লাইভে আলমগীর পারভেজের গজল সন্ধ্যা

নাজমীন মর্তুজা ::

ঠুমরি, রাগ খাম্বাজ, তিলক কামোদ, মাতালা মিশরা, এইসব শব্দ আর সুর নিয়েই গতকাল (১৩ জুন) গভীর রাত খেকে সকাল পর্যন্ত, একটা সুর ও বাণীর মায়া ঘোরের ভেতরে কেটে গেল, একটুও ঘুম আসেনি, বরং আমি যেন একটা বহুদিন পর মন ভালো করার টনিক পেলাম বহু…. বহু দিন পর।

সেই ছোট বেলা থেকেই আমার খেয়াল ঠুমরি গজল শোনার মতো কান তৈরী হয়েছিল, যখন আমি হয়ত গানের বাণী বুঝতে শিখিনি কিন্তু সুরের মায়ায় কান্না চুপ হয়ে যেত আমার।
আমাকে ছেলে ভোলানো মোয়া দিয়ে যেমন বায়না মিটানো যেতো, তেমনি সুর সম্রাট মেহেদী হাসানের গজল শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো যেতো সহজেই। এটা আব্বার মুখে শোনা।
হয়ত এ কারণেই আমি হৃদয়ে সুর সম্রাটের জন্য এতোটা গভীর আবেগ অনুভব করি।

সেই ছোটবেলা থেকেই মেহেদী জ্বির কন্ঠেই কেবল গজল, নাজোম খেয়াল, ঠুমরি শুনে এসেছি এতো মধু আর কারও কাছে তেমন করে পাওয়া যায়নি। উনার কিছু কিছু গজল চলচ্চিত্রের পর্দায় শুনতে পেয়েছিলাম যেগুলো খুব হিট হয়েছিল, কিন্তু হতে পারে চলচ্চিত্রের জন্য গানের কথা পাল্টে দিয়ে কিছুটা সুরেরও এদিক সেদিক লক্ষ্য করা যেতো; তবুও গানগুলো কালজয়ী, কারণ গানের কথা ও সুর মানুষের কানে আগে থেকেই মেহেদী জ্বি বসিয়ে রেখেছিলেন যে!
একই কন্ঠে গজল শুনতে শুনতে সেই কন্ঠটাই যেন মরমে গেঁথে আছে, কিন্তু বহুদিনের সেই মনের দেয়ালে টানানো বড় পোষ্টার সাইজ ছবির পাশে বাধ্য হোলাম, আমাদের দেশের আলমগীর পারভেজ এর ছবিটাও রাখতে, এটা আমার শ্রোতা ও ডাই হার্ট ফেনের পাগলামী বললে ভুল হবে কিন্তু। যারা উনার গান শোনেননি প্লিজ শুনুন, শোনার সময়টুকু খরচা করলে আপনাকে বলতেই হবে, মেহেদী জ্বি বেঁচে থাকলে আজ খুব খুশি হোতেন জেনে, আলমগীর পারভেজ তার যোগ্য ভক্ত শ্রোতা এবং শিষ্য বটে।

ফেসবুকে রোজই বিজ্ঞাপণ থাকে আজকে কবিতা লাইভ কালকে কথোপকথন,পরশু গল্পবলা, টরশুদিন মেকাপ শেখা, কিংবা মিশেল গানের আয়োজন, সত্যি বলছি এমন করে নিবিষ্ট মন নিয়ে রসমন্জরীর পাতায় চোখ বসিয়ে রেখেছিলাম দিন ঘন্টা হিসেব করে, কবে শুনবো আলমগীর পারভেজের কন্ঠে গজল।

সে বহুদিন আগে আমার ছোটভাই সাদী একদিন ইনবক্স করে একটা গানের ক্লিপ পাঠালো, আমি ওপেন করতেই যেন কন্ঠের মায়া তীর কলিজায় গেঁথে গেল, বুঝলাম যে গাইছে সে সাধারণ গাইয়ে নয়, কণ্ঠে স্বয়ং বাস করেন ঈশ্বর। সরস্বতী দেবী যেন স্বয়ং পারভেজের মাথায় হাত দিয়ে রেখেছে। পুরো হিরের দ্যুতি আমি ওর কন্ঠে পেয়ে যাই। এমন করে বাংলা ভাষাভাষীর একটা অল্প বয়সী ছেলের কণ্ঠে গালিবের, মেহেদী হাসান জ্বি, গোলাম আলী জ্বি’র গজল, বাস করে। খোদাপ্রদত্ত আলমগীর পারভেজ যাদুকরি কণ্ঠের ঠুমরি ও গজলের জন্যই যুৎসই যেন। তাই হয়তো পারভেজ ক্লাসিক্যাল ও গজলের প্রতি অধিকতর মনোযোগী হয়ে উঠেন। সুরের প্রতি শর্তহীন ভালোবাসা ও আনুগত্য, অবিরাম চর্চা ও অধ্যাবসায়ের ফলে পারভেজ একদিন বাংলাদেশের শাহেনশায়ে গজল হিসেবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করবেন। তার গায়কির ঢং, আবেগ, নিজস্বধারা ও সুমিষ্ট কণ্ঠ গজলের ক্ষেত্রে এক নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করে ।

