শিরোনাম:

বৃহত্তর চলনবিলের শামুক-ঝিনুক চিংড়ি ঘেরের খাবার !! পরিবেশের ভারসাম্য হুমকির ‍মুখে

বৃহত্তর চলনবিলের জলাভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া শামুক ও ঝিনুক জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত, মধ্য নিম্নবিত্ত হাজার হাজার মানুষের পরিবার। এ অঞ্চলের কর্মহীন মানুষ আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

এসব শামুক-ঝিনুক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন মাছের ঘেরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সেখানকার চাষ করা চিংড়ির খাবার হিসেবে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বিচারের শামুক-ঝিনুক নিধনের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কমে যাচ্ছে এই অঞ্চলের মাটির উর্বরা শক্তি। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশিয়াম তৈরি করে। এতে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে।

চলনবিলের ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িসহ বিস্তীর্র্ণ জলাভূমি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০টনের বেশি শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক বেচাকেনার জন্য পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও নাটোরের সিংড়া উপজেলায় ৫০টির বেশি আড়ত গড়ে উঠেছে।

সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে আড়তদাররা প্রতি বস্তা শামুক-ঝিনুক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। ব্যবসায়ীরা এসব শামুক-ঝিনুক কিনে ট্রাকে করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের মালিকদের কাছে প্রতি বস্তা ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।

তাড়াশ উপজেলার ডাহিয়া গ্রামের কামাল মিয়া শামুক-ঝিনুক বিক্রির টাকা দিয়েই সংসার চালান। তিনি নিজে ও ছেলে-মেয়েরা মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই বস্তা শামুক ধরেন। আয় হয় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। বর্ষার কর্মহীন মৌসুমে এই টাকা দিয়েই চলে বড় এ পরিবার। কলমগ্রামের দরিদ্র গৃহিনী আছমা বেগম তার বৃদ্ধ স্বামী উপার্জনে অক্ষম। প্রতিদিন ঝুড়ি নিয়ে ধান ক্ষেত থেকে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এক বস্তার মতো শামুক সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। আড়তদারদের কাছে বিক্রি করে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পান। তাই দিয়ে তার বেশ ভালোভাবে সংসার চলে।

ফসলের ক্ষেতে ধান, ধনচে জাতীয় যেকোনো ফসল বা কচুরিপানার গায়ের ওপর ভর করে পানিতে ভেসে থাকে শামুক। জালের তৈরি ফাঁস দিয়ে পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকা শামুক ধরা হয়। ছোট ডিঙি নৌকা চালিয়ে এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে গিয়ে সংগ্রহ করে শামুক নৌকার মধ্যে রাখা হয়। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে শামুক আহরণ শুরু হয়ে চলে অগ্রাহায়ণ মাস পর্যন্ত। তবে আষাঢ, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রাহায়ণ মাস হচ্ছে শামুক ঝিনুক ধরার ভরা মৌসুম। মাছ কমে যাওয়ায় কিছু জেলে পরিবার এ পেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, চলনবিল অঞ্চলের জলাভূমির শামুক-ঝিনুক অনেক কিছুরই খাবার। ব্যাপকহারে শামুক নিধন জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খলাও নষ্ট করে। যে শামুকগুলো বর্ষার শেষে মাটিতে বসে তা সেখানেই পচে সার হয়। জমিতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের জোগান দেয়। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে যেসব শামুক ধরা হয়, তা মুলত অ্যাপেল স্নেইল (আপেল শামুক) গোত্রের।

এই শামুক ধরে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাছের ঘেরের যে চিংড়িকে খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো আমাদের দেশের মানুষ পাচ্ছে না। প্রতিদিন চলনবিল থেকে প্রায় ১০০ টন শামুক ধরা হচ্ছে। নির্বিচারে শামুক নিধনের ফলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. সাইফুল আলম বলেন, যেকোনো মৃতজীবের অবশিষ্ট অংশ পচে-গলে জৈব সার হয়। তেমনি এ অঞ্চলের শামুক শুকনো মৌসুমে মাটির সাথে মিশে যায়, যা মাটির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। আবার ফসলের জমিতে অতিরিক্ত শামুক হলেও তা ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আমাদের এই শামুক প্রাকৃতিক সম্পদ।

আমার জানা মতে, এ অঞ্চল থেকে নিয়ে যাওয়া শামুকের ভেতরের অংশ মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। খোলস ব্যবহার হয় চুন ও সার তৈরিতে। তবে নির্বিচারে শামুক নিধন এই অঞ্চলের জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধি ও খাদ্যশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর। এটি নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি জানান।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি ও মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শামুক-ঝিনুক প্রাকৃতির ফিল্টার। বিলের তলদেশে বিচরণ করে। এরা পানির পোকা মাড়ক ও জলজ উদ্ভিদ খেয়ে নোংরা পানি পরিষ্কার করে থাকে। বিলের পানি শুকিয়ে গেলে এসব শামুক-ঝিনুক পচে গিয়ে জমির উবর্রতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যথেচ্ছ ভাবে কৃষকের বন্ধু শামুক ও জলজ উদ্ভিদ নিধন হলে মাটির ক্যালসিয়াম কমে গিয়ে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা আছে।