প্রধান ম্যেনু

নাজমীন মর্তুজা’র ৫টি মনোলগ কবিতা

ডায়েরি
নাজমীন মর্তুজা

বিভা
আজ সারাদিন তোমার ডায়েরি পড়লাম
প্রতিটি পাতায় লিখে রাখা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বিষাদ খেয়াল
স্মৃতিচারিতার সুতোয় গাঁথা একটা একটা দগ্ধ দিনের ফুল
প্রায় বেয়াল্লিশটা বছরের কথা
বড়ো কম কথা নয়
নয় মামুলি বিষয়।
তোমার ডায়েরি পড়ে জানলাম
নারীর পৃথিবী, নারীর সংগ্রাম
নারী কমিউনিজম, মার্কস থেকে মাও সেতুং
মনুসংহিতা এবং নারী, ধর্ম ও নারী
সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে তেভাগা সংগ্রাম
হারানো অতীত থেকে ঝাঁপানো বর্তমান।
পদে পদে সময়ের আয়না
স্বাধীনতা হারা এক নারীর চোখ দর্পনে
দুই শতাব্দী যাপন ক্ষণের বচন
বুকজুড়ে কষ্ট তো নয় বরফের গান।
তোমার প্রশ্ন গুলো কোট করে রাখলাম বলেছিলে-
‘এমন কোন আর্দশ বা নীতি এ জগতে স্থান কাল-পাত্র নির্বিশেষে, সব সময়ের জন্য সার্থক হয়েছে?’
আমি জানি না হয়েছে কিনা
বলেছো’ আমার জীবনই আমার বাণী’ যদি কারো বোধগম্য না হয় তবে আমার বাণীকে অযৌক্তিক মনে হতে পারে।
বড় ভাল বল্লে বিসর্জিত বিবেকে
আমরা আর কতটুকু ধার্মিক থাকি?
প্রতিশোধ নেবার পালা যখন এলো
তখন তুমি গান্ধীর সেই প্রত্যয় মেনে নিলে
বলে ফেল্লে – চোখের বদলে চোখ যদি নিতে হয়
তাহলে পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে,
অহিংসা ও প্রীতির মধ্যে যে বীরত্ব নিহিত তা হিংসায় নেই,
তাই তো তোমাকেও গান্ধীর মত ল²ণ তুকারাম গোলে কে রেহাই দিতে হলো,
তোমার কি মনে হয়নি একবার
তোমার আত্মকথা বদলে গেলো?
হয়ত ভাবছিলে তুমিও গান্ধীবাদী সত্য- সাধনার উত্তরাধিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, বিশপ টুটু, আউংসাংসু-চি র মত স্বদেশ বিদেশ জাতীয়ভাবনা ও বিশ্বজনীনতা মিলবার-মেলাবার চারিত্রধর্মে একাকার।
তুমি গুছিয়ে যতটা সুন্দর ভাবে নিজেকে সামলেছিলে
কিন্তু সাহিত্যর প্রতি, বন্ধুত্বের প্রতি তোমার প্রগাঢ়তা তলানিতে এসে ঠেকেছিল,
তোমার চিলতে গোপনে বাস সামাজিক মননে ধিক্কার ছিল তাদের প্রতি
দোষ গুণ বিচারে যারা একদম ঠোঁটের গোড়ায়
তোমার দেহ শৈল্পিকতা কে নিছক
হাম্পি বাকুরা খাজুরাহো র মূর্তি বানিয়েছিল
বড় ভাল লাগলো তোমার সূর্যাস্ত এবং চন্দ্রোদয়ের সময়কার দেহমিলনের স্মৃতির স্বর্ণখন্ড,
বিভা’’র গোপনতার দুরত্বের বিষাদের
হাজার হাজার তারাজ্বলা সুখের গভীর আকাশ। তোমার ইচ্ছেগুলো আদর গুলো মনখারাপ, গলা চিরে চিৎকার রক্তঝরা ঠোঁট তোমার লেখা ডায়েরির ছেঁড়া পাতায় থমকে গেলাম
কি ছিল তবে?
পরের পৃষ্ঠায় কিচ্ছু নেই, শুধু আঁকিবুকি,
অভ্যস্ত হাতের আঁচড়ে কিছু মুখের কোলাজে ঠাসা কিছু বিকৃত মুখের অবয়ব। বুঝতে দেরি হয়নি তুমি এক থাবলা থু থু দিয়েছিলে সেই মুখ গুলোতে।
তুমি আদরের পাগল ছিলে
রূপকথার রাজকুমারের কিন্তু বাস্তবে হয়ে গেলে প্রগতির পথে এক সংগ্রামী জীবন,
মানুষ হওয়া মানুষ করা : সমকালের অনুষঙ্গে।
পালন করতে শুরু করলে বারো মাসে তেরো পার্বণ।
কথা দিলাম বিভা তোমার দিনলিপির লাইনগুলো আমি ছড়িয়ে দেবো
চলমান সময়ে গুঁজে রাখবোনা
পুরোনো তোরঙ্গে।

