প্রধান ম্যেনু

নাজমীন মর্তুজা’র একগুচ্ছ রোমান্টিক কবিতা

ভবঘুরে মন
নাজমীন মর্তুজা

আজ কোন নিয়ম বাঁধা
সামাজিক নই, একেবারে উল্টো
খানিক ক্ষণ গান শুনে কফি খেয়ে
ভেতর থেকে অগাধ অস্বস্তি
ভেঙে যাচ্ছে,
সেই সঙ্গে
সংস্কার ক‚পমЂকতা।
মনে মনে ভাবছি আজকের দিন
যদি ব্যর্থ হয়
তাহলেও আছে কাল।
চাইনিজ ছেলেটার মুখে ককটেল
ঢালবার যে আনন্দ
চারপাশের পরিবেশটা হাসছে
যেন হপকিন্সের রিদম নিয়ে
খেলছে সে।
কখনো জাপানিজ হুইস্কি, আপ্রিকট
ব্র্যান্ডি, সাইট্রাস মিন্ট কিংবা
কিউই হারমান, ভদকা
ভারমোডিথ
হাসি মুখে গ্রাহকের স্বাদ
সে বানিয়ে যাচ্ছে।
শুধু অবাক হচ্ছি
তার প্যাশন প্লে দেখে
যারা গøাসের পর গøাস সাবাড় করে
হাসিতে গালিতে পাব এর মাঠ ভেঙে চলছেন
তাদের দিকে তাকিয়ে।
স্পেন্ডারের এক্সপ্রেস ট্রেন
মনে পড়ে গেল
নিজের আনন্দ মশগুল হয়ে
থাকবার স্বাধীনতা তাদের।

আর নয় সাজানো আবহাওয়া
থেকে মুক্তি নেয়া যাক,
প্রকৃতির সহজ সৃষ্টির মাঝে
নিয়মবিহীন কিছু করবার
ইচ্ছে কার না হয়…।

*********

আদর
নাজমীন মর্তুজা

স্তব্ধতা লাফিয়ে উঠলো
তোমার চুমুতে
আনন্দ গলা চিরে বেড়িয়ে পড়লো
সুখ আঁকবার চোখ দিয়ে।

তারপর দমচাপা ফিসফাস
হাসিতে রঙিন হলো গ্লাস
চেনা চেনা সব আলতো আদর
আবেগের এক ঝলক।

বুকে শান্তি আকাক্সিক্ষত অস্ফুট মৃদুল
ইচ্ছে আদরে সুখে চুরমার
ঘামের ফোটা হারালো বুক আকাশ
জলজ ভূমিতে হারালো স্বপ্নের রাজহাঁস।

কথার পর কথা দিয়ে জড়িয়ে
গারা দেহে মেখে দেয়া মায়া
ভরাকেন্দ্রের প্রকটতায়
লাল জলে লাল আপেল হলো পানিশাল।

**********

আয়ত বাঁচা
নাজমীন মর্তুজা

ব্যথার জলে খেয়া ভাসিয়ে
পৌঁছে গিয়েছি তোমার বুকের পারঘাটায়
গোমতী ধলেশ্বরীর বাঁধ ভেঙে
ভাঙা বেড়া কুঁড়ে ঘর হাঁকরে
মনস্তাপের গোলকধাঁধায়।

বিকাশ গায়েন ডেকে যায়
বাঁশির সুরে
উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম যখন
ভাঙা আঙিনায়,
এই যে রাখলে দূরে ঠেলে
সমুহ বিনাশ মুছে,
অন্তসারহীন পৃথিবীতে।

কেবল হোঁচট খেয়ে ইউক্যালিপটাস গাছ,
বিষন্ন ঝোপ ঝাড়
অযত্নে খোলা খোঁপা।

শেষ কথা শেষ ছোঁয়া কবে যেন
ধারাপাত মনে নেই ঠিক;
আদরের মত পাগল
কেমন আছে ঠোঁট দুটো?

