প্রধান ম্যেনু

পুলিশের প্রতি অনাস্থার কারণেই ‘সার্জেন্ট ইমরান আমার বন্ধু’র মতো ঘটনা

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সকল যানবাহনে নম্বরপ্লেট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রায়শই দেখা যায়, অনেকেই নম্বরপ্লেট ব্যবহার না করে কোনো সংগঠন বা পেশার নাম লিখে রাখছেন। বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় পুলিশ আবির নামের এক যুবককে আটক করে; যিনি মোটরসাইকেলে নম্বরপ্লেট না লাগিয়ে লিখেছিলেন, ‘সার্জেন্ট ইমরান আমার বন্ধু’। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনাস্থার কারণেই ঘটছে এ ধরণের ঘটনা। এই প্রবণতা এখনই না রুখলে ফলাফল হবে ভয়াবহ। অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরণের প্রবণতা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত এবং তার জন্য দরকার দোষীদের সাজার ব্যবস্থা করা। খবর সময় নিউজের।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেটের ছবি ভাইরাল হয়। ওই প্লেটে লেখা ছিল ‘সার্জেন্ট ইমরান আমার বন্ধু’। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৃষ্ট আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসার পরই মোটরসাইকেলটির সন্ধানে নামে মহানগর ট্রাফিক পুলিশ।

বিষয়টি নিয়ে তৎপরতার পর বুধবার সন্ধ্যায়ই তাকে আটক করা হয়। তবে আটকের পর কারণ হিসেবে কিছু আবেগীভাবে তিনি বলেন, ‘ইমরান তার একজন খুব ভালো বন্ধু। সে তাকে মোটরসাইকেল কেনা থেকে শুরু করে তাকে চালানো শিখিয়েছেন। তাই বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকেই তিনি নম্বর প্লেটে এটি লাগিয়েছেন।’ এছাড়া ভুল স্বীকার করায় এবং অনুতপ্ত হওয়ায় তাকে কোনো মামলা দেননি সার্জেন্ট আসাদুজ্জামান জুয়েল।

তবে এবারই প্রথম নয়। এর আগেও নম্বরপ্লেটে এমন ‘উদ্ভট’ লেখা দেখা গেছে বহুবার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয় নম্বরপ্লেটে ব্যবহার করার ছবি ভাইরাল হয়েছে একাধিকবার। সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

তবে এ ধরণের প্রবণতাকে সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখছেন দেশের সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনাস্থা এবং অপরাধ করে পার পেতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকেই মানুষের মধ্যে ঢুকেছে এমন প্রবণতা।

তারা বলছেন, দেশের ট্রাফিক পুলিশ কোনো যানবাহনকে জরিমানার আওতায় আনলে যেহেতু একটা কমিশন পান এবং এজন্য অনেক সময় অনেক নিরপরাধ মানুষকেও বেকায়দায় পড়তে হয় তাই সাধারণ মানুষের মাঝেও এমন প্রবণতা কাজ করে, তারা যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দেন তবে হয়তো তারা নিরাপদে চলতে পারবেন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, বাংলাদেশে এ ধরণের প্রবণতা নতুন না। সমস্যা হচ্ছে আমরা পাওয়ারকে এক্সারসাইজ করতে চাই বাড়তি সুবিধা নেয়ার জন্য। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা যেহেতু কোনো যানবাহনকে জরিমানার আওতায় আনলে একটা পরিমাণ কমিশন পান এবং এভাবে টাকা আয়ের একটা প্রবণতা তাদের মধ্যে রয়েছে; তাই অনেক নিরপরাধ মানুষও সাজা পান। এজন্য এ ধরণের সমস্যা থেকে বাঁচতে মানুষ অনেক সময় এমন কাজ করে।

উদাহরণ টেনে ড. শাহ এহসান বলেন, আমরা অনেক সময়ই দেখি ছোট্ট একটা কাগজের মধ্যে যদি লেখা থাকে ‘পুলিশ’ তবে তাকে মানুষ একটা ছাড়া দেয়ার চেষ্টা করে, এটা পুলিশ। এর কারণ হলো আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্র্যাকটিসটা ঠিকভাবে করে না। না করার কারণে এক ধরণের থ্রেট, এক ধরণের ভয় কাজ করে, এখানে কোনো সম্মান কাজ করে না। আমরা সাধারণত পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখি না, আর এই জায়গা থেকেই এমন ঘটনা ঘটছে।

অন্যদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মানুষ এক সময় অপরাধ-অন্যায় গোপনে করে এবং সাহস বেড়ে গেলে প্রকাশ্যে করে। বাস্তবে এমন ঘটনা এর আগেও ঘটার কারণেই এই যুবক নির্লজ্জের মতো এ কাজ করেছে। সমাজে অন্যায় করে ক্ষমতা প্রদর্শন করলে আর সমস্যা নেই এমন মানসিকতা আমরা নিজেদের মধ্যে তৈরি করে ফেলেছি। এটা একটা অশনি সংকেত।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে দেখছেন আইনের প্রতি ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন’ হিসেবে। এগুলো ভালো সংকেত নয় বলেও মত তাদের।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা এ বিষয়ে বলেন, ওই যুবক দিব্যি জানাতে চাচ্ছে আমাকে যাতে কেউ না ধরে। অন্যায় করলেও তাকে যেন শাস্তির আওতায় আনা না হয় সেজন্য সে এটা বলতে পারে। এটা একটা দায়িত্বহীন লোকের কাজ। এ ধরণের ঘটনার জন্য অনেক ফ্যাক্টর যুক্ত রয়েছে। এই লক্ষণটা ভালো নয়। এমন কাজ যারা করে তাদের একটা শাস্তি হওয়া উচিত।

অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ বলেন, আমার মতে এটা পাকামো। কারণ ওই ব্যক্তি পুলিশের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য এটি লাগিয়েছে। আমার মনে হয়, যানবাহনের জরিমানার ক্ষেত্রে পুলিশের কমিশনটা থাকা উচিত নয়, এটা সাধারণের দুর্ভোগ বাড়ায়। কারণ এমনটা হলে কেউ চাইবেন দায়িত্বপালনরত অবস্থায় বেশি জরিমানা করতে, এতে করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। আমরা চাই মানুষের দুর্ভোগ কমুক এবং শৃঙ্খলা বজায় থাকুক। এটার জন্য ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। এই ভারসাম্য তৈরি করতে গিয়ে এক পক্ষকে ভারী করে অপর পক্ষকে হালকা করলে ভারসাম্য তৈরি হবে না।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন ড. শাহ এহসান হাবীব।



মন্তব্য চালু নেই