মেইন ম্যেনু

নতুন সৌদির ক্ষমতাধর নেতা এমবিএস লোকটি কেমন?

একটি গভীরভাবে রক্ষণশীল দেশকে বদলে দিচ্ছেন, আধুনিকায়ন করছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

কিন্তু একই সাথে যুবরাজ মোহাম্মদ – যাকে আরো ডাকা হয় এমবিএস নামে – সৌদি আরবকে টেনে এনেছেন ইয়েমেনের যুদ্ধে। তিনি কারারুদ্ধ করেছেন নারী অধিকারের জন্য আন্দোলনকারীদের, এমনকি ধর্মীয় নেতা এবং ব্লগারদেরও।

শুধু তাই নয়, এক বছর আগে তার সমালোচক জামাল খাসোগজিকে যেভাবে ইস্তাম্বুলে হত্যা করা হয় – তার পেছনেও তিনি ছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়।

এতসব আলোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই এমবিএস লোকটি আসলে কেমন?

মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে এক দীর্ঘ প্রতিবেদন লিখেছেন বিবিসির ফ্র্যাংক গার্ডনার, সেখানে তিনি বর্ণনা করছেন তার সাথে প্রথম সাক্ষাতের কথা।

বলে রাখা দরকার, ফ্র্যাংক গার্ডনার ২০০৪ সালে যখন রিয়াদে একদল বন্দুকধারীর গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন, তখন সৌদি আরবের বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুলআজিজ ছিলেন রিয়াদের গভর্নর।

বন্দুকধারীদের গুলিতে আইরিশ ক্যামেরাম্যান সাইমন কাম্বার্স নিহত হন। তারা ফ্র্যাংক গার্ডনারের পায়ে ৬টি গুলি করে এবং তাকে মৃত ভেবে চলে যায়।

রিয়াদের গভর্নর যুবরাজ সালমান বিন আবদুলআজিজ সেসময় হাসপাতালে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা আহত ফ্র্যাংক গার্ডনারকে দেখতে গিয়েছিলেন।

২০১৩ সালে এই সালমান বিন আবদুলআজিজ যখন সৌদি আরবের যুবরাজ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তখন তার সাথে জেদ্দায় প্রাসাদে সাক্ষাৎ হয় ফ্র্যাংক গার্ডনারের। তার স্বাস্থ্য তখনই বেশ ভেঙে পড়েছে, হাতে ছিল লাঠি। তিনি বলছিলেন, লন্ডন শহর তার কত প্রিয়।

ফ্র্যাংক গার্ডনার লিখছেন, তার আবছাভাবে মনে পড়ে ওই কক্ষেই তার পেছনে বসা ছিলেন একজন যুবক, যে কথাবার্তা হচ্ছিল তার নোট নিচ্ছিলেন তিনি।

হয়তো যুবরাজের প্রাইভেট সেক্রেটারি হবেন ইনি – ভেবেছিলেন ফ্র্যাংক গার্ডনার। তিনি দেখলেন যুবকটি দীর্ঘকায়, পরিচ্ছন্নভাবে ছাঁটা দাড়ি, এবং ঐতিহ্যবাহী সৌদি আলখাল্লা পরা, তাতে সোনার এমব্রয়ডারি – যা তার উচ্চ অবস্থান নির্দেশ করে।

বৈঠক শেষ হবার পর ফ্র্যাংক গার্ডনার নিজেই তার সাথে পরিচিত হতে চাইলেন। তারা হাত মেলালেন।

যুবকটি বললেন,”আমি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, একজন আইনজীবী। আপনি এতক্ষণ আমার পিতার সাথে কথা বলছিলেন।”

ফ্র্যাংক গার্ডনার লিখছেন: “আমার কোন ধারণাই ছিল না যে ২৮ বছরের এই মৃদুভাষী যুবকটিই কিছুকাল পরে আরব বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং বিতর্কিত নেতাদের একজন হয়ে উঠবেন।”