ছুঁয়ে যাও জন্ম তিলক
বুকের মাঝখানে স্পর্শ ঘ্রাণে ।

ধুসর কুয়াশায় মোড়া
মনসিজে আকরিক ডুবলে
অনন্ত কুয়োর জলে।

অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে
নাজমীন মর্তুজা

আমি কাঁদছি পার্কার বেঞ্চে বসে
কেঁদে কেঁদে সূর্য ডুবে গেল
নীল রাত্রি হয়ে গেলো দিন।
গাছের তলায় পড়ে আছে
দলকে দল পাতা
টুকটুকে পাকা ফলের রসে জড়বৎ
পোকারা।
যেই না ভাবছি, দেখি তো সময়কে
পরখ করে
অমনি হু হু করে কলরব
উড়ে যাচ্ছে।
পাখিদের এমন কাতর জলগ্রোত
আমি অনেকদিন নিজের চোখে দেখিনি,
খর মরু বাতাসের নুন
এক চিলতে সবুজ ভূখÐকে শুষ্ক
করে দিলো।
বুকের হাড়িতে এখন ফুরফুর
দুঃখের দানা ফুটছে,
নিজের চোখের জল দিয়ে চন্দন ঘষে
তোমাকে উজ্জ্বল করতে হবে জানি
অগ্নিকলা জ্বালাবো যে।

*********

কামভাব
নাজমীন মর্তুজা

খুব জোরে মুঠো করে ধরো
পলকে পলকে শিহরণ জাগাও
ললাটে নরম ঠোঁটের স্তবকে গিঁট
নাভিমূলে পাতা আছে পিয়ানোর রিড
আলতো ছোঁয়ায়
শীৎকার সুর ধরে
বাজিয়ে দাও আয়াশহীন শিহরণবীণ
মহাসুখী মন যৌন পুলকে
থর থর কাঁপে সারাক্ষণ
থিতু হতে চায়

মাস মাস চোয়ায়
যে জোয়ারের পানি
সাতদিন শেষে
বোঝা যাবে কিসে
বাঁধা আছে কোন সুরে
স্থির সৌদামিনী

কিনার বিহীন কাম নদীতে
আছে তিন রঙা পানি
উুল থেকে ফুলে
উঠছে দুলে দুলে
জাগে ঢেউ
কাম নদীর দৃঢ় মুলে
অঙ্গে অঙ্গে সাজা আছে মণি
বাজে কাম ধ্বনি

রুপ তরঙ্গের প্রতিটি অঙ্গ
ভিজিয়ে দাও
মেঘসম রসধারা
করে যায় দিশেহারা
থেমে যায় কাঁপন
মেঘে স্থির বিদ্যুৎ যেমন
কতো সুখে ফুলের বনে
ঘুমায় ভুমি-লতা-কুসুম।

********

মৌসুমি মেঘ
নাজমীন মর্তুজা

দীর্ঘক্ষণ অঝোর বৃষ্টি আমার ভাললাগে না
তাই তো ও আমাকে মৌসুমি মেঘ বলে ডাকতো
বর্ষা এলে খুব করে মনে পড়ে ওর মুখ।

দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর ঘুরে এলো
আজও আমি বসে আছি কাগজের নৌকা খানি হাতে
মেঘের ছায়া বৃষ্টি বাদল
শীত গ্রীষ্মে বিরহের গান শুনে শুনে
বয়স ছাড়া কিছুই বাড়েনি আমার

কেমন করে যে কেটে যাচ্ছে
সময়টুকু জীবনের বিরহে বিলাপে
যদিও জানি এরই মধ্যে বদলে গেছে অনেক কিছু

ভাবনাশূন্য আবেগশূন্য ভাষাশূন্য থেকে
খুব ভাল ছিলাম এতোটা সময়
কিন্তু বৃষ্টি এলে আবার পুরনো কথা মনে পড়ে যায়

আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখি
পুরনো মুখ ভেসে ওঠে
অনেক কথা জমা হয় কবিতার খাতায়
দোলনচাঁপায় ভরে রাখি খোঁপা- সারাঘর- বিছানা
আমার আঁচল ভিজে যায়
বৃষ্টির সাথে নিশ্চিন্ত সঙ্গম শেষ করে উঠি

নৃত্যরত বর্ষার জল ঢুকে পড়ে ঘরে
বৃষ্টির কল্পনা থেকে
পুরনো আমিতে জন্ম নাও তুমি
আর তোমার কল্পনা থেকে আমি

যদিও জানি
কালো রাতের মত রাত্রী নও
নও তুমি দীর্ঘ বৃষ্টিপাতের দিন…।

********

‘আকার’
নাজমীন মর্তুজা

আবার সেই প্রাচীনধ্বনি
অস্ফুট ডাকছে কেউ আমারই গৃহদ্বারে
ঘ্রাণ ভেসে আসে
আত্মপরিচয়ের ব্যাকুলতায়
চকিত বুকের আবরণ খুলে
সংখ্যা চিহ্ন ধরে দেখলাম
গোপন প্রেমের সুখচিহ্ন
অঙ্গ কাঁপে নৃত্য ও নেশার ঘোরে

