ভারতে করোনায় যেসব প্রথিতযশা ব্যক্তির মৃত্যু

করোনা মহামারিতে দেশে দেশে বেড়েই চলেছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিনিয়ত করোনাভাইরাসের ধরন পরিবর্তন হয়ে একেক দেশ পরিণত হচ্ছে মৃত্যুপুরীতে। সম্প্রতি ভারতে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পথে-প্রান্তরে কান পাতলেই আর্তচিৎকার, বাঁচার আকুতি ও স্বজন হারানোর কান্না শুনতে পাওয়া যায়।

করোনায় মৃতদের মধ্যে দিনমজুর, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন বহু নামিদামি প্রথিতযশা ব্যক্তিও। জীবদ্দশায় যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলো ছড়িয়েছেন। রাজনীতির মাঠে প্রবল পরাক্রমশালী, জনপ্রিয় ও ডাকসাইটে নেতা হলেও করোনার কাছে তারা হার মেনেছেন। শুধু রাজনীতিবিদরা নন, করোনার কাছে হার মেনেছেন খেলোয়াড়, অভিনেতা, কবি, সাহিত্যিক, লেখক। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কবি, সাহিত্যিক ও আমলারা।

দেড় বছরে করোনাভাইরাসে প্রাণ হারানো এমন কয়েকজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড়, অভিনেতা, কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও বিজ্ঞানী সম্পর্কে তুলে ধরা হলো :

প্রণব মুখার্জি : ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট দিল্লির সেনাবাহিনীর আরঅ্যান্ডআর হাসপাতালে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি মারা যান। করোনা আক্রান্ত ছিলেন কংগ্রেসের প্রবীণতম সদস্য প্রণব। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের এক সপ্তাহ পর তিনি মারা যান।

আহমেদ প্যাটেল : গত বছর করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর আহমেদ প্যাটেল গুরুগ্রামে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কংগ্রেসের পরীক্ষিত নেতা প্যাটেল ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর মারা যান।

তরুণ গগোই : আসামে সবচেয়ে বেশি সময় মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপালনকারী ৮৪ বছর বয়সী তরুণ গগোই করোনা পজিটিভ ছিলেন। সংক্রমণ থেকে তিনি সেরেও উঠেছিলেন। কিন্তু করোনা-পরবর্তী জটিলতায় তিনি ২০২০ সালের ২৩ নভেম্বর মারা যান।

পি নামগিয়াল : কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি নামগিয়াল ছিলেন লাদাখ অঞ্চলের প্রথম করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি। গত বছর জুনে তিনি ৮৩ বছর বয়সে মারা যান।

কমল রানি বরুণ : উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের কারিগরি শিক্ষামন্ত্রী কমল রানি বরণ। গত বছরের আগস্টে মারা যান। ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন ও হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছিলেন ৬২ বছর বয়সী সংসদ সদস্য কমল।

সুরেশ আঙ্গাড়ি : প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে সুরেশ আঙ্গাড়িই গত বছরের সেপ্টেম্বরে মারা যান। রেলপথ প্রতিমন্ত্রী ও কর্নাটকের বিজেপি সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি।

সমরেশ দাস : পূর্ব মেদিনীপুরের ইগ্রার তৃণমূল বিধায়ক সমরেশ দাস করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনবারের বিধায়ক সুরেশ ৭৬ বছর বয়সে মারা যান।

নয়িনী নরসিমহা রেড্ডি : তেলেঙ্গানার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিআরএসের সিনিয়র নেতা নয়িনী নরসিমহা রেড্ডি ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর মারা যান।
শেখর বসু : পরমাণু বিজ্ঞানী শেখর বসু গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর মারা যান। পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত বসু ১৯৫২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিহারের মজফ্ফরপুরে জন্মগ্রহণ করেন।

হরিশঙ্কর বাসুদেবন : ইতিহাসবিদ অধ্যাপক হরিশঙ্কর বাসুদেবন ২০২০ সালের ১০ মে কলকাতায় মারা যান। ১৯৫২ সালে কেরালায় জন্মগ্রহণকারী হরিশঙ্কর করোনা সংক্রমণের আগে কিডনি সমস্যায় ভুগছিলেন।

শঙ্খ ঘোষ : ২১ এপ্রিল কলকাতায় কবি শঙ্খ ঘোষ ৮৯ বছর বয়সে মারা যান। বাংলাদেশের চাঁদপুরে ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণকারী শঙ্খ ঘোষ ২০১১ সালে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন।

প্রদীপ ঘোষ : আমলা ও খ্যাতনামা বাচিকশিল্পী প্রদীপ ঘোষ গত বছর ১৬ অক্টোবর কলকাতার যোধপুর পার্কে মারা যান। ১৯৪২ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী প্রদীপ ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘কাজী সব্যসাচী’ পুরস্কার লাভ করেন।