রাতের পার্টিতে অভাবনীয় সব দৃশ্য
রাজধানী রিয়াদের উপকণ্ঠে দিরিয়ায় ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি একটি রাত।

একটি মিলনায়তন। এখানে রিয়াদের ফরমূলা ই কার রেসিংএর উদ্বোধন উপলক্ষে অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা পোশাক পরা বিপুল সংখ্যক সৌদি তরুণ-তরুণীর ভিড় জমেছে।

মঞ্চের ওপর ঝিলিক দিচ্ছে লেজার আর আলোর খেলা। অনেক তরুণ-তরুণী তাদের স্মার্টফোন উঁচিয়ে ধরে ছবি তুলছে।

এরা সবাই এসেছেন তাদের অত্যন্ত ব্যয়বহুল মডেলের স্পোর্টস কার নিয়ে। তাদের অনেকেই মেয়ে, এবং তারা সৌদি যুবরাজ সালমানের দেয়া গাড়ি চালানোর অধিকারের পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছেন।

এ অনুষ্ঠানে ডিজে হচ্ছেন একজন ফরাসী ডেভিড গোয়েটা। এখানে গান গাইবেন এনরিক ইগ্লেসিয়াস আর ‘ব্ল্যাক আইড পিজ’।

এই হচ্ছে নতুন সৌদি আরব। কঠোর শুকনো সংস্কৃতি বিদায় নিয়েছে, বিনোদন নিয়েছে তার জায়গা। যুবরাজ-নির্দেশিত আধুনিকায়ন পুরোদমে চলছে।

যারা গত ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবকে দেখছেন – তাদের কাছে এই পরিবর্তনকে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে।

পার্টি, অবাধ মেলামেশা
সৌদি আরবে একটি পার্টিতে নারীপুরুষের এরকম অবাধ মেলামেশা মাত্র কিছুকাল আগেও ছিল অচিন্তনীয়।

রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এবং মুতাওয়া নামে ধর্মীয় পুলিশের কড়া নজরদারিতে এগুলো ছিল নিষিদ্ধ।

মুতাওয়া পুলিশ প্রায়ই রিয়াদের শিশা ক্যাফে বন্ধ করে দিতো, ইসলামী শরিয়া আইনের কঠোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী দোকানপাটে গান-বাজনা বাজানো বন্ধ করার নির্দেশ দিতো। অনেক বছর ধরেই সেখানে সিনেমা, মেয়েদের গাড়ি চালানো, প্রকাশ্য বিনোদন বন্ধ ছিল।

বাদশাহের অনুমতি নিয়ে মোহাম্মদ বিন-সালমান সৌদি আরবের এই ইমেজ পাল্টে দিতে শুরু করেছেন।

অনেকের ভাষায় ‘মডারেট ইসলামের’ নীতি নিয়েছেন এমবিএস এবং তিনি প্রকাশ্য সঙ্গীতানুষ্ঠানের অনুমতি দিচ্ছেন, এমনটি কপ্টিক খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় সমাবেশের অনুমতি মিলেছে।

৩৪ বছর বয়স্ক মোহাম্মদ বিন সালমানের জনপ্রিয়তাও হু হু করে বেড়েছে।

একজন নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীর কথায়, যুবরাজ নিজেও হটডগের মতো ফাস্টফুড, ডায়েট কোক এসব পছন্দ করেন। তিনি ‘কল অব ডিউটি’ নামের কম্পিউটার গেম খেলতেন। তিনি একজন প্রযুক্তি-ভক্ত।

অল্পবয়েসী সৌদি মেয়েরা তার সাথে সেলফি তুলতে চাইলেও তিনি বাধা দেন নি।

বিরোধিতা বরদাস্ত করেন না এমবিএস
অনেকেই বলেছেন, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী । তবে তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে অশুভ কিছু একটার ইঙ্গিতও আছে।