আজ বহুদূর থেকে আরো গভীরে মরমে পুনঃজন্ম রচি
ময়ুরের বেশে পল্লির প্রমোদ আঙিনায় দৈব ভরসায়
বহুযুগ ধরে পোষা আছে বুকে বহু স্নিগ্ধ ব্যাথা
আমি ছিলেম উন্মত্ত কিশোরী রাধা
বুঝিনি নন্দলালাস তোমার অচেনা গড়ন
একদিন জ্যোৎস্না রাতে বৃন্দাবনে
কোলে টেনে নিয়ে রাস-রস
রচিলে আবেগে…
বাজিল মোহন মুরলী ধ্বনি
বুঝিলাম আমি প্রেমসিন্ধু কতটা গভীর
বলেছিলে বংশীধারী প্রভু আমার-
পৃথিবীতে তুমি আর আমি পেয়েছি আকার
কালিন্দি যমুনার জল
যেখানে আমার আর তোমার দ্রবণ ও প্রকাশ।

*********

‘ছুঁয়ে থাকি’
নাজমীন মর্তুজা

তোমার গভীর রাত শুধু জাগরণ দেই
দেই ছিপ বড়শী সুতো
সোনালী মাছের সরোবর।

সকালে চোখ বুলিয়ে
অকেজো বিকেল ফেলে দেই
নিবিড় শান্তি লাগাই চাঁদের ঘুমে,
তোমার কানে কান্ কোয় আদর
পেতে দেই নিশার প্রহরে ।

মাঝ দুপুরে ভাসমান গান গেয়ে দেই
নাভির নিশ্বাস থেকে
উচ্চারিত সর্বস্ব শব্দ এক করে ,
চোখে পুকুর কেটে দেই
আঁশে পুচ্ছে আলগা হয়ে ভাসিও।

তুমি জাগরণ নয় ঘুম কোলে
কুড়ি মুড়ি থাকিও
এপাশ ওপাশে ফেরো বুক পাহাড়ে
মুখে মুখ ঘষে ঘুমের ঠিকানা
ঠোটের পাতায় লিখে রাখিও।

জলচ্ছলে তলে তলে জলের অতলে
তোমার ঘরকন্নায় আমার খাড়
পায়ের হাঁটার শব্দ গুনে রাখিও।

*********

নেশা এক প্রিয় ফল
নাজমীন মর্তুজা

কালো রঙের আগুন তুমি
রোদ্দুরের ফুল ভালোবাসো
ভালোবাসো নীল আলোর সন্তান।
ঠিক উল্টোটা যখন হই আমি
মেঘ ভেঙ্গে টুপটাপ বৃষ্টি
উনিশকুড়ির লাজুক প্রেম
অসংলগ্ন কাব্যের কথা মালা।
তবে তো গণেশ উল্টে যায়,
তাই না?
যে তুমি তর্কে মাতো ফ্রান্ৎস কাফকা
ভগৎসিং শার্ল বোদলেয়ারে
সেই আমি খুব উল্টো মিথ, টেল লিজেন্ট কে আগলে।
তোমার গালগপ্পে সমাজবাদ, পুঁজিবাদ
সাংস্কৃতিক বিপ্লব, সভ্যতার সমীক্ষা
আমি তখন নস্টালজিয়া
দোয়েল পাখির বিয়ে
প্রিয় ইছামতি নিয়ে।
তুমি আহত পলাশ হলে
আমি ক্ষণিকের শিউলী
তুমি সিরিয়াস চলচ্চিত্র প্রেমী
আমি পথ নাটকের কর্মী।
তুমি সঙ্গম প্রেমী বলে
আমি প্রতিক্ষণে বুনি সঙ্গম সংলাপ।

‘অল্প নিয়ে থাকি’
নাজমীন মর্তুজা

সম্পর্ক বিন্দুটা নানা শুকনো
জঞ্জালে লুকিয়ে গেলে
পর্দার আচ্ছাদনটুকু নিয়ে
দীর্ণ হওয়া বাকি,
নিরুদ্বেগ আহ্লাদ গুলো
জোড়া পায়ে হেঁটে যাবে শুন্যে।

হৃদয়ে যখন আবছা আলোয়
চেনা লোকের চলাচল প্রেমিক তখন
জল রঙে আঁকা কোন ধুসর
ছবির মত।

বাঁধা গানের সুর জমলেও
সঙ্গত পাওয়া যায় না মোক্ষম
জীবনে বর্ষামঙ্গলে উৎসবগুলো
চোখের জলকে আড়াল করে
স্মৃতি যাপনের গানে আনন্দ কাতর হই।

বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলে
ধুতুরার আকার ধারণ করে
রাজেশ্বরীর লেহেঙ্গায়
চুমকির কোরাস দেখে
শৈলজারঞ্জন তোমার মুখ
দেখবার চেষ্টা করো না।

একলা করে একলা হওয়া
শুধু তবলার তালেই ঘুঙুর খোলে
বিষাদের কণ্ঠ খোলে না।

‘সঘন চুমু’
নাজমীন মর্তুজা

সকল ক্লান্তি সঁপেছি রেওয়াজে ,
আজ চুমু দিও না
লাল টকটকে লিপিষ্টিকে মিশিয়েছে হেমলক
যতবার হাসছি ফালা ফালা হচ্ছি ।

জোৎস্নায় ফেরা হলো না আর
সঘন চুমোয় ভরিয়ে দিও
কফিনের ঢাকনা খুলে ….
সুখ দেখবার আগে, চক্ষু উপড়ে নিয়েছে
দানব চিলে।

কালো চশমায় আড়াল করেছি
আলুথালু রক্ত রস,
বড় পিপাসা কাতর নাভিতে
ফুটো করে রিং দিলো ঝুলিয়ে
যদি মন চায় গোপন সুন্দর দেখিও
কফিনের ঢাকনা খুলে।

আই ফোনে সন্দেশ পাঠিয়েছে
সব দেহ চায়,
দিতে হবে দিতে হবে, দিতেই তো হবে।

গলাবন্ধে পশমী চাদরে ফাঁস এঁটে
মৃত্যু আলিঙ্গন করলে
কপালে চাঁদের টিপ দিও
কানে ঢেলে দিও দু’ফাঁটা মান্না দে
কফিনের ঢাকনা খুলে।

জাকারান্ডার নীচে নিহত হবো
তাই ভেবে মাতি কাঁচা তেঁতুল লবন মরিচ চটকে
জিভে জল থৈ থৈ সুখে,
বড় আদরে ছিলাম হিংসায়ও কম নয়।

আমাকে মনে করে
ফিরোজ যৌবনের প্রথম মৈথুনে আহা!
তাকে কালো মেয়ের মুখটা দেখিও
কফিনের ঢাকনা খুলে।

*******

দৈব ক্রমে
নাজমীন মর্তুজা

ভাবি একদিন মন ভরে
আদর নেবো
বেশী বেশী বাড়াবাড়ি রকমের,
তুলতুলে বালিশে হেলান দিয়ে
তোমার দুদ্দার প্রেমের গল্প শুনবো।

ডাগর চোখে তোমার দিকে
তাকিয়ে থাকবো
বুঝতে চেষ্টা করবো তোমার
আবেগের পরত কতটা পুরু।

তাকিয়ে থাকতে থাকতে তোমার উপরে
কাম জাগবে ঝড়ের বেগে
তারপর আলিঙ্গন চাইব
শীতের রাত টেনে এনে লুটিয়ে
দেবো তরঙ্গ, শীতল পাটিতে।

তুমি চাইবে মিশ্র ধাতু ঠোঁটের
বোতলে
ঢেলে দেবো অ¤øজান, উদজান,
ছলাকলার রঙ তামাশা।

তুমি আরও চাইবে
উমরাহ জান হয়ে ঢেলে দেবো সুরা
দেবো নাচের মুদ্রা,
হারমোনিয়ামের বাক্স থেকে
বের করে দেবো সহগ্র সুর।

ফেলে যাওয়া প্রেমের ঘ্রাণ উথলে
উঠলে প্রাণে
অশত্থের উঁচু ডালে
চোখের তারা কাঁপবে,
দরজা খুলে আনতে ছুটবে ঝুড়ি ঝুড়ি
বেলিফুল, সুগন্ধি মোম, আর রাত্রি
কালের গান।

ছাদের ঘরে বৃষ্টির ঘুম পাড়ানি শুনাবো
ঘুলঘুলি খুলে ,
তুমি যতই কবি গানের টালবাহানায়
কাটাবে সময়
আমার শালগাছ ততক্ষণে সাবালক সবুজ
পাতা ছড়াবে ।

দেখা থেমে যাবে, খেলা থেমে যাবে
বরেন্দ্র অঞ্চলের গম্ভীরায়
যোগিনীর দেহে খিস্তি খেঁউড়ের
অঙ্গ বস্ত্রে জড়াবে,
ভোরের দোয়েল পাখি বাক্যবন্ধ
পাঠ করবে।

