প্রধান ম্যেনু

বাংলাদেশের যে প্রকল্পটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প

বিশ্বে এখন বন্দরকেন্দ্রিক যত প্রকল্প আছে, তার মধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। মূলত দীর্ঘ ৬৫ কিলোমিটার নৌপথে বড় আকারে খননকাজ করে এই সমুদ্রবন্দরে জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি করতে হবে। আবার বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার নতুন সড়ক ও রেলপথও নির্মাণ করতে হবে। ফলে খরচ ছাড়িয়ে গেছে বিশ্বের সব বন্দর প্রকল্পকে। ব্যয়বহুল প্রকল্প হওয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে এটির বাস্তবায়নকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন এ খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। খবর প্রথম আলো’র।

পায়রা বন্দরের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে মূল বন্দর নির্মাণে ৮০৭ কোটি এবং বন্দর সহযোগী অবকাঠামো নির্মাণে ৯০৫ কোটি ডলার খরচ নির্ধারণ করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৮৩৪ কোটি ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ৮৪ টাকা) খরচ ধরা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। যদিও এখন পায়রা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রথম পর্যায়ে ভূমি অধিগ্রহণ ও মধ্য মেয়াদে তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ বাবদ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে পায়রা বন্দরে অন্যান্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।

পায়রা ছাড়া দেশে এখন দুটি বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারিত প্রকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল (চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে বড়) নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার (২১ হাজার কোটি টাকা)। আর কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণে খরচ ধরা হয়েছে ৭৯০ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য সড়ক ও সেতু নির্মাণে খরচ হতে পারে এক বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে মাতারবাড়ীতে এক দশমিক আট বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে।

অর্থাৎ দেশে বর্তমানে যে তিনটি বন্দরের প্রকল্প আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হলো পায়রা। ব্যয়বহুল হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, রাবনাবাদ চ্যানেলে বড় আকারের খননকাজ করে জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি করতে হবে। পায়রা বন্দর নিয়ে ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়েলিংফোর্ডের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ মিটার গভীরতার জন্য রাবনাবাদ চ্যানেলে ৪০ কোটি ঘনমিটার বালিমাটি অপসারণ করতে হবে, যাতে খরচ হতে পারে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ মাতারবাড়ী ও বে টার্মিনালে দুটি বন্দর নির্মাণে খরচ হবে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ পায়রা বন্দরের খননকাজের টাকায় মাতারবাড়ী ও বে টার্মিনাল নির্মাণ সম্ভব।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, এত বিশাল বাজেটে বন্দর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পায়রা বন্দরকে গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে গড়ে না তুলে প্রথমেই চট্টগ্রামের মতো কাছাকাছি সুবিধার বন্দর হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। কারণ, পায়রা বন্দর ব্যবহার করবেন আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা। দেশের বড় অংশের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পায়রা দিয়ে পরিবহন করা হবে না।

বাংলাদেশে প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প হলো কক্সবাজারের সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর। ফাইলবন্দী থাকা এই প্রকল্পে তিনটি পর্যায়ে ১১ বিলিয়ন ডলার (৯৩ হাজার কোটি টাকা) খরচ হবে বলে জাপানের সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল। সোনাদিয়া এখনো সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্পের তালিকায় থাকলেও তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। মাতারবাড়ীতে বন্দর হলে কাছাকাছি অবস্থিত সোনাদিয়ায় আরেকটি বন্দর নির্মাণের গুরুত্বও থাকে না।

সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হিসেবে পায়রা বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, জানতে চাইলে বন্দরটির চেয়ারম্যান কমোডর এম জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সমীক্ষা প্রতিবেদন ধরে শুরুতে পায়রা বন্দর নির্মাণে এই বিশাল খরচের হিসাব করা হয়েছিল। এটি মূলত বায়বীয় হিসাব। এখন পর্যন্ত স্বল্প মেয়াদে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ও মধ্য মেয়াদে ২২ হাজার কোটি টাকার খরচ চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সরকার থেকে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকার খরচ ধরা হয়েছে। এই খরচের মধ্যে ১ বিলিয়ন ইউরো বা ১০ হাজার কোটি টাকায় সাড়ে ১০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খননকাজের প্রকল্প রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নের পরই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু দেশেই নয়, বিশ্বেও পায়রা বন্দরের মতো এত ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের নজির নেই। বিশ্বে এখন সবচেয়ে বড় ও অত্যাধুনিক বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিঙ্গাপুর। মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি অব সিঙ্গাপুরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের এপ্রিলে তোয়াস মেগা পোর্ট নামের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী চার পর্যায়ে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা এই প্রকল্পে খরচ হবে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার। মিয়ানমারের রাখাইনে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে যে চুক্তি করেছে, তাতে খরচ ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।



মন্তব্য চালু নেই