছিলাম আফ্রিকায় ধর্ষন অনেকটা মহামারি আকার ধারন করেছিল ,সে জন্য সেখানে ধর্ষনের শাস্তি প্রকাশ্যে গলা কর্তন এবং ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ষককে হাত বেঁধে উপরে ঝুলিয়ে রেখে অন্ডকোষে বড় পাথর বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা। উচিত শিক্ষা। আমি তো বলি যদি সুযোগ পাওয়া যায় তবে… স্পটেই লিঙ্গ কর্তন করা উচিত। কিছুদিন হয়ে গেল একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যদিও ভয়ঙ্কর এমন সংবাদ গুলো ফেইস করতে বুকের পাটা লাগে, ইন্ডিয়ার এক প্রদেশে এক ভাই তার বোনের ধর্ষকের মাথা কেটে নিয়ে প্রকাশ্যে সেই মুন্ডু হাতে ঝুলিয়ে থানায় নিয়ে গিয়েছিল। হয়ত শিক্ষা হয়েছে , না মোটেও বাহবা পেতে এই কাজটি করেনি সেই ভাইটা। কারণ এই ধর্ষককারীর অত্যাচারে সেই এলাকার কোন মেয়েই নাকি শান্তির শ্বাস নিতে পারতো না। সে ক্ষমতাধারী হওয়াতে, তার শরীরের লোমও কেউ বাঁকা করতে সাহস করতো না। কিন্তু যুগে যুগে এমন ঘোর অনর্থের গলা টিপে ধরতে.. বরাহ অবতারের আর্বিভাব হয়। তা না হলে সামাজিক পরিবেশ এতো দূষিত হতো যে মানুষের বাঁচা দায় হয়ে যেতো।

আসুন বরং জেনে নেই ধর্ষণের শ্রেনি বিভাগ সম্পর্কে – ডাক্তার মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের এক ফিচার থেকে নেয়া -“পরিস্হিতি অনুযায়ী:- ডেটিং , দাওয়াত ধর্ষন; শিশু ধর্ষন; দলবদ্ধ ধর্ষন; পরিচিতজন দ্বারা ধর্ষন; দাম্পত্য ধর্ষন; পরিবারের লোক দ্বারা ধর্ষন- ইত্যাদি হয়

লক্ষ্য অনুযায়ী কিছু ধর্ষকের পরিচয় পাওয়া যায় যেমন- ক্রুদ্ধ ধর্ষক যাকে এনঙ্গার রেপিস্ট; এবং ক্ষমতা দেখানো ধর্ষক বা পাওয়ার রেপিস্ট, পীড়নকারী ধর্ষক, সেডিস্ট রেপিস্টের। এছাড়াও