প্রকৃতি জানে দেহের সাথে মনের
এই যে নভোযান
ঘটা করে মেলেনি,
মিলেছে দৈবক্রমে…।

*********

জলের স্পন্দনে
নাজমীন মর্তুজা

আগুন উস্কে দিয়ে চাঁদ
তুমি ঘুমিয়ে পড়লে মাঝরাতে
কবি একা বসে দেখি
তারা উঠা তারা খসা।

তবু ভাল লাগে
তোমার অমল ঘুমের মুখ দেখে
মাটি ও কদমের মত ভিজে থাকতে,
সবুজ পাতার মত হাসতে
ফুলের মত তাকাতে।

তারা গুলো খসে
পড়ছে শোভন শিহরণে,
আদরে আদরে দৃষ্টি ঝাপসা
হয়,
আড়মোড়া ভেঙে লজ্জাশীল
তুমি
তোমার বুকের সঙ্গে লেগে
থাকতে দেখে,
চোখের দিকে চোখ
ঈারিনা ফেরাতে।

ছুঁয়ে দিয়ে মন
যখন ঝরলে নিবেদনে,
আমি তখন খাবি খাচ্ছি
জল থেকে জলের স্পন্দনে…।
নিশিথে যাইও

চাঁদের গায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা
ক্ষত স্থানে রক্ত চন্দন জমে উঠেছে,
বাতাবি গাছে কাঁদছে চতুর্দশপদী।
মনে জ্বালিয়েছি পিলসুজ
তোমার জন্য রেঁধেছি ক্ষীর
জ্বালিয়ে উনুনের খড়ি।

ধনে পাতা টমেটোর ঝোলে ডাঙ্গর পাবদা
মাচানে পায়রার ডাক শুনে
ভোর হবে পূবের দেয়ালে ,
দেরি হবে জেনে সদর দরজায় চোখ পাতি।

পথের শ্রম হবে ভবে, স্নান হয়ে আছে শুকতারা
বেলাবেলি বাড়ি ফিরো সারারাত অমাবস্যা
ফণা তুলে আছে কাঁঠালিচাঁপা শীর্ষে
রাত জাগা সাপ
ফুঁসলিয়ে যত রাগ জড়াইও বুকে
মুছে দিয়ে পথের ঘাম চুমু দেবো কপালে।

তারপর শীতল পাটিতে প্রাণবুনে তুলে দেবো
শাক ডালে মিশিয়ে লোকমা কতক
বলবে ওগো কোথা যাও
আমার জন্য রাঙা ফল কি কিছু আছে?

পদ্যে হবো দেহ শিরা ও শরীরতন্ত্র
দুজনার চোখে চোখে ঘোর, ওষ্ঠে ওষ্ঠে কামড়,
তুমি লাঙল হলে আমি হবো অহল্যা ও মাটি
ভৈরবী তরুতলে তুমি নটবর রসভে উঠবে মাতি।

***********

জাকারান্ডা ও এডেলএইড হলিডে
নাজমীন মর্তুজা

ভালোবাসি জাকারান্ডার পাতা
খোঁপায় খুশবু আঁচলে রাখি ঢেকে
বেগুনি পুঁতির অবিনশ্বর মালা
অবসরে একা নতমুখে রাখি গেঁথে ।

ভালোবাসি দুপুরে একাকী বনে
মেপে দেখে নেই গাছের দীর্ঘ ছায়া
দোয়েলের ডাকে গা ছম ছম করে
তবুও ছুঁয়ে থাকি গভীর বিজনে কায়া।

বুক থেকে টাঙ্গাইলের নীল শাড়ি
জানি না কি বুঝে অজান্তে খসে যায়
পৃথিবীর তাতে ঘটেনা কোন ক্ষতি
তোমাকে পাই গহীনে গভীর অনুভূতি।

ভূগোলের সীমানা তুমি হবে না পার
একদিন ঠিক খুঁজে পাবো পথরেখা
পায়ের চিহ্ন ধরে হাঁটবো অবিরত
কখনো না কখনো পাবই তোমার দেখা

প্রতি প্রভাতে ক্লান্ত রাতের শেষে
জাকারান্ডা ফুটলে থোকা থোকা
ফুলের ভেতরে ঠাহর পাই তাকে
যে আমাকে রোজ করে দিশেহারা ।

জাকারান্ডার ডালে চন্দনা যদি
ভুলভাল গায় প্রেমের পদাবলী
নিজের তানপুরাটায় তবে
বেঁধে নিও গানের কথা ও কলি।