সহজ কথায় তিনি বিরোধিতা বরদাস্ত করতে পারেন না। ব্লগার, ধর্মীয় নেতা, নারী অধিকারকর্মী – তিনি রক্ষণশীল বা উদারপন্থী যাই হোন না কেন – যুবরাজের বিরোধিতা করলেই গ্রেফতার হয়েছেন।

এমবিএস মেয়েদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়েছেন, আবার তিনিই গাড়ি চালানো বা অন্য কোন দাবিতে আন্দোলনকারী নারীদের আটক করেছেন।

নারী অধিকার-কর্মীদের অনেকেই বন্দী অবস্থায় যৌন নিপীড়নসহ নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন – তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে। এদের অনেকেই ছাড়া পাবার পর বিদেশে অবস্থান করছেন।

ওয়ালিদ আল হাথলুল নামের একজন নারী অধিকার কর্মী বলেছেন, তাকে বন্দী অবস্থায় এমবিএসের উপদেষ্টা সাউদ আল-কাহতানি স্বয়ং নির্যাতন করেছেন।

শুধু তাই নয় পুরুষ ভিন্নমতাবলম্বীরাও একইভাবে আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেই বলেছেন, তিনি স্বীকার করেন যে সৌদি আরবে অনেক লোক কারাবন্দী আছেন, কিন্তু একটি দেশে এত ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার চালাতে গেলে কিছু মূল্য দিতেই হবে।

কিভাবে এত ক্ষমতাশালী হলেন এমবিএস?
মোহাম্মদ বিন সালমান ছিলেন বাদশাহের ১৩ জন পুত্রের একজন। সৌদি আরবে আনুমানিক প্রায় ৫ হাজার যুবরাজের মতো তারও প্রাথমিক জীবন কেটেছে অভাবনীয় আরাম-আয়েশ আর বিলাসিতার মধ্যে।

রিয়াদের মাদহার এলাকায় প্রাসাদে বড় হন তিনি। তার চারপাশে থাকতো ভৃত্য, রাঁধুনি, ড্রাইভার এবং অন্য কর্মচারীর দল, অনেকেই অন্য দেশ থেকে আসা।

তার গৃহশিক্ষকদের একজন রশিদ সেক্কাই বলেছেন, তাকে প্রতিদিন একজন ড্রাইভার এসে বাড়ি থেকে প্রাসাদে নিয়ে যেতো।

তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে অন্য যুবরাজদের মতো ব্রিটেনে বা আমেরিকায় না গিয়ে কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।

এটা অনেকের মতে তার জন্য ভালো এবং খারাপ দুইই হয়েছে।

এতে তিনি ঐতিহ্যানুগ ‘দেশের ছেলে’ হয়ে বেড়ে উঠেছেন, আবার অন্য দিকে অন্যান্য প্রিন্সদের মতো পশ্চিমা মানসিকতা সম্পর্কে গভীর বোধ অর্জন করতে পারেন নি। অনেক দিন পর্যন্ত তিনি ভালো ইংরেজিও বলতে পারতেন না।

একজন মাত্র স্ত্রী
সৌদি আরবে একজন পুরুষের চারজন পর্যন্ত স্ত্রী থাকার অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমানে স্ত্রী মাত্র একজন।

তিনি তার সম্পর্কীয় বোন প্রিন্সেস সারা বিনতে মাশুর বিন আবদুলআজিজ আল সউদকে বিয়ে করেছেন।

তাদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। তার নিজ পরিবারকে এমবিএস একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে রেখেছেন।

ক্ষমতায় তার উত্থানও নাটকীয়
তার পিতা তাকে ধীরে ধীরে ক্ষমতার জন্য তৈরি করেছেন, দেখিয়েছেন রিয়াদের গভর্নর হিসেবে কিভাবে বিবাদ মেটাতে হয়, সমঝোতা করতে হয়, সৌদি শাসনকাজ চালানোর কৌশল কী।