*********

সুরাইয়া…
নাজমীন মর্তুজা

‘জালিম’ এ নামটা খুব পরিচিত—
পাশের বাড়ির মেয়ে মনে হয়।
তাই তো সেদিন দাদা বললো, “যদি পটে যেত বউটা!
এবার যদি মেয়ে হতো, সত্যি ওর নাম রাখতাম ‘সুরাইয়া’
জানিস তো, একই নামে সুরা ও সুর দুই-ই বর্তমান।”

সু রা ই য়া…..
নাম ধরে ডাকতেই মনে হলো দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
দৌড়ে গিয়ে হুড়কো নামিয়ে দেখি,
একটা নিরবতা—দূরাকাক্সক্ষা—মৌন
একটা রঙিন, থমথমে মুখ
লাল-নীল সুতোয় বোনা একটা পুতুল…

গতকাল আমার মেয়ে পাশের বাড়িতে ফেলে এসেছিল,
এই যে পুতুলটা!
আচ্ছা, এ কি গান ভালোবাসে? সাজতে?
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেগুনি রুমাল খোঁপায় জড়াতে?
এ কি গাইতে পারে?
‘ঘুঙ্ঘট কি আড় সে দিলবার কা
দিদার আধুরা রেহেতা হে
যাব তাক না পারে আশিক কি নাজার
শৃঙ্গার আধুরা রেহেতা হে…’

তার সৌন্দর্য আকাশে ওঠে; কত গল্প কত কত কথা—
অদেখায় ঢাকা থাকলো ঋজুপাঠ।
আমরা দুজন ছেলেবেলায় ভাঙা ধ্বস্ত সিঁড়ি বেয়ে
দু’চার ধাপ টপকে, কত কুল পেড়েছি!
কাঁচামিঠা আম, আচারের বয়াম ভেঙেছি!
—সে কি ভয় ওর! দেখিস আজ মা মেরেই ফেলবে!
পাপবোধে হাত দিয়ে, চোখ দেখি ভেসে যাচ্ছে—

কেমন একটা স্কুল পালানো ফন্দি,
পাঠ রোধ, ভুলভাল ব্যাকরণ,
আতঙ্ক বিজ্ঞান, বিফল গণিত।
গোলাপি-হাসনা বিলাস, তেলের বাটি
সবুজ শার্টিনের ফিতে, কাঠের চিরুনি, লম্বা কলাবেণি,
চুলটা আঁচড়ে দিতে দিতে ওর মায়ের বকুনি, ধাড়ি মেয়ে!
গোসল শেষে একমাথা ভিজে চুল—ও টান খায় চুলে,
আমি বসে কান্নার সিঁথি কাটি দূরের দেয়ালে দেয়ালে…