ভালোবেসে আবার জড়িয়ে ধরো
আধো আলো আধো অন্ধকারে
পায়ে যদি ঝরা জাকারান্ডা ঠেকে
কুড়িয়ে নিও একটু আদরে তারে।

গাফলতি করোনা
প্রেমিক মনই কেবল বোঝে প্রেম
কোথাও থাকবো আবছা আঁধারে
সেন্ডেলে ভেজা জাকারান্ডার ভোরবেলা।

**********

সে কি কেবলই ছবি
নাজমীন মর্তুজা

চমৎকার দিন আজ,
আকাশে মেঘ নেই এতটুকু
শীতের পর বাতাস বইছে।

পাশের পার্কটায় দেখে এলাম
একপাল মেগপাইয়ের সভা বসেছে,
দূর থেকে দেখলাম ভিক্টোরীয়
বিল্ডিংয়ের চূড়ায় পরীটাকে!

আকাশের দিকে বাড়ানো এক হাত
অন্য হাত তার বাঁ দিকের স্তন ছুঁয়ে আছে,
পাশে হুট করে দাঁড়িয়ে গেলো
ছানার জলের মত সবুজ ধোয়া
রঙের স্কুটার।

কালো টুপি পড়া যুবক
মাথা নেড়ে বলল- হ্যালো,
চোখ গুলো এতই চঞ্চল তার
যেন রাতের বেড়াল খুঁজতে এসেছে
দিনের আলোতে।

দূর বন্দরের মধ্যে ওঠে জাহাজের ভোঁ
মাথার উপরে উড়োজাহাজের বিষন্ন শব্দ,
হঠাৎ মনে পড়লো লাল পেড়ে
গরদের শাড়ি ,
পৃথিবী আসলে মন্দ নয়
তোমরা কি বল!

প্রেমিক তোমার স্টিয়ারিং হুইল বাজ
অসহায় দুই হাত,
দাঁতে ঠোঁট চেপে বিরক্তি লুকাচ্ছো ।

তোমার কপালে ঘাম
তোমার মুখ লাল
তোমার নিকেলের চশমায় কুয়াশা।

স্বপ্ন দেখলাম যেন
দুদণ্ড দাঁড়িয়ে
অসংখ্য দেয়ালের গায়ে
যেন অবিশ্রাম তুলি দিয়ে
তোমারই মুখ, নানা ভঙ্গির।

পর্যটন শহরে রাত ৯ টা,
অচেনা রাস্তায় দাঁড়িয়ে
হিম কুয়াশায় আচ্ছন্ন
যেন বাতাসে বরফ আসছে
একটা ট্রাম স্টপে থেমে আছে
ট্রামের পেছনে বিজ্ঞাপন
লং লাস্টিং লুব্রিকেন্ট।

ওভার কোটের ভেতরের হাত মুঠো
বেঁধে চলছি
হাঁটছি ¯øথ গতিতে হাঁটছি
সামনের যে কোন পাবে
ঢুকে যাবো রহস্যময়।

খেয়ে নেবো একগ্লাস বিয়ার
গুনগুন করে গাইবো
‘অভিযোগ করাটা তোমার সাজে না’।

ঐ অচেনা স্মৃতিগুলো
অচেনা মদের নাম যা
পাবের বিজ্ঞাপনে ঝুলানো
সি-ই-নু-জা-আ-ন-ও-ও
ঘরে ফিরবার আগে
হোটেলের বলরুমে ঢুকে
নেচে নেবো দুচক্কর নাচ
হেঃ এ টুইস্ট টুইস্ট।

চেনা রাস্তাগুলো অচেনা
গুড উড মোড়ে দাঁড়িয়ে
চুমুক দিলুম এক্সপ্রেসোর কাপে,
ট্রাফিকের সবচেয়ে সুন্দর
ক্ষণস্থায়ী হলুদ বাতি ঝলসে
উঠলে স্ট্রিট বাসের গিয়ার
বদলানোর শব্দ হোলো
জ্বলে উঠলো সবুজ।

আমি জেগে উঠলাম
রাতের ঘুম ভাঙা কবুতরের পাখার
শব্দে,
আমার সামনে ভিক্টোরিয়ার পরী
পেছনে অস্পষ্ট ইফেল টাওয়ার,
সামনে বহুদূর স্ত্যাচু অফ লিবার্টি,
বাঁয়ে ব্রহ্মপুত্রের উপর দিয়ে
বয়ে আসছে গুদারা নৌকা,
মাঝির কণ্ঠে-
ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে দে ছাড়িয়া।

আমার অচেনা শহরের ফুটে
ওঠা ফেলে আসা চেনা শহরের
ছবি,
তবে তোমরা বলো সে
কি কেবলই ছবি শুধু পটে আঁকা?