এর পর পদোন্নতি পেতে পেতে তিনি হন একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী।

আর ২০১৫ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পিতা সালমান ৮০ বছর বয়েসে বাদশাহ হবার পরই তিনি এমবিএসকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং রাজসভার মহাসচিব নিয়োগ করেন।

এ সময় এমবিএসের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত ছিল ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের যুদ্ধ পরিচালনা – যা এখন এক রক্তাক্ত দীর্ঘ সংঘাতে পরিণত হয়েছে।

এর আসল লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনে সৌদি সমর্থক সরকারকে ক্ষমতায় রাখা, এবং হুতিদের পেছনে সমর্থনদাতা ইরানকে একটা শক্ত বার্তা দেয়া। সে লক্ষ্য পূরণে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই।

বরং ইয়েমেন এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

এর পর ২০১৭ সালে এক রক্তপাতহীন প্রাসাদ অভ্যুত্থান ঘটে যায়।

বাদশাহ সালমান তখনকার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ডেকে পাঠান এবং তাকে বলা হয় পদত্যাগ করতে – নতুন যুবরাজ হন মোহাম্মদ বিন সালমান।

মোহাম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন আমেরিকানদের আস্থাভাজন। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সন্ত্রাসদমনের প্রধান হিসেবে আল-কায়দার বিদ্রোহী তৎপরতা দমনে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।

তবে ২০০৯ সালে আল-কায়েদার এক হত্যাপ্রচেষ্টা থেকে বেঁচে গেলেও তিনি পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেন নি বলে শোনা যায়।

সৌদি আরবে রাজার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত, চূড়ান্ত।

তাই তিনি যখন এমবিএসকে যুবরাজ অর্থাৎ তার উত্তরাধিকারী বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন মোহাম্মদ বিন নায়েফের মঞ্চ থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নেয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকলো না।

এমবিএস ক্ষমতা সংহত করলেন যেভাবে
এর পর এমবিএস যা করলেন তা সারা দুনিয়ার আলোচিত বিষয়ে পরিণত হলো।

তিনি ২০১৭ সালের নভেম্বরে ২০০ জন প্রিন্স, ব্যবসায়ী এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ লোককে গ্রেফতার করে কোন অভিযোগ ছাড়াই তাদের রিয়াদের রিৎজ কার্লটন হোটেলে আটকে রাখলেন ।

একে বলা হলো দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আটকদের বলা হলো মুক্তি পেতে হলে তাদের শত শত কোটি রিয়ালের দুর্নীতিলব্ধ অর্থ রাজকোষে দিতে হবে।

সমালোচকরা বলেন, এটা আসলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ছিল না – এটা ছিল এমবিএসকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এমন যে কাউকে নিষ্ক্রিয় করা।

বাদশা আবদুল্লাহর দিকে রাজপরিবারের যে শাখা – সেখানকার প্রিন্সদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হলো।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে সশস্ত্রবাহিনী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল গার্ড – তিন সংস্থারই নিয়ন্ত্রণ আনা হলো এমবিএসের হাতে। তার হাতে তখন সর্বৈব ক্ষমতা।

জামাল খাসোগজি হত্যাকাণ্ড

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনের বিমান হামলায় হাজার হাজার লোক নিহত হয়েছে, শত শত লোক বন্দী হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অনেকের সমর্থন সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে চলে যায় একজন সাংবাদিকের বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়।

জামাল খাসোগজি ছিলেন একজন সুপরিচিত লেখক এবং এমবিএসের কড়া সমালোচক। গত বছর ২রা অক্টোবর দুপুর বেলা তিনি তার বিবাহবিচ্ছেদের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে ইস্তুাম্বুলের লেভেন্ট এলাকায় সৌদি কনস্যুলেটে ঢুকেছিলেন।