জানিস তো, তোর নামটা নিয়ে কত খিস্তি-খেউড়
কাঁদতিস খুব বখাটে ছেলেটার খেপানোর শব্দ শুনে,
‘সুরাইয়া রে সুরাইয়া দিলি অন্তর জুড়াইয়া…’
—শোন বান্ধবী বলছি, তোর নাম আখ্যান আরব দেশের;
সুরা থাকে সুর থাকে, থাকে মাতলামি।
এখন কি তোর জন্য কেউ মাতাল হয়?
তোর কি রাগের গ্রীষ্মতাপ গায়ে লাগে?
তুই কি ভালো রাঁধিস এখন?
শুনেছি তুই স্কুল পড়াস—দিদিমণি নাকি?
টিউশনটা জমেছে কি?
কেমন বুঝিস সংসার মাটির জ্যামিতি?
শুনেছি তোর উঠান ভরা গাছ,
ফড়িং ওড়ে, ফলে-মূলে ঠোকরায় নাকি পাখি!

জানিস, আমি পেয়ারাটা এখনও খাই নুন আর ধানি মরিচ ছাড়াই,
তোর কথা ভাবি আর স্মৃতির জালখানি রোদ্রে শুকাই।
জানি, তোর ঘরে আমার ভালোবাসা মাপবার যন্ত্রখানি নাই
নাই কোনো অনুভূতি, নাই সেই বোঝাপড়া।

মনে আছে তোর আমার লেখা চিঠি?
প্রেম করতিস তুই আর অনুভূতি লিখতাম আমি!
কত ডাকি তোরে, ‘ওরে বন্ধু, ওরে আমার সুন্দর…’
ডাকি দূরে থেকে… নিরুপায়…

এ কবিতাটা পড়বার একটা বিহিত অন্তত কর—
জানিস, আজ বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে মন,
স্মৃতির পাতা উল্টে যাচ্ছে জলে;
সেই অমলা ডোবার উল্টে দেওয়া হাওয়া—
ফ্রকের বেলুন উড়িয়ে যেন কিশোরবেলায় যাওয়া।
বুঝবি তো এই কবিতা? একেবারে সহজ বাংলায় লেখা
—পড়িস, যদি পত্রিকাতে ছাপে।

আমি চিরটাকাল ভ্রাম্যমাণ হিমালয়ের মতো উদাসীন।
জানি জানি জানি, আমি তোর জীবনে শিহরিত ছত্রাক!
যদি কখনও সময় পাই,
দেবো প্রেম-সুধা-সিন্ধু এক আঁজলা ভরে
সুরা ও সুর এক করে ডাকবো নতুন করে
‘সুরাইয়া’ আমার বাল্য বন্ধুরে…

*********

পাগলু
নাজমীন মর্তুজা

নির্দয় রোদ্দুরে মহা শোরগোল,
ভিড়ের মধ্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
এগুচ্ছি,
চারিদিকে কয়েক‘শ লোকের চোখ,
ঢেউয়ের মত ফুলে ফুলে ক্রোধে
কেঁপে উঠছে মস্তান গুলোর বুক।

এগুচ্ছি আরও কাছে অনেক কাছে
ঘটনার ভ‚মিতে অতি কষ্টে ভিড় ঠেলে
ঘাম হচ্ছে অঝোরে, তেষ্টা গলা ভরা
ভারী সঙ্কুচিত, জড়সড়।

হঠাৎ চোখটা ছিটকে পড়া রক্তের ফোঁটায়
পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে একজোড়া যুবক
পিটা শালা শুয়োরের বাচ্চাকে,
একটা আধশোয়া নিরালম্ব শরীর
টানতে টানতে উঠবার তাগিদ
পায়ে জুতো নেই, জামা ছিড়ে ফর্দাফাই।

সর্বাঙ্গে বিষের ব্যথা
কালশিটে রক্তের দাগ কপাল চাতালে
খানিকটা বমি উগ্রে এলো
মানুষের পশুত্ব দেখে
রক্ত পড়ছে কপাল, গাল, নাক, কনুইয়ের
রাস্তা বেয়ে।

