মেইন ম্যেনু

শক্তিমান ছড়াকার আতিক হেলালের জন্মদিন আজ

রুবাইত হাসান : “হাসতে দ্যাখো, গাইতে দ্যাখো, অনেক কথায় মুখর আমায় দ্যাখো, দ্যাখো না কেউ হাসি শেষে নিরবতা। শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর গানের সাথে সুর মিলিয়ে” সদা হাসিমুখ মাখা, এক উজ্জ্বল কবি প্রাণ আতিক হেলাল যখন এমন একটি উক্তি উচ্চারণ করেন, তখন স্বাভাবিক কারণেই ভাবনার রাজ্য একটু হোঁচট খায়, থমকে দাঁড়ায়। কেন এহেন নিরবতা? হাজারো প্রশ্নে জর্জরিত হয় মন। খুব জানতে ইচ্ছে করে নিরবতার কারণ। প্রশ্ন জাগে মনে, আমরা মধ্যবিত্ত মানুষগুলো কতটুকু ভালো আছি! আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা ভালো থাকার পক্ষেই বা কতটুকু সহায়? যেখানে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বশ্বাস গতিতে ঘোড়ার মতো দৌড়ায়, আর আমাদের সীমাবদ্ধ বেতনে সংসার চালাই বা কিভাবে? আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, নাভিশ্বাস উঠে, তাইতো কবি আতিক হেলাল নিজেকে শ্রমিকের কাতারে দাঁড় করিয়ে বলে উঠেন “আমি শ্রমিক” ছড়াটিতে এভাবে; আমি মধ্যবিত্ত শ্রমিক / সীমাবদ্ধ মাইনা / বোনাস- ক্রিমেন্ট পাই না / কোরমা পোলাও খাই না / সাহায্য তাও চাই না। সত্য উচ্চারণ, এটিই মধ্যবিত্তের মন-মানসিকতা; এটিই আমাদের অহংকার।

আতিক হেলাল একজন সত্যসন্ধানী কবি, ছড়াকার। কল্পনার কোন ভাবাবেগের ফসল দিয়ে তিনি তার সাহিত্য সাধনার গোলা ভরেন নি। সত্যকে তির্যক বা সরাসরি উপস্থাপন করেছেন মাত্র, যেখানে নেই কোন ভনিতা বা নেই কোন কল্পনার ভাবাবেগ। তার লেখা “আমি পারি না” ছড়াটিতে এই সত্য ভাবাবেগের কথা ফুটে উঠেছে এভাবে; “আমি কিছুই লিখতে পারি না / মিথ্যা শব্দ / মিথ্যা বাক্য / মিথ্যা গল্প / মিথ্যার বেসাতি / অলিক ঐশ্বর্য কারি না।” আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর বিপদের যেন শেষ নেই; প্রতি বছর জুন এলেই বাজেট, আর বাজেট মানে নিত্য নতুন কর বৃদ্ধি এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। তাই কবি এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে “মরার বাজেট” ছড়াটিতে লিখেছেন; ” যে পাবলিকে সব দিয়ে যায় / উপরি আবার ভ্যাটও / তাহার উপরেই বোলিং চলে / চালানো হয় ব্যাটও / শেয়ার বাজার, ব্যাংক লুটেরা / বাইরে থাকেন ধরার / আম জনতাই খাচ্ছে ধরা / তারাই যোগ্য মরার।” শুধু এই সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধেই কবি লেখেননি; লিখেছেন পারিবারিক দায়িত্ববোধ এর কথাও। “বাবা ও ছেলের গল্প” ছড়াটিতে আমরা সে ঘ্রাণ খুঁজে পাই। এখানে কবি একজন পিতার কথা বলেছেন, কিভাবে একজন পিতা নিজের সুখ সাচ্ছন্দ বিসর্জন দিয়ে গড়ে তোলেন পুত্রকে মানুষরুপে, পাশাপাশি পুত্র বাবার প্রতি যে অবহেলা দেখায় তারই চিত্র যেন ফুটে উঠেছে এই ছড়াটিতে; “কত রিচ ফুড, মিষ্টি ও কলা / অঢেল স্বেচ্ছাচার / বাবা আজ বুড়ো, খাওয়া দূরে থাক / পথ্য জোটে না তার।” কবি আতিক হেলাল এর আরো একটি উক্তি ” ছড়া ঘুম পাড়াতেও পারে, ঘুম ভাঙাতেও পারে।” তার এই উক্তির সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় তার “জাগলে তুমি” ছড়াটিতে। এ ছড়াটি যেন কবিতা হয়ে উঠতে চায়, আশু এক বিপ্লবের কথাই যেন বলে যায়; তোমারও ঘুমন্ত মন / জাগলো / ও দেহে প্রাণের কাঁপন / লাগলো / এ মাটিতে বিপ্লবও জাগবে / প্রেমহীন জান্তবও ভাগবে।” তিনি তার লেখনীতে সত্যকে সরাসরিভাবে ও সার্থকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। কবির এসব লেখনী বিশ্লেষিত হয়েছে বেশ আগেই জাতীয় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায়, বিশ্লেষণ করেছিলেন, শাহিদ উল ইসলাম।এবার আতিক হেলাল সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক, আতিক হেলালের লেখালেখি শুরু ১৯৮৬ সালে।

মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত হন। তার প্রথম লেখা (ছড়া) ছাপা হয় ১৯৮৬ সালে স্কুল-ম্যাগাজিনে, যেটির সম্পাদক ছিলেন প্রিয় শিক্ষক মিলন সরকার। তিনি আতিক হেলালকে ওই ম্যাগাজিনের ছাত্র-সম্পাদক মনোনীত করেন।একই বছরে আতিক হেলালের লেখা ছাপা হয় একটি পত্রমিতালী-পত্র িকায়, নাম ‘সোহাগ’। এই বছর থেকেই তার লেখা বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।তিনি কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাপ্তাহিক ‘ইস্পাত’ ও ‘জাগরণী’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।

১৯৮৭ সালের ২ জুলাই প্রকাশিত বৃহত্তর কুষ্টিয়ার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘বাংলাদেশ বার্তা’র সূচনালগ্ন থেকে তিনি সেটির সহ- সম্পাদক ও স্টাফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তি পর্যায়ে তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘আন্দোলনের বাজার’, দৈনিক‘দেশভূমি’ ও সাপ্তাহিক ‘দেশব্রতী’সহ আরও অনেক পত্রিকায় বার্তা-সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ, তিনি কুষ্টিয়ার দৈনিক ‘সূত্রপাত’ পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেনএবং তিনি এই পত্রিকাটির ভরাপ্রাপ্ত সম্পাকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।কলেজ-জীবনে তিনি ‘অভিরাম’, ‘সূর্যোদয়’, ‘যৌবন’, ‘প্রিয়, ‘নিকোটিন’, ‘তোড়া’, ‘আয়োজন’, ‘প্রজন্ম’সহ অনেকগুলো লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন।পেশাগত জীবনে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় সাংবাদিকতা করেন। ঢাকায় তিনি সাপ্তাহিক বিক্রম, দৈনিক সবুজ দেশ এবং সর্বশেষ ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় সহ-সম্পাদক ও স্টাফ রিপোর্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশন দফতরের সহকারী পরিচালক পদে যোগ দেন। ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় এক বছর তিনি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার ডেপুটি চীফ রিপোর্টার ছিলেন। বর্তমানে তিনি পাক্ষিক অর্থবীমা পত্রিকার সম্পাদক এবং অনলাইন পত্রিকা গ্লোবটুডেবিডি.কম-এর নির্বাহী সম্পাদক।

আতিক হেলালের এ পর্যন্ত ১৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বই ‘মশকরা’ (ছড়া) প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমী থেকে এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমী থেকেপ্রকাশিত হয় ‘কোথায় ভূত’ নামে ছড়ার বই ২০০৬ সালে। অন্যান্য বইগুলো হলো : পলিটিশিয়ান (ছড়া), সৌন্দর্যপ্রকাশ-১৯৯৯; আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (অনুবাদ), লিখনী পাবলিকেশন্স-১৯৯৯; এই বইটা পাবলিকের (রম্য রচনা), বাড ক¤িপ্রন্ট অ্যান্ড পাবলিকেশন্স-২০০২; এই বইটা আমাদের (ছড়া), ঝিঙেফুল-২০০২; আপনিও সুখী হতে পারেন (অনুবাদ), জ্ঞান বিতরণী-২০০২; শিশুদের সেরা গল্প (সম্পাদিত), একুশে বাংলা প্রকাশন-২০০৩; মেজর জলিল রচনাবলী (সম্পাদিত), কমল-কুঁড়ি প্রকাশন-২০০৬; ক্ষমতার ছড়া, ইলমা পাবলিকেশন্স ২০১১; হৃদয়ঘটিত (কবিতা), হাতেখড়ি ২০১১; সুখী হবেন কিভাবে (অনুবাদ), সাহিত্য বিকাশ ২০১১; পাখি হব (শিশু-কিশোর ছড়া), লোকালপ্রেস ২০১৩; নয় দশে নব্বই (সম্পাদিত কবিতা)সুচীপত্র-২০১৭।

আতিক হেলাল বাংলা একাডেমীর জীবন-সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সদস্য এবং বাংলাদেশ বেতার-টিভির তালিকাভুক্ত গীতিকার,ইন্ডিপেনডেন্ট হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান। তিনি ২০০৮ সালে সাতক্ষীরার নলতা মিতালী কচিকাচার মেলা সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া, সেন্টার ফর ন্যাশনাল কালচার সম্মাননা, বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ সম্মাননা, ছড়াকার রকীবুল ইসলাম সম্মাননা ও লিটল ফ্লাওয়ার ইন্টাারন্যাশনাল স্কুল স্বাধীনতা সম্মাননা লাভ করেছেন।তিনি কুষ্টিয়ার সিরাজুল হক মুসলিম হাই স্কুল থেকে এস এস সি, কুষ্টিয়া সরকারী কলেজথেকে এইচ এস সি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (এমএসএস-রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ও এল এল বি সম্পন্ন করেন।আতিক হেলালের জন্ম ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। পিতা মরহুম হাফিজুর রহমান সিকদার, মাতা রিজিয়া খাতুন। ৪ ভাই, ২ বোনের মধ্যে ২য়। ব্যক্তিগত জীবনে তার ২ যমজ কন্যা যথাক্রমে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস-এ এবং খুলনা প্রকৌশল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে (KUET) অধ্যয়নরত। স্ত্রী দুলারী রহমান একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত।



মন্তব্য চালু নেই