গতকাল আলমগীর পারভেজ আর উনার সহধর্মিনীর যুগল কণ্ঠে লাইভে প্রায় দু’ঘন্টা স্পেশাল মেহেদী জ্বির গান শুনবার সুযোগ করে দিয়েছিল সে, তারই ফেসবুক পেইজ ‘রসমন্জরী’ থেকে।

একে একে গেয়ে যান মেহেদী হাসানের বহু উল্লেখযোগ্য গজলগুলো, ঢাকাই চলচ্চিত্র রাজা সাহেব এর ‘ঢাকো যতনা নয়ন দুহাতে’ থেকে রাফতা রাফতা, দো শারমিলি নেয়েন, এমন সব গজল গুলো একের পর এক গেয়ে যায় ক্লান্তিহীন।
মেহেদী হাসান জ্বি বিখ্যাত সুফী গায়িকা আবিদাকে বলেছিলেন ‘আমি সুর দেখতে পাই।” এটা কি কোন সাধারণ কথা? এই কথায় সুর শ্রষ্টার মাহাত্ম বোঝা যায়, উনি কি ছিলেন! ঠিক তেমনি করে হয়ত একদিন আমাদের আলমগীর পারভেজও কিছু বলতে পারে।

একটা মনের কোণে অভিমানের বেলুন ফুলে উঠছে যেন! কেন আলমগীর পারভেজ বেশী বেশী গান গাইছে না, মিডিয়াতে তার মুখ এতো পরিচিত নয় কেন?

কোন রিয়েলিটি শো উইন করে আসেনি বলে! কিন্তু একজন আলমীর পারভেজ হতে সময় লাগে, সাধনা, ধৈর্য লাগে, রাতারাতি টেলেন্ট হান্টের মঞ্চ কাঁপানো অনেক শিল্পীদের এমন ওস্তাদ দরকার। আলমগীর পারভেজ আমাদের দেশের সম্পদ। বৈঠকী আবহে মনের ভেতরে সুরের মায়াঘন ঘোর সব কণ্ঠে যেমন তাল আসে না, কেউ কেউ তা পারেন, আর যারা পারেন তারা সাধারণ নন, অনন্য অসাধারণ, আমার কাছে আমাদের দেশের আলমগীর পারভেজ তাদের মধ্যে একজন।

এই গায়ককে বেশী বেশী মিডিয়া কাভারেজ দেয়া দরকার, আমাদের ছোট দেশেও সুর সম্রাট তৈরী হচ্ছে । গতকালকের লাইভ প্রোগ্রামের আলমগীর পারভেজের গায়কী শুনে আমার মনে মনে ওকে প্রাইড অফ পারফরম্যান্স পুরস্কার দিয়েছি, সাথে শুভকামনা তো আছেই।
তার সহধর্মিনীর সাথে যুগল বন্দি গাওয়া শুনে বসির আহাম্মেদ ও উনার সহধর্মিনীর কথা মনে হচ্ছিলো, অসাধারণ ক্যামিষ্ট্রি যেন লাইভ প্রোগ্রাম কে বিশেষ মাত্রা এনে দিয়েছিল।

দর্শক স্রোতার না না শেষ হবে না অনুষ্ঠানের এই অনুরোধকে সাথে নিয়ে, ভদ্র লেহাজি ভাষায় শেষ স্তবকের মতো একটা হির গেয়ে লাইভ অফ করে দিলেন তারা। আর আমি সুরের মায়ায় সারাটা রাত মিষ্টি একটা আমেজ নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেললাম।
আমি কায় মনে দোয়া করি একদিন আলমগীর পারভেজ তমঘা-ই-ইমতিয়াজ হাসিল করবে।

(ফেসবুক লাইভে প্রচারিত অনুষ্ঠানটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন)

লেখক :
নাজমীন মর্তুজা
গবেষক, কবি ও কথাসাহিত্যিক



মন্তব্য চালু নেই