**********

অখন্ডিত প্রকরণ
নাজমীন মর্তুজা

আমাদের ধূসর প্রেম
সময়ের কারাগারে বন্ধ থাকা
সেই কবে থেকে
ইতিহাস খুঁটছে বুড়ো রেনেসাঁস,
বলতে পারো শেষ হবে কবে
হেঁটে যাওয়া প্রেমের উপাখ্যান?

তুমি সেই মন দেয়া দক্ষ নাবিক
জলে ভাসা ডিঙ্গিতে পানি উঠলে
দুপায়ের মধ্যকার দুরত্বে জলের রেখা আঁকো
তার পর দশ আঙুলের ঘেরে আটকে রাখো সুখ ।

চারিদিকে শকুন হাঁটছে
আমরাও সুখে অসুখে রয়েছি দ্বিধাহীন,
আমাদের প্রেম ব্যঞ্জনার আদি নেই, অন্ত নেই
আমরা এক মাত্রার মাঠে মাত্র দু’অক্ষর।

কখনো হই দুটিতে শালুক পাতার জল
আরতির রীতিতে বাতাসে মিশলে চুমু
পরাগ মিলনের উপধারায় সংজ্ঞা পায়
দেহের নরম প্রচ্ছদ।

বিশ্ব বৈভবের কাছে আছে আমাদের
প্রেমের খরগ্রোতা ঋণের দায়,
কাম রতি অভিমান উৎসর্গ
সবই কি শুধু মনোযোগ ও আকর্ষণ ?

তবে কে হবে জীবনের জন্য জীবনের নিত্যসঙ্গী
বাঁধতে থাকবে ক্রমশ আপন ছায়ায় সোনালী সুপবন?

**********

জানতে চাইলে ……
নাজমীন মর্তুজা

প্রতিটি সকাল থেকে সন্ধ্যা দিনগুলো কাটছে
দম ফুরিয়ে যাওয়া পাখির ক্লান্ত পাখার মত
মন্থর চালে।

তোমার মূল্যবান সময় নিয়ে নেই সেই ভয়ে
একটা গভীর আলিঙ্গন দিয়ে পালিয়ে যাই ,
আমার ওলোট পালোট বলার ভঙ্গি দেখে
যদি বুঝে যাও বুকে চাপা কথা মালা।

তোমার চোখে আমার
হাতের দাগ দেখে
চমকানোর কষ্ট যতটা পেয়েছিলাম,
ততটুকু পাইনি সেদিন তাতা ইস্ত্রির ছ্যাকায়।

তুমি জানো আমি চিরটাকাল ঘরছাড়া আউলা
তাই তো তোমার গোলার্ধীয় চোখগুলোতে
হৃদপিণ্ডের মতো সাজানো বাড়ি দেখতে পাই
মওকা পেলে অপলোক তাকিয়ে থাকি।

তোমার বøটিং পেপার মোড়নো হাত গুলো যখন আমার মুখ ছোঁয়
নিমিশেই শুষে নেয় চোখ সমুদ্রের সব জল
এটাকে কি বলে জানো
ভালোবাসার রেওয়াজ।

কেন বললে তবে আমি আর আগের মত নাই
আমার এই আগের মত নাই হবার নিজস্বতা টুকু নিয়ে যদি বদল ঘটে যায় ভেতরে বাইরে
তোমার কি চিনে নিতে কষ্ট হবে খুব।

জানই তো মানুষ শুধু নিজের প্রণোদনায় নষ্ট হতে পারে
প্রহসন যদি জীবন হয়,
জীবন ভর তোমার জন্য বদলে যাওয়ার এই আমি কে
কি নাম দেবে তবে –
প্রতারক নাকি প্রেমী?
ইচ্ছে

ইচ্ছে হয়, শুধু হাওয়াময় লিখে রাখি’
ভাল থেকো মুগ্ধতা’
ঝুরঝুরে তীব্র এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেই
কিছু হাল্কা চুমু
কিছু কলকল হাসি, কাজলের নীল রং।
ইচ্ছে হয়, রাতের অতল থেকে একটা তারা
না না অসংখ্য তারা পাঠাই তোমার মুঠোয়
রাত্রে জোনাকি হয়ে যাই, প্রতীক্ষার খোলা জানালায়।
ইচ্ছে হয় জল মাটি ঘাসের আঙুল পাঠাই
তুমি ছুঁয়ে দিয়ে ফোটাবে ফুল,
জানি তোমার স্বপ্নগুলো আঙুল ছুঁতে চায়
ছুঁয়ে দিলে আলোয় মিলিয়ে যাবো।