রাহাত ইন্দোরি : উর্দু কবি রাহাত ৭০ বছর বয়সে ২০২০ সালের ১১ আগস্ট ইন্দোরের অরবিন্দ হাসপাতালে মারা যান। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি ইন্দোরে জন্মগ্রহণকারী রাহাত বিখ্যাত গীতিকারও ছিলেন।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় : কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ৮২ বছর বয়সে গত বছর ৪ আগস্ট মারা যান। পাবলো নেরুদা, লাতিন আমেরিকার উপন্যাসসমূহ, একাধিক স্প্যানিশ গল্পসহ ইত্যাদি গল্প-উপন্যাস অনুবাদের জন্য তিনি সাহিত্য একাডেমি ‘অনুবাদ পুরস্কার’ পান। ১৯৩৮ সালে সিলেটে জন্মগ্রহণকারী মানবেন্দ্র শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ‘খগেন্দ্র মিত্র স্মৃতি পুরস্কার’ও ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’ পান।

শামসুর রহমান ফারুকী : উর্দু কবি শামসুর রহমান ফারুকী গত বছর ২৫ ডিসেম্বর এলাহাবাদে মারা যান। উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে ১৯৩৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণকারী ফারুকী উর্দু সাহিত্য ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। ২০০৯ সালে পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত ফারুকী ‘শের-ই-শোর আংরেজ’খ্যাত কবি ছিলেন।

সুগথা কুমারী : গত বছর ২৩ ডিসেম্বর কেরালায় মারা যান মালায়লাম কবি সুগথা কুমারী। ১৯৩৪ সালের ২২ জানুয়ারি কেরালায় জন্মগ্রহণকারী সুগথা ছিলেন পরিবেশ ও নারীবাদী আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধা। সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ২০০৬ সালে তিনি পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত হন।

মঙ্গলেশ দাবরাল : ২৩ ডিসেম্বর কবি মঙ্গলেশ দাবরাল মারা যান। ১৯৪৮ সালের ১৬ মে উত্তরখন্দের কাফালপানি গ্রামে জন্মগ্রহণকারী মঙ্গলেশ ২০০০ সালে সাহিত্য একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

যশবন্ত সিং কানওয়াল : ‘লাহু দি লো’ উপন্যাসের জন্য খ্যাত যশবন্ত সিং কানওয়াল ১০০ বছর বয়সে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মারা যান। ১৯১৯ সালের ২৭ জুন পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণকারী যশবন্ত ১৯৯৬ সালে সাহিত্য একাডেমির ফেলোশিপ পান।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় : সিনেমাপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ৮৫ বছর বয়সে গত বছর ১৫ নভেম্বর কলকাতার বেলেভিউ হাসপাতালে মারা যান। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নামজাদা কবি ও আবৃত্তিকার।

এসপি বালা সুভ্রামানিয়াম : বলিউড সংগীতের অন্যতম তারকা এসপি বালা সুভ্রামানিয়াম গত বছর ২৫ সেপ্টেম্বর মারা যান।

শ্রাবণ রাঠৌর : বলিউড সংগীতের নাদিম-শ্রাবণ জুটির অন্যতম শ্রাবণ রাঠোর এ বছর ২০ এপ্রিল মারা যান। অনেক জনপ্রিয় গানের সুর ও সংগীত পরিচালনাকারী শ্রাবণ নব্বইয়ের দশকে নাদিম আখতার সাইফির সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ শুরু করেন।

বিজয় শিরকে : গত বছর ২০ ডিসেম্বর মুম্বাইয়ের সাবেক পেসার বিজয় শিরকে মারা যান।

চেতন চৌহান : রাজনীতিবিদ হওয়ার আগে চেতন চৌহান ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের ওপেনার। ২০২০ সালের আগস্টে তিনি মারা যান।

শচীন দেশমুখ : গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ের আরেক ক্রিকেটার শচীন দেশমুখ মারা গেছেন। ৫২ বছর বয়সী শচীন ছিলেন রঞ্জি ট্রফির জনপ্রিয় খেলোয়াড়।

অনুপমা পঞ্চিমন্দা : এ বছর ১৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক হকি আম্পায়ার অনুপমা পঞ্চিমন্দা বেঙ্গালুরুতে মারা যান। ৪০ বছর বয়সী অনুপমা ছিলেন জাতীয় পর্যায়ে দুর্দান্ত হকি খেলোয়াড়। ২০০৫ সালে সান্টিয়াগোতে মহিলাদের বিডিও জুনিয়র বিশ্বকাপ, ২০১৩ সালে নয়াদিল্লিতে উইমেনস হিরো হকি ওয়ার্ল্ড লিগ রাউন্ড-২ এবং ২০১৩ সালে কুয়ালালামপুরে উইমেনস এশিয়া কাপে তিনি আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার (৩০ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত ভারতে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৩ হাজার ৫০১ জন এবং নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৮৮৮ মানুষ। এ নিয়ে আক্রান্তে দ্বিতীয় ও মৃত্যুতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে এখন পর্যন্ত মোট সংক্রমিত হয়েছেন এক কোটি ৮৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৮৪ জন এবং মারা গেছেন ২ লাখ ৮ হাজার ৩১৩ জন।



মন্তব্য চালু নেই