ধর্ষকের কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় যেমন – শিশুকাল থেকে ছোট – বড় অপরাধের ইতিহাস থাকে; এরা যৌন ও শারিরিক নির্যাতনের শিকার; এরা প্রায়শ ভাঙ্গা সংসারের, এবং অকার্যকর সংসার থেকে আসা, এরা বাউন্ডেলে,উচ্ছৃঙ্খল, বখাটে স্বভাবের হয়, এদের বিবেক তৈরী হয় না বা হলেও ক্রটিপূর্ন অপরাধ করে অনুতপ্ত হয় না। নিষ্ঠুর, নির্মম মানস গঠনে এরা নিয়ন্ত্রণহীন পশুর মতন আচরণ করে। এসব ধর্ষকদেরকে নিয়ে বা ধর্ষনের মনস্বতাত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ জরুরী তবে বর্তমানে তারচেয়ে বেশী জরুরি ধর্ষন প্রতিকার ও আর মন্ত্র থাকে মুখে তোকে আমি এক পৃথিবী ভালোবাসি! রাত- বিরাতে নারীর একাকী চলাফেরা ধর্ষনের অন্যতম কারন, নারীর শরীর ঢাকা ছিলো না, ধর্ষিতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন নেই, ধর্ষনের কোন আলামত নাই, নিজের ইচ্ছায় গেছে, হিসাবে গড়মিল হয়েছে তাই এখন ধর্ষন বলে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। তারই নীরব সমর্থন ছিল- ইত্যাদি ভ্রান্ত বিশ্বাস সমাজ থেকে দূর করতে হবে। তার আগে কথায় কথায় নারীটারই দোষ, এই মানসিকতা বদলাতে হবে। ঘর থেকে সমাজে অন্যের অনুমতি, সম্মতি নেওয়ার কনসেন্ট কালচার তৈরী করতে হবে। বিয়ে করলেই স্ত্রী চিরকালের যৌনদাসী তার আবার কিসের সম্মতি এই ধারনা ভাঙ্গতে হবে আগে।
পৌরুষত্বের সনাতন ধারনার পরিবর্তন আনতে হবে ধর্ষন প্রাকৃতিক ব্যপার এ ভুল ধারনা ভেঙ্গে একে অপরাধ ও নারীর প্রতি সহিংসতা হিসেবে দেখতে হবে। ধর্ষণ মানে ধর্ষণ প্রেম- বন্ধুত্বের নামে একে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না। চোখের সামনে ধর্ষন হচ্ছে অথচ নির্বিকার, নিষ্ক্রিয় চেয়ে থাকার বা নারীটার পোষাক চরিত্র নিয়ে চিন্তা করা কাপুরুষতা পরিহার করতে হবে। সামাজিক আইনগত হয়রানি, অসম্মানের ভয়ে ধর্ষনের ঘটনা লুকিয়ে রাখা যাবে না। সোচ্চার হতে হবে, অকুতভয় হয়ে আইনি আশ্রয়ে যেতে হবে। রেপ প্রিভেনশন এন্ড এডুকেশন আর,পি,ই প্রোগাম চালু করা উচিত , শুধু মাত্র এন জিও গুলোতে নয়, স্কুল কলেজেও এটা চালু করা ফরজে আইন । কত কিছুই তো ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচার প্রতিকারের পথ আমরা সবসময় বাতলে দেই, কিন্তু কাজের কাজ কি কিছু হচ্ছে?
নারী ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ থেকে শুরু করে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়ায় পুলিশের অদক্ষতা, অনৈতিকতা, আন্তরিকতাহীনতা, দায়িত্বে অবহেলা দুর্নীতিপ্রবণতা, ধর্ষকের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনেক কারণে অধিকাংশ ধর্ষণ মামলায় আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয় না, শুষ অর্থের (ঘুষ) বলে ধর্ষকেরা ছাড়া পেয়ে যান। আর ধর্ষণের শিকার নারী যদি হন দরিদ্র, ক্ষমতাহীন, লাচার, প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন, আর ধর্ষক যদি হন ধনী, ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী, তাহলে তো কথাই নেই। আদালত অবধি মামলা যাবেই না, তার আগেই আইনের বোয়াল মাছ আবার সেই নারীটিকে আরো একবার ভরা মজলিসে ধর্ষণ করবে ।ধর্ষণ বিষয়টাকে আমাদের দেশে যদি জাতীয় সমস্যা না মনে করে তবে এবং ধর্ষণকে বিগ ইস্যু না মনে করে লঘু অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই অপরাধে সবাই যে অপরাধী হয়ে থাকবে সময়ের কাঠগড়ায় । সেই জন্য ধর্ষণকে আসলে কোনোভাবেই লঘু অপরাধ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি জঘন্যর থেকে জঘন্য একটি অপরাধ। এই অপরাধ সংঘটনকারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেই হবে।এবং এই শান্তিই হবে পরবর্তীতে কোন ধর্ষকের জন্য বিশাল সবক, যা দেখে ভয়ে এই কাজের এগুবেনা বীরদর্পে।

তথ্যসূত্র : বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে।



মন্তব্য চালু নেই