প্রধান ম্যেনু

বইয়ের ভারে ন্যুব্জ শিশুরা || আবদুল হাই ইদ্রিছী

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। আজকের শিশুরাই হবে আগামী প্রজন্মের মহানায়ক। আমাদের শিশুরা অনেক বড় হবে। উত্তর প্রজন্মের জন্য এ স্বপ্ন কমবেশি সবাই দেখে। শিশুদের গড়ে তোলার জন্য সর্বক্ষেত্রে সাবধানতা অতীব জরুরি। শিশুদের নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে ওঠা এবং তাদের মনন ও মেধার বিকাশের জন্য প্রয়োজন অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। এ দায়িত্ব পিতা, মাতা, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সমাজের প্রতিটি দায়িত্বশীল সচেতন নাগরিকের। কিন্তু আমরা আমাদের এ দায়িত্ব কতটুকু পালন করছি?

সেদিন অসুস্থ নানীকে দেখতে গিয়েছিলাম নানার বাসায়। রাত ৯টায় যখন নানীকে দেখে বের হবার জন্য উঠে দাঁড়ালাম তখন গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে পড়া শেষ করে এসে রুমে প্রবেশ করলো মামাতো ভাই ফারহান। তাকিয়ে দেখি স্ট্যান্ডার ওয়ানের ছাত্র ফারহানের কাঁধে ঝুলানো স্কুল ব্যাগের ভারে সে যেন কাত হয়ে গেছে। কাছে ডেকে এনে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটি খুলে আমার হাতে নিয়ে অবাক হলাম। মনে হলো পাঁচ বছরের শিশু ফারহানের ওজন থেকে যেন তার কাঁধের বই-খাতা ভর্তি স্কুল ব্যাগটির ওজন বেশী। মনের ভেতর চিন্তার উদয় হলো, ব্যাগ ভর্তি বই-খাতার ওজনের চাপে যদি এই শিশুটির দেহ কাত হয়ে যায়, তাহলে পড়ালেখার চাপে তার মস্তিস্কের অবস্থা কেমন হচ্ছে?

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। শিশু অবস্থাতেই তাদের পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ না দিতে অভিভাবক, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি এটুকুই বলব, কোনোমতেই যেন কোমলমতি শিশুদের কোনো অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া হয়। তাহলেই দেখবেন তারা ভেতরে একটা আলাদা শক্তি পাবে। আর তাদের শিক্ষার ভিতটা শক্তভাবে তৈরি হবে।’ সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ১৩ মার্চ ২০১৯)

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শিশুদের লেখাপড়া নিয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছেন বর্তমানে চলছে তার ঠিক উল্টো। শিশুরা আজ পড়া-লেখার চাপে পিষ্ট। পড়ালেখা নিয়ে তারা তীব্রভাবে ভীত, আতঙ্কিত। তারা শিকার হচ্ছে তীব্র মানসিক চাপ আর শারীরিক নির্যাতনের। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে গেছে। অতিরিক্ত পড়ার চাপে শিশুদের মেধা ও মননের বিকাশ বর্তমানে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিজস্বতা বলতে আজ আর কিছু নেই।

শিশুদের পড়ালেখার চাপের জন্য অনেকটাই দায়ী অতিরিক্ত বই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাঠ্যবই নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে ৩টি। এছাড়া তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই নির্ধারিত আছে ৬টি করে। কিন্তু সরকারি স্কুলগুলো এ কারিকুলাম অনুসরণ করলেও বেসরকারি স্কুলগুলোতে পড়ানো হচ্ছে কারিকুলামের বাইরে ৭ থেকে ৮টি করে অতিরিক্ত বই। যা শিশুদের পড়াশোনায় চাপ সৃষ্টি করছে। খুব কম শিশুই নিজের ব্যাগ নিজে বহন করে স্কুলে নিয়ে যায়। বইয়ের চাপে ব্যাগ এতটাই ভারী থাকে যে, শিশুর পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে শিশুদের উপর পড়াশোনার চাপ বাড়লে তা শিশুর মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক উভয় বিকাশকেই বাধাগ্রস্ত করে। অতিরিক্ত চাপের ফলাফল আসলে ভয়াবহ। শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়ার মতো ঘটনা ঘটাও বিচিত্র কিছু নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহজাবীন হক বলেন- ‘অনেক সময় দেখা যায় কিছু শিশু একটি নির্দিষ্ট ক্লাসের পর আর পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করতে পারে না। ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, মনোযোগের প্রচণ্ড অভাব সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাগুলো হচ্ছে পড়াশোনায় অতিরিক্ত চাপের চূড়ান্ত ফলাফল। এ ক্ষেত্রে শিশুটি ধীরে ধীরে পড়াশোনায় ভয় পেতে শুরু করে। কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবকই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। লেখাপড়া না করলে তাঁরা বকাঝকা এমনকি মারধরও করেন, যা শিশুর মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি করে। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েরাই মাঝপথে পড়া ছেড়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে শুরু থেকেই যদি পিতামাতা সচেতন হন, তাহলে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয় না।” সূত্র: প্রথম আলো, ০৫ মার্চ ২০১৪)

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. ফারাহ দীবা বলেন- ”আমরা কখনো চিন্তা করি না যে, একটা বাচ্চাকে যদি আমরা এমন কিছু দেই, যা তার বয়সের উপযোগী না, তাহলে এর ফলাফলটা কী হতে পারে। মানুষের মানসিক বিকাশের নানা রকম ক্ষেত্র আছে। আমরা যদি শিশুদের সব ক্ষেত্রে বিকাশের দিকে নজর না দিয়ে শুধু জ্ঞানবিকাশের দিকে ফোকাস ধরে রাখি, তাহলে পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ হলো না।” (সূত্র: বিবিসি বাংলা)

বাংলাদেশে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা বা শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ই আলোচনা হয়। শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক নাজমুল হক বলছেন- “শিশুদের পাঠদানের পুরো পদ্ধতিই নতুন করে ঢেলে শিশু উপযোগী করা উচিত।” তিনি বলেন আরো বলেন- “শিশু শিক্ষার যে ব্যবস্থাটা আমাদের দেশে রয়েছে, তা যথার্থ নয়। এটার মধ্যে আরো পরিবর্তন আনা দরকার, উন্নতি সাধন করা দরকার। যাতে করে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে পড়তে পারে। এছাড়া পরীক্ষার চাপ থেকে শিশুদের মুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের পরীক্ষা থেকে মুক্ত করা যায়।” (সূত্র: বিবিসি বাংলা)

কিন্তু আজ স্কুলের পড়া আর অভিভাবকদের চাহিদার চাপে পড়ে শিশুদের সোনালি শৈশবটিই হারিয়ে যাবার উপক্রম হচ্ছে। এটা নিয়ে কোন পর্যায়েই দৃশ্যমান কোন উদ্যোগও নেই। মনে রাখতে হবে সঠিক দিকনির্দেশনা যেমন শিশুকে আগামী দিনের একজন সফল মানুষ হিসেবে তৈরি করতে পারে, তেমনি ভুল নির্দেশনাও একটি শিশুকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে পারে। তাই সন্তানের যত্ন নিন, পড়াশোনার জন্য কেবল চাপ না দিয়ে তাকে পড়তে উৎসাহিত করুন। শিক্ষার আলোকোজ্জ্বল পৃথিবী আপনার শিশুকে স্পর্শ করুক। ভালো থাকুক, ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠুক প্রতিটি শিশু।

-আবদুল হাই ইদ্রিছী : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কবি। সম্পাদক: মাসিক শব্দচর। ই-মেইল: [email protected]


 



মন্তব্য চালু নেই