শিরোনাম:

‘পতিত জলাবদ্ধ জমিতে কৃষি বিপ্লব’ : কলারোয়ায় পানিসিঙ্গারা চাষে কৃষকের সুদিন

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় কৃষকদের মাঝে বৃদ্ধি পেয়েছে মৌসুমি পানিফল চাষে। পানিফল স্থানীয়দের কাছে ‘পানি সিঙ্গারা’ নামেই বেশি পরিচিত।
এরই মধ্যে লাভজনক এই ফল চাষ করে পরিবারের সুদিন ফিরেছে অনেক প্রান্তিক চাষির।

উপজেলার জলাবদ্ধ ও পতিত জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে পানিফলের গাছ। কলারোয়া পৌরসদরের মুরারীকটি থেকে যুগিবাড়ী পর্যন্ত সাতক্ষীরা-ঢাকা মাহাসড়কের দুইপাশের পতিত ও জলাবদ্ধ জমির পানির উপর যতদূর চোখ যায় শুধুই পানি সিঙ্গারার গাছ-পাতা। সেখানে চাষ হচ্ছে এটি। ফলটি বাজারে তৈরি সিঙ্গারার মতো দেখতে হওয়ায় স্থানীয় ভাষায় ‘পানি সিঙ্গারা’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।

প্রতিদিন ভোরে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা যাত্রীবাহী বাস, ভ্যানগাড়ি, ইজিবাইকের মাধ্যমে বস্তায় ভরে এই পানিফল বিক্রির জন্য নিচ্ছেন সাতক্ষীরা সদর, যশোর, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে।
এছাড়াও কলারোয়া পৌরসদরের মুরারীকটি থেকে যুগিবাড়ী পর্যন্ত সাতক্ষীরা-ঢাকা মাহাসড়কের দুইপাশেও পানিফল বিক্রি করছে স্থানীয় কৃষকরা।

পানিসিঙ্গারা চাষে সংশ্লিষ্টরা জানান, উপজেলার পতিত জমিতে এই পানিফলের চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মূলত কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন এখানকার কৃষকেরা। প্রতিবছর বোরো ধান কাটার পর, জলাবদ্ধ পতিত জমি, পানি জমে থাকা ডোবাসহ খাল-বিলে এই ফলের লতা রোপণ করা হয় (জমে থাকা পানিতে)।

তারা বলেন, তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে গাছে ফল আসে। এ ফল চাষে সার-কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।

জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পানিফল প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৫/৩০ টাকা দরে। প্রথমদিকে কেজি প্রতি দাম ছিলো ৪০/৪৫ টাকা।

এদিকে ডোবা আর বদ্ধ জলাশয়, পতিত জমিতে পানিফল চাষ করে পরিবারের সুদিন ফিরেছে উপজেলার শতাধিক হতদরিদ্র কৃষকের।

স্থানীয় পানিফল চাষি কৃষকরা জানান, সাতক্ষীরার জেলার মধ্যে কলারোয়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে পানিফল চাষ শুরু হয়। কম খরচে
বেশি লাভ হওয়ায় দিনে দিনে এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন দরিদ্র প্রান্তিক কৃষকরা।

কৃষকদের দাবি, কলারোয়ায় পানিফল চাষে সফলতা পাওয়ায় দেশের অন্যান্য উপজেলার চাষিরা অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। এমনকি অনেকে সরজমিনে এসে চাষাবাদ পদ্ধতি শিখে তাদের পতিত জমিতে চাষ শুরু করছেন।

কলারোয়া পৌরসদরের মুরারীকাটি গ্রামের চাষী পানিসিঙ্গারা চাষী আবু হাসান জানান, অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে পানি ফলের চাষ। সুস্বাদু এ ফলটি জলাবদ্ধ এলাকায় পতিত জমিতে খুব সহজেই চাষ করা যায়। এছাড়া অল্প খরচ করে উৎপাদন বেশি ও লাভজনক হওয়ায় পানি ফলের চাষে ঝুঁকছে এখানকার চাষীরা।

আরেক চাষী সুজয় দাস বলেন, ফলটি বাজারে তৈরি সিঙ্গারার মতো দেখতে হওয়ায় স্থানীয় ভাষায় ‘পানি সিঙ্গারা’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।

কয়েকজন পানিসিঙ্গারা কৃষক বলেন, ১৩ বছর ধরে কলারোয়া পৌর সদরের গোপিনাথপুরে পতিত ও জলাবদ্ধ জমিতে পানিফল চাষ করে আসছেন। এ চাষে সার কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য ফসলের থেকে এর পরিচর্যাও কম। এছাড়া অল্প খরচে লাভ অনেক বেশী। খেতেও সুস্বাদু।

কৃষক রেজাউল ইসলাম জানান, এ বছর তাঁর ৬বিঘা জমিতে পানিফল চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে পানি ফল বিক্রি হয়েছে ১লাখ ৪০ হাজার টাকা। এখনও জমিতে ফল রয়েছে, আশা করছি এবার ৬বিঘা জমিতে ১লাখ ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রয় হবে।
তিনি আরো বলেন, অন্যান্য ফসলের থেকে পানিফল চাষে দ্বিগুণ লাভ হচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই ফল চাষে আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, মুরারীকটি পতিত জমিতে ৫ বিঘা পানিফল চাষ করেছেন, বর্তমানে ফল তুলে বিক্রি করছেন। গত মৌসুমে খরচ বাদে পানিফল চাষ করে ৯০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার ফলন ও বাজারমূল্য দুটোয় ভালো। তাই গতবারের চেয়ে বেশি লাভের আশা করছি।

পানিফল চাষী ওয়াজেদ আলী, আব্দুল মাজেদ, শিল্পি, একুব্বার, শফিকুল ইসলাম, মুনসুর আলী, নাজির গাজী, শামসুর রহমানসহ অধিকাংশ কৃষক জানান, সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে ঋণ সহায়তা পেলে আরো অনেক প্রান্তিক কৃষকরা পানিফল চাষের সুযোগ পাবেন। ফলে একদিকে নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হতে পারবেন ঠিক তেমনই গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অবদান রাখা সম্ভব হবে।

কলারোয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, পানিফল একটি বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। বর্তমানে পানিফল কৃষিতে নতুন এক সম্ভাবনাময় ফসল। কৃষি বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে পানিফল চাষের বিস্তার ঘটাতে। যেকোন পতিত পুকুর, ডোবা অথবা জলাশয়ে পানিফল চাষ করা সম্ভব। তুলনামূলক এর উৎপাদন খরচ কম। পানিফলের পুষ্টিমান অনেক বেশি, খেতেও সুস্বাদু।
তিনি বলেন, চলিত বছর প্রায় ৩৭ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ করা হয়েছে।
যা আগামি বছর বৃদ্ধি পেয়ে আরো বেশি জমিতে চাষ হবে বলে তিনি মনে করেন।