মেইন ম্যেনু

‘বুয়েট চাইলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে’

ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধে মত নেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি বলেছেন, ‘একটা ঘটনার (আবরার হত্যাকাণ্ড) কারণে পুরো ছাত্র রাজনীতিকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। এটা তো রাজনীতি নয়।’

জাতিসংঘ ও ভারত সফর থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বুধবার বিকেলে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আলোচিত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়’র (বুয়েট) আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে, তা নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বুয়েট তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘যেকোনও আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্ররাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে।’ ছাত্র রাজনীতি পুরো নিষিদ্ধের কথা তো মিলিটারি ডিক্টেটরের কথা বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারাই এসে এটা নিষিদ্ধ করে। এসময় তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ‘ছাত্রলীগ সব সময় একটি স্বাধীন স্বতন্ত্র সংগঠন ছিল। তবে নীতি-আদর্শের প্রশ্নে মূল দল তো কিছু দিক নির্দেশনা দেবেই। জিয়াউর রহমান আসার পর নষ্ট রাজনীতি শুরু হয়েছে, যেটা করছিলেন আইয়ুব খান। ছাত্র সংগঠনগুলোকে মূল দলের অঙ্গসংগঠন করা হয়।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘নেতৃত্ব উঠে এসেছে ছাত্র নেতৃত্ব থেকে। রাজনীতি শিক্ষার ব্যাপার, ট্রেনিংয়ের ব্যাপার। আমি নিজেই ছাত্র রাজনীতি করে এসেছি। দেশের ভালো-মন্দের চিন্তা তখন থেকেই আমার তৈরি হয়েছে।’

এসময় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের বিপুল খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি হল সার্চ করা দরকার।‘

আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে অপরাধ করবে সে কোন দল করে সেটা দেখি না। অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। আমি ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি যে তারা যেন ঐ সময়ই আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো পুলিশ যখন সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করতে গেল তখন তাদের বাঁধা দেওয়া হলো।

পুলিশ প্রধান সে সময় আমাকে জানালো যে, সিসিটিভি ফুটেজ নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। পরে ফুটেজটা দিয়েছে অবশ্য তাতে প্রায় তিন ঘণ্টা বিলম্ব হয়ছে। আমি নির্দেশ দিয়েছি যাদের সন্দেহ হবে তাদেরকেই গ্রেফতার করতে হবে। অন্যায়ভাবে একটা ছেলেকে হত্যা করা হবে আর আমরা বসে বসে দেখব তা হবে না। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

ক্যাম্পাসে হত্যার ঘটনায় শিক্ষা কর্যক্রম ব্যাহত হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা ঘটলে তাতে শিক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়।’
বিচারের জন্য কারও দাবির জন্য অপেক্ষা করা হয় না উল্লেখ করে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিচারের জন্য কে দাবি করল বা না করল তা দেখা হয় না। অপরাধী অপরাধ করলে তার শাস্তি হবে। এর জন্য আলাদাভাবে বিচার চাইতে হবে না।’

ছাত্রলীগের অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হয়নি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্রলীগের মধ্যে কেউ অপরাধ করলে তাকে কোনো সময়ই ছাড় দেওয়া হয়নি। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যায় যারা অংশ নিয়েছে বলে সংগঠন প্রমাণ পেয়েছে তাদেরই বহিষ্কার করেছে। আইন অনুযায়ী এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একটা ছেলে কতটুকুই বা বয়স তাকে হত্যা করা হলো। সন্তান হারা মা ও বাবা সন্তান হারানোর কষ্ট বোঝেন? আমি এ কষ্ট বুঝি।’

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কোন স্বার্থ শেখ হাসিনা বিক্রি করবে এটা হতে পারে না।’