ঢোকার কিছু পরই রিয়াদ থেকে পাঠানো একদল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা এজেন্ট তাকে হত্যা করে, তার মৃতদেহ কেটে টুকরো টুকরো করে কোথাও নিয়ে যায় – যার কোন হদিশই পাওয়া যায় নি।

যদিও সরকারিভাবে সৌদি আরব তা অস্বীকার করেছে, কিন্তু পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে যে মি. খাসোগজির মুখ বন্ধ করার এই অপারেশনের ব্যাপারে এমবিএস অন্তত আগে থেকেই জানতেন।

সিআইএ মনে করে – তিনিই হত্যাকাণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন।

সেপ্টেম্বর মাসে এক সাক্ষাতকারে যুবরাজ এ ঘটনার ‘দায়িত্ব’ নিয়েছেন কিন্তু তার জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

তবে এই ঘটনার পেছনে একজন মূল সন্দেহভাজন হচ্ছেন এমবিএসের ঘনিষ্ঠতম উপদেষ্টাদের একজন সাউদ আল-কাহতানি। খাসোগজি হত্যাকাণ্ডের পরপরই বাদশাহ সালমানের আদেশে তাকে বরখাস্ত করা হয়।

বলা হয়, এমবিএসের নীতির কেউ বিরোধিতা করলে – তাদের ওপর নানাভাবে সাইবার নজরদারি ও হুমকির কার্যক্রমের পেছনে ছিলেন এই আল-কাহতানি। জামাল খাসোগজিও জানতেন, তিনি বিপদে আছেন।

খাসোগজি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী সাংবাদিক। তিনি কলাম লিখতেন ওয়াশিংটন পোস্টে, সমালোচনা করতেন এমবিএসের স্বৈরাচারী স্টাইলের।

তার টুইটার ফলোয়ার ছিলেন ১৬ লক্ষ। খাসোগজি এবং অন্য কয়েকজন মিলে একটি আন্দোলন শুরু করার পরিকল্পনা করছিলেন -আরব বিশ্বে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য। ফলে এমবিএস এবং তার উপদেষ্টাদের জন্য তার হুমকি হয়ে ওঠারই কথা, যদিও যুবরাজ তা অস্বীকার করেন।

এর আগে সৌদি প্রশাসন ‘বিপথগামী’ নাগরিক বা যুবরাজদের বিদেশ থেকে অপহরণ করে রিয়াদে নিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু হত্যা নয়। বিদেশের একটি শহরে এরকম একটি হত্যাকাণ্ড আগেকার ঘটনাবলীর সাথে মেলে না।

ফলে খাসোগজি হত্যাকাণ্ড হয়ে দাঁড়ায় এক আন্তর্জাতিক কেলেংকারি।

ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে তুরস্কের গোয়েন্দারা গোপন মাইক বসিয়েছিল। হত্যাকান্ডের টেপ সিআইএ এবং অন্য পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা শুনেছে।

কিন্তু জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ডের সাথে এমবিএসের সংশ্লিষ্টতার কোন অকাট্য প্রমাণ এখনো কারো হাতে নেই।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে যে এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটা ‘রোগ অপারেশন’ অর্থাৎ কিছু অসৎ-নীতিহীন কর্মকর্তার কাজ।

কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোতে অনেক বছর থাকার ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে ফ্র্যাংক গার্ডনার বলছেন, এ অঞ্চলে ‘রোগ অপারেশন’ বলে কিছু নেই।

ওপরের নির্দেশ ছাড়া সেখানে কোন কাজই হয় না। আল-কাহতানি নিজেই ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে এক অর্থপূর্ণ টুইটে বলেন, ‘আমি বাদশাহ এবং যুবরাজের একজন কর্মচারী, তাদেরই আদেশ পালন করি।

এই খুনের সাথে বাদশাহর সম্পর্কের আভাস কেউ দেয় নি। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাদশাহর প্রিয় পুত্রের ঘনিষ্ঠ চক্রের মধ্যেই হয়েছিল বলে মনে করা হয়। একজন সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এমবিএস ব্যাপারটা জানতেন না এটা কল্পনাই করা যায় না।