********

শুন্যতাকে কাঁপায় রোদ্দুর
নাজমীন মর্তুজা

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
বিকেলের রোদ পোড়া ত্বকে
দেখে যেও প্রতিটি বলিরেখা
ত্বকের বাইরে কি করে আঁকাবাঁকা দাঁড়িয়ে
শুধু তোমার কথা ভেবে কাঁদে।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
সকলের অগোচরে অপ্রত্যক্ষে
ঘুমন্ত দেহের উপরে, শেষরাতে
এইখানে সবকিছু অপেক্ষায় আছে
আমি, আমিত্ববিহীন।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
শীত শেষে বসন্তের সাথে
বহু বহুদিন আগে মনে পড়ে
পূর্ণিমার আলো ঢেলে দিয়ে
কি করে নটরাজ তুমি নেচেছিলে
এই দেহে, এই মনে।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
মহাভারত শোনাবো, শোনাবো রামায়ন কোলে মাথা রেখে চুলটা আঁচড়ে দেবো
স্নান শেষে এক মাথা ভিজে চুল
আদরে মোছাবো তোমার মুখ।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
মাথার উপরে সূর্য নিয়ে
হারানো শিশুকে নির্ভরতার বুক দিও,
নীল অববাহিকায় তৃণ ও ত্যাগের গল্প
শুনিয়ো।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
জটার বিনুনি লম্বা হয়েছে,
কতদিন জলে ভাসা সাবান ধরিনি
রোজ তোমার নামে চাঁদ পাড়ি
চাঁদকে আদর করি।

ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে,
চিন্তার জাল গুটিয়ে নিয়েছি
গ্রীষ্ম তাপ গায়ে লাগে
ভৌগোলিক নাশকতায় বড় একা লাগে,
যারা গান গেয়ে ফিরে যায়
সেই বাঞ্জারার দলে তোমার
নাম খোদাই রুমাল পাঠিয়েছি,
তবু ফিরে এসো অন্তত একটা চুমুর স্বার্থে।

********

পৌনঃপুনিক বিবরণ
নাজমীন মর্তুজা

কড়া নড়ে উঠলো ভোরবেলায়
বেরিয়ে দেখি একগুচ্ছ বেলি হাতে
দাঁড়িয়ে আছে নাইজেরিয়ান যুবক,
এডেলএইডে, তুষারের মত বৃষ্টির ঘন কুয়াশা
নাম বলল ইউবেত
আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছি
আশ্বিনী তারার মত তার মুখটা জ্বলছে
আর আমার হৃৎপিণ্ডে কে যেন
তুমুল তবলা বাজাচ্ছে বিরামহীন…

সামান্য একটা শব্দ উচ্চারণ করলো-
নাও, শব্দটা বেশ জোরালো, গাঢ়,
হাত বাড়িয়ে নিলাম ঠিক, কিন্তু
মনে হল ওকে ছিঁড়ে নিলাম।
অনেকখানি আত্মার কাছাকাছি
ঠিক হাওয়ায় ভাসা ব্যাপার নয়,
গতরাতে দেখা স্বপ্নটা সে
কিভাবে ছুঁয়ে দিল আর
ফুলগুলি এতো তাজা যেন শাহবাগের
টুকরি থেকে তুলে আনা,
নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিতে নিতে
নেশার ঘোরে ডুবে গেলাম,
ইউবেত জিজ্ঞেস করলেন-
খুব ভালবাসেন বেলি ফুল
আর ওকে ?
ওর কথাগুলি এলিয়তের টুকরো
কবিতার মত,
হৃদয়ের মাঠ ভেঙে চলছে,
আমাকে যদিও সে চেপে ধরেনি
তীব্র মুঠোয়, তবু চাপ অনুভব করলাম,
শিথিলতায় গড়িয়ে গেল কিছুটা সময়,
স্পন্দনময় অতিরেকের জগত থেকে
বের হয়ে তাকে বললাম-
বোলো তাকে,
সে ফুল ফুটায় আমার জন্য
আমি ফুলচাষী এবং ফুল
দুটোকেই ভালোবাসি,
ইউবেত চলে গেল পরাগের
ধুলো উড়িয়ে,
ভালবাসার ভাললাগার মরমি
করাত তখনও
খণ্ডখণ্ড করছে আমাকে…।



মন্তব্য চালু নেই