আজীবন মানুষের কল্যাণেই নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান, কেউ তাকে মনে রাখবে কি রাখবে না তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে কারণে নিজের জীবনী লেখারও কোনো ইচ্ছা বা চিন্তা-ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন। এসব লেখার অনেকগুলোতেই বিচ্ছিন্নভাবে তার জীবন সম্পর্কে অনেক কথাই উঠে এসেছে। এ বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি আগামীতে তার পূর্ণাঙ্গ একটি আত্মজীবনী লিখবেন কি না?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি রাজনীতিতে এসেছি আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখে। তার লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের উন্নয়ন, দেশের মানুষকে একটা উন্নত জীবন দেওয়া। কিন্তু আমি তো আমার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। এরকম সর্বহারা অনেকেরই রাজনীতিতে আসার মানসিকতা থাকে না।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক দেশের অনেক রাষ্ট্র প্রধান, সরকার প্রধানকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাদের ছেলে-মেয়েদের অনেকেই রাজনীতি আসে না। কিন্তু অনেকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তারা বলেছেন, তারা আমাকে দেখে রাজনীতিতে এসেছেন। আমি তো রাজনীতিতে এসেছি বঙ্গবন্ধুর জন্য। মানুষকে নিয়ে তার যে চিন্তা ছিল, মানুষকে তিনি দারিদ্র্যমুক্ত করবেন, শুধু ওই একটা চিন্তা থেকেই কাজ করে যাচ্ছি। আমার কথা কেউ মনে রাখুক, এই চিন্তা নেই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তার জীবন দেশের জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে গেছেন। তার নামটাই সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হলো দেশের ইতিহাস থেকে। এমন অপবাদ দেওয়া হলো, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওইসব অপবাদ ছড়ানো হয়েছে। আমার কাজ ওইসব অপবাদের জবাব দেওয়া। আর বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা আমার কাজ।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমাকে কেউ বলে যায়নি যে এসব আমাকে করতে হবে। আমি মনের তাগিদ থেকে করি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হবে- শুধু এই একটিই চিন্তা। আমার মা-বাবা আমার কাছে কিছু চাননি। আমার মা, আজীবন তিনি বাবার পাশে থেকে সাধাসিধে জীবনযাপন করে গেছেন। আমার দাদা-দাদীকে দেখেছি, তারাও খুব সাধারণ ছিলেন। ছেলে বড় হয়ে পয়সা কামাবে, তাদের পয়সা দেবে, এই কথা কখনও তারা বলেননি। উল্টো ছেলের কখন কী লাগবে, তারা সব সময় সেইটা দেখতেন। আমি এই রকম একটি পরিবারে বড় হয়েছি। তাই আমার নিজের জীবন নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছাও নেই, লেখার কোনো চিন্তাও নেই ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমদানিকৃত গ্যাস ভারতকে দিলে এতে বাংলাদেশেরই লাভ হবে। বিভিন্ন দেশ এমনভাবে গ্যাস আমদানি করে প্রক্রিয়াজাত করে আবার রপ্তানি করে আসছে। আমাদের গ্যাস নেই। আমরা বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে ভারতে রফতানি করব। প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, ভারতে রপ্তানি হবে আমদানি করা গ্যাস। আর আমদানিকৃত এসব এলপিজি দেয়া হবে ভারতের ত্রিপুরায়।’
এর আগে, বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের ভারত অর্থনৈতিক সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে গত ৩ থেকে ৬ অক্টোবর এই ৪ দিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। এ সময় দুই দেশের মধ্যে সাতটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত এবং তিনটি যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে অবস্থানের সময় আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘ঠাকুর শান্তি পুরস্কার ২০১৮’ গ্রহণ করেন। তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি।

এর আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ)-এর ৭৪ তম অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশে তিনি ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।

যুক্তরাষ্ট্র সফরে এবার দুটি সম্মাননা পেয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) তাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’সম্মাননায় ভূষিত করেছে। আর তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ শিশু তহবিল- ইউনিসেফ তাকে ভূষিত করেছে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ’ সম্মাননায়।



মন্তব্য চালু নেই