তাহলে আল-কাহতানি কোথায় আছেন?
রিয়াদে এবং লন্ডনে নানা জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, আল-কাহতানি এখন অন্তরালে চলে গেছেন। কিন্তু তিনি গ্রেফতার হন নি, এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত নানা প্রকল্পে তিনি জড়িত আছেন।

এ ঘটনায় ১১ জনের বিচার শুরু হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ অভিযুক্ত হলেন কিনা বা বিচার কতদিন চলবে, এ ব্যাপারে বেশি কিছু জানা যায় না।

এই বিচারের ফল যাই হোক একটা কথা ঠিক যে খাসোগজি হত্যাকাণ্ড সৌদি আরব এবং এমবিএসের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি করেছে।

এমবিএসের ভাবমূর্তির ব্যাপক ক্ষতি
আগে পশ্চিমা বিশ্বে এমবিএসকে এক দূরদর্শী সংস্কারক নেতা হিসেবে যেভাবে তুলে ধরা হতো – তার পরিবর্তে এখন তাকে অন্তত প্রকাশ্যে অনেকটা এড়িয়ে চলা হচ্ছে।

একজন ভাষ্যকার বলছেন, খাসোগজি হত্যাকাণ্ড সৌদি আরবকে ‘ঘাতকদের ক্লাবে’ তালিকাভুক্ত করেছে, যেন এমবিএস আর গাদ্দাফি, সাদ্দাম বা আসাদ একই শ্রেণীর ব্যক্তি। কিন্তু সৌদি আরব কখনো এই ক্লাবের অংশ ছিল না।

এ ঘটনার পর মার্কিন কংগ্রেস সৌদি আরবে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক স্বার্থের যুক্তি দেখিয়ে তা আটকে দিয়েছেন।

গণতন্ত্রী নন মোহাম্মদ বিন সালমান

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি আধিপত্যের বিস্তার ঠেকাতে সৌদি আরব কৌশলগতভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ দেশ।

তা ছাড়া এদেশের বিরাট বাজার এবং এখানে ব্যবসার সুযোগ খুবই লোভনীয় পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য।

এমবিএস সৌদি আরবে নিওম নামে লোহিত সাগরের তীরে যে নতুন বিনিয়োগ নগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছেন তা কতখানি সফল হবে তা নিয়ে অনেকের সংশয় আছে।

তবে সৌদি আরবের ভেতরে যুবরাজ সালমান এখনো খুবই জনপ্রিয়। একজন ভাষ্যকার বলছেন, ‘১৬ থেকে ২৫ বছরের সৌদিরা তাকে একজন হিরো বলে মনে করে যিনি দেশে পরিবর্তন এনেছেন, ধর্মীয় মৌলবাদীদের ক্ষমতা খর্ব করেছেন।’

এমবিএস সৌদি আরবে গণতন্ত্র নিয়ে আসবেন, এমন কোন লক্ষণ কোথাও নেই। তার ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, খাসোগজি হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে ঝড় উঠেছে তা একসময় ঝিমিয়ে পড়বে। হয়তো তাদের ধারণাই ঠিক।

এক দিক থেকে বলা যায়, এমবিএস-ই সৌদি আরব, তিনি কোন গণতন্ত্রী নন, কোন রাজনৈতিক সংস্কারকও নন – অনেকের চোখে তিনি একজন একনায়ক মাত্র। তবে এটাও ঠিক যে তিনি অর্থনৈতিক এবং সামাজিক আধুনিকায়ন করছেন।

তা ছাড়া তার বয়েস মাত্র ৩৪ – তাই তিনি যখন বাদশাহ হবেন, তখন তিনি হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম এই দেশকে ৫০ বছর ধরে শাসন করবেন।



মন্তব্য চালু নেই