পারিবারিক কলহের জের: কুমিল্লায় দুইদিনে খুন হয়েছে পাঁচ নারী

কুমিল্লায় পারিবারিক কলহের জের ধরে হত্যাকান্ডের ঘটনা বেড়েই চলেছে। পারিবারিক কলহের জেরে টানা দুই দিনে পাঁচ নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। গত সোম ও মঙ্গলবার পৃথক তিনটি ঘটনায় এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার দুটিতে সরাসরি পরিবারের লোকজন সম্পৃক্ত ছিল। বাকি ঘটনায় পরিবারের লোকজনের সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ এখনো না মিললেও স্বামীর সাথে অভিমান করে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এক নারী। হত্যার অপর দুটি ঘটনার একটিতে অভিযুক্ত একজন জামাতা অন্যটিতে ছেলে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বউ-শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যা করে রিকশা চালক লোকমান হোসেন (৩৫)। এদিকে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সোমবার সাইফুল ইসলাম (২৮) নামের এক যুবক তার মা ও ভাবিকে কুপিয়ে হত্যা করে। এছাড়া কুপিয়ে আহত করে এক ভাতিজিকেও। উভয় ঘটনার ঘাতকরা মাদকাসক্ত ছিলো বলে স্থানীয়রা জানান। বুধবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শহরতলী আড়াইওড়া এলাকায় একটি ডোবা থেকে শারমিন আক্তার (২৭) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার স্বামীর সাথে অভিমান করে বের হয়ে যায় সে।

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে বউ-শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যা করে রিকশা চালক লোকমান হোসেন। উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের হালগাঁও গ্রামে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই ঘটনা ঘটে। নিহতরা হচ্ছেন, হালগাঁও গ্রামের লোকমান হোসেনের স্ত্রী ফারজানা আক্তার(২৫), ফারজানার মা কুমিল্লা সদর উপজেলার বল্লভপুর গ্রামের শাহ আলমের স্ত্রী বানু বিবি(৫৫)। হত্যার পর মায়ের লাশ চৌকিতে, মেয়ের লাশ মাটিতে পড়েছিলো। পুলিশ হত্যায় অভিযুক্ত লোকমান হোসেনকে আটক করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইমাম হোসেন মুন্সী জানান, স্ত্রী ফারজানা আক্তার পরকীয়ায় জড়িত অভিযোগে তার ওপর ছুরি নিয়ে হামলা করে লোকমান। তার বাড়িতে বেড়াতে আসা শাশুড়ি বাধা দিতে গেলে তার ওপরও হামলা চালায়। এতে দুইজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাদের হত্যার পর লাশের পাশে বসে থাকেন লোকমান হোসেন। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

বুড়িচং দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক আজিজুল বারী নয়ন জানান, বউ-শাশুড়িকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ঘাতককে আটক করেছি। তার দাবি পারিবারিক কলহের কারণে সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা বিষয়টি আরো তদন্ত করে দেখছি।

এদিকে, সোমবার কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে সাইফুল ইসলাম (২৮) নামের এক যুবক তার মা ও সৎ ভাবিকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে এবং ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এছাড়া কুপিয়ে আহত করে এক ভাতিজিকেও। সোমবার দুপুরে উপজেলার আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের পুজকরা গ্রামের পূর্ব পাড়ার বেপারী বাড়িতে এই হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন ওই বাড়ির আবদুল হামিদের ২য় স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৮) ও তাঁর প্রথম পরিবারের ছেলে আবদুল আজিজের স্ত্রী নুরুননাহার বেগম পুষ্প (৪২)। এছাড়া কুপিয়ে আহত করা হয় আজিজ-পুষ্প দম্পতির মেয়ে আরজু আক্তারকে। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এক বোনের বাড়ি থেকে পাঠানো পিঠা খেতে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাইফুল তার মা ও ভাবিকে বটি দিয়ে কুপিয়ে করে হত্যা করে। কুপিয়ে আহত করে ভাতিজিকে।

অপরদিকে, বুধবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শহরতলী আড়াইওড়া এলাকায় একটি ডোবা থেকে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের তার নাম শারমিন আক্তার (২৭)। তার স্বামীর নাম আবদুল আলিম। নিহত শারমিনের বাবার বাড়ি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ষাইটশালা এলাকায়। তার স্বামীর বাড়ি একই উপজেলার দইখলায়। বুধবার স্থানীয়রা পুলিশকে ডোবায় নারীর মরদেহ দেখে পুলিশকে খবর দেয়।

নিহতের শারমিনের বাবা আবদুল অদুদ জানান, পারিবারিক কলহের জের ধরে মঙ্গলবার বিকেলে স্বামীর সাথে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে আর বাড়িতে আসেনি। পুলিশের মাধ্যমে জানতে পেরেছি মেয়ের লাশ ডোবার পানিতে পড়ে আছে। নিহত শারমিনের এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। এদিকে মরদেহটি যেখানে পাওয়া যায় সেটি একটি ঘনজঙ্গল। প্রায়ই ওই স্থানে নেশাগ্রস্থদের আনাগোনা থাকে। ধারণা করা হচ্ছে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সোহান সরকার বলেন, আমরা লাশের সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করেছি। আমরা নিহতের স্বামী ও বাবাকে খবর দিয়েছি। সম্ভাব্য সব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে তদন্ত করেছি। তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পারিবারিক সহিংসতা ও নারীদের আক্রান্তের বিষয়ে প্রত্যয়ন উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা আক্তার বলেন, এসব সহিংসতার পেছনে দায়ী মাদকের আগ্রাসন। মাদকের আগ্রাসন প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনকে আরো আন্তরিক ভূমিকা নিতে হবে। এর সাথে পরিবার থেকে শিশুকে নৈতিক শিক্ষায় বড় করে তুলতে হবে।



মন্তব্য চালু নেই