সমস্ত শরীরে ধুলো কাদার আস্তরণ
ঠেলে এগুচ্ছে
কোথায় ধাবমান হচ্ছে সে
চলতশক্তিহীন শরীরটা কতদুর নিয়ে যাবে
সে,
পথচারী দেখছে, হয়তো ভাবছে
নেড়ি কুকুরের অধম।
ছোকরা কতক
গালাগাল দিচ্ছে, আর লাথি বসাচ্ছে,
হঠাৎ একটা পরিচিত শব্দ পেলাম,
শৈশবের পরিচিত কান্নার, কতবার
শুনেছি,
বুঝতে দেরি হল না সে কে!

নিজেকে আড়াল করবো সে চিন্তা
হল না,
শুধু কান্না এলো বুক ভরে
চোখের জল ছুটে এলো
তবু আহত রক্তাক্ত মুখটা বড়
আদুরে চোখগুলো নির্মোহ
প্রতিশোধ নেবার প্রতিহিংসা মেরে
বেঁচে আছে শুধু।

জীবনের গতি মসৃণ ভাবে ছোটেনি তার
একটা চিঠি একটা ছোট প্রত্যাখ্যান
সম্ভাবনাহীন আশাহীন এক জীবন
দিল তাকে,
সে পাগল পাড়ার, মোড়ের পাগল
বটে, মার খায়, গাল খায়,
কিন্তু ব্যাথা নিয়ে বেঁচে থাকার হোঁচটগুলি
খেতে হচ্ছে না তাকে।

তার স্বপ্ন নিয়ে ভয় নেই,
না, জীবন নিয়ে ভয়।

কাছে গিয়ে রক্তাক্ত মাথাটা
বুকে জড়িয়ে ধরি
হঠাৎ যেন জেগে উঠলো
বেয়াল্লিশ বছরের স্মৃতি।

দে, দে, ডলার দে, অস্ট্রেলিয়া যাবো,
মায়ার কাছে যাবো।

******

বিড়ি
নাজমীন মর্তুজা

একটা বিড়ি হবে বাবু
আরে আকাশ থেকে পড়লি কেনে,
একটা বিড়ি চাইছি
দে দে, দে কেনে,
তুই বড় ভালো মরদ
বলেনি কেউ?

আমি তোকে চিনি বাবু
যখন থেকে মধুঋতু পিঁপড়ে খাওয়া শুরু করলো
সেই তখ্খন থেকে
আচ্ছা বলবি তো ঠিক ঠিক
বস্তায় ভরা ওটা কার লাশ
অমন করে মারতে পারলি?

তুই না স্বামী নামের দেবতা
তোর জন্য কত পরমান্ন রেঁধে
চলকে পড়া ঝোলে হাত পুড়েছে
তুই অমন করে উপোসী পেটে লাথি
বসাতে পারলি?

জানি জানি
মরদ চায় নিত্যনতুন
মুগ্ধতার ছক
ঘরের নারী যতই মুখ ধোঁয়াক
ছুঁচু করার
তবুও তুদের মনে কত কত
আমার মত পথ নারী
বকবকম যৌনকাতর।

অ্যাই মাগি বোইলবি না
একটু পরেই তো আইসবি
বুকের হরলিক্সে নাক ডুবাতে,
তা না হলি তুই তো, না মরদা ।

হুম আমি ডাইনি
তা না হলি তোরা
এক ঘেয়ে পিটাবি
বিষ নজরে তাকাইবি
পেটের বাচ্চা মাইরবি।

মানুষ ও মানুষ এখনো জাগে না
মানুষ গর্জে উঠেনা
অন্ধকার ভাঙ্গে না দেখে
আমি সুজাতা কত মরদের
চাঁদমারি অভিযাত্রী।



মন্তব্য চালু নেই