মেইন ম্যেনু

প্রবৃদ্ধির মান নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অর্থনীতিবদরা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। তবে অর্থবছর শেষে চূড়ান্ত হিসাবে এই হার কমে আসতে পারে এমন আশঙ্কা করে ব্যক্তি খাতে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় প্রবৃদ্ধির মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবদরা। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রত্যাশা ছাড়ানো প্রবৃদ্ধির তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হয়ে তারা বলছেন, ব্যক্তিপর্যায়ে বিনিয়োগ, রফতানি আয়, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও কর আদায়ের মতো অর্থনীতির মৌলিক সূচকের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

মঙ্গলবার (৩ এপ্রিল) চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব প্রকাশ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এতে বলা হয়েছে, এবার জিডিপিতে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে, গত অর্থবছর যা ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ হিসাবে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে দশমিক ৩৭। শিল্প খাতে ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে। উৎপাদন উপখাতে ১৩ দশমিক ১৮, কৃষি ও সেবা খাতে যথাক্রমে ৩ দশমিক ০৬ ও ৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এবার কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। রফতানি বাড়লেও মন্দাভাব কাটেনি। তারল্য সঙ্কটে বিনিয়োগেও গতি আসছে না। এ অবস্থায় শিল্প খাতে প্রায় ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে অন্তত ২৮ শতাংশ বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি খাতের প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক বড় করে দেখানো হচ্ছে। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারবে না বলেও তিনি মনে করেন।

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, কৃষি ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন নেই। তবে শিল্পের উৎপাদন উপখাতের প্রবৃদ্ধি বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। রফতানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা আমদানিও বাড়েনি। তাছাড়া মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির সঙ্গেও প্রবৃদ্ধির তথ্য মিলছে না।

অর্থবছর শেষে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবের কতটুকু ঠিক থাকে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরি। তিনি বলেন, জিডিপিতে ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অনেক ভালো অর্জন। প্রতিবছর প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রবণতা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে গুণগত পার্থক্য রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা অনেক বেশি। এতে কর্মসংস্থানও বাড়ে। ফলে মাথাপিছু আয়ও বেশি হারে বাড়ে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকারি খাতে বিনিয়োগ করা হয়। এর আবার উৎপাদনশীলতা কম। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা ফেলো ড. তওফিকুল ইসলাম বলেন, মূলত রফতানি ও অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন উপখাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সরকারি বিনিয়োগের কারণেও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির মূল নিয়ামক কর আদায় ও ব্যক্তি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি বলে তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বিনিয়োগ কোন খাত থেকে এসেছে সেটি বড় কথা নয়। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে সেটি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক হবে। বর্তমানে সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়লেও বেসরকারি ক্ষেত্রে কম হচ্ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।



মন্তব্য চালু নেই