প্রধান ম্যেনু

শিশুর জন্মগত বাঁকা পা ঠিক করা সম্ভব

শিশুদের জন্মগত বাঁকা পা এখন আর কোনো সমস্যা নয় বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। একটু সচেতন থাকলে সহজেই এই সমস্যা সমাধান করা যায় বলেও মনে করেন তারা। চিকিৎসকরা বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে শিশুর জন্মগত বাঁকা পা ঠিক করা সম্ভব।

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চরে সালমা আখতার নামে এক নারী সন্তান প্রসবের কয়েকদিন পর বুঝতে পারেন তার মেয়ে নিপার পা বাঁকা। পরে তিনি স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে মেয়েকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জানান, এটি ক্লাবফুট সমস্যা। প্রথম অবস্থাতেই পায়ের চিকিৎসা করালে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা করিয়ে মেয়ের সুস্থ পা নিয়ে বাড়ি ফেরেন সালমা বেগম। এখন ওই গৃহবধূর মেয়ের পা পুরোপুরি ভালো।

কুমিল্লার দ্বেবীদারের নুরুন্নাহার (২৪) নামে আরেক গৃহবধূ তার ছেলে সাইয়্যেদকে (৩) নিয়ে এসেছেন বিএসএমএমইউ-এর ডি-ব্লকের সার্জারি বিভাগের ১০৩ নম্বর রুমে। সেখানে ক্লাবফুট শিশুদের চিকিৎসা করা হয়। ওই গৃহবধূ বলেন, কুমিল্লার একটি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে আমার ছেলের জন্ম হয় এবং জন্মের পরপরই বুঝতে পারি ছেলের পায়ের সমস্যা। তখন ওর পা অনেক বাঁকা ছিল। ছেলের ওই অবস্থা দেখে খুব চিন্তায় পড়ে যাই। তখন পাশের বাড়ির এক আন্টি জানান, তার দুই ছেলের এই সমস্যা ছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে এটা ঠিক করা যাবে। তার পরামর্শেই ছেলেকে নিয়ে এখানে চিকিৎসা করাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, ডাক্তাররা প্রথমে আমার ছেলের পায়ে প্লাস্টার করে, এর চার সপ্তাহ পর একটা অপারেশন করাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এর তিন মাস পরপর ছেলেকে এখানকার ডাক্তারদের দেখিয়ে নিয়ে যাই। চিকিৎসা ও ওষুধ সব ফ্রি।

নুরুন্নাহার জানান, তার ছেলের পা আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো। হাসপাতাল থেকে একটা জুতা দিয়েছে, এটা রাতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পরিয়ে রাখতে হয়। ডাক্তারররা বলেছেন ওর পা ঠিক হতে পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সাইয়্যেদের চিকিৎসার বিষয়ে ক্লাবফুট প্রকল্পের সিনিয়র ক্লিনিক ম্যানেজার সাকিনা সুলতানা বলেন, ‘ছেলেটির পা এখন অনেকটা ভালো হয়ে গেছে। আমরা তাকে এখন ফুটবল খেলার জন্য বলছি। তাকে পায়ের ওপর ভর দিয়ে টয়লেটে বসার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। সঙ্গে বিশেষ জুতা পরছে সে। এভাবে এক্সারসাইজের মধ্যদিয়ে তার পা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের এখানে রোববার ও সোমবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালে আবহাওয়াজনিত কারণে ফলোআপ রোগীর সংখ্যা কম থাকে। সোমবার সকাল থেকে ১৬ জন রোগী দেখেছি। এরা সবাই ফলোআপের রোগী। ’

সাকিনা সুলতানা জানান, ‘দেশের ২৭টি সরকারি হাসপাতাল ও ছয়টি বেসরকারি ক্লিনিকে আমাদের এই প্রকল্প আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি রুম ও একজন অর্থোপেডিক সার্জন দিয়ে থাকে। আর আমাদের প্রকল্পের আওতায় রোগীদের ওষুধ, চিকিৎসা, পায়ের প্লাস্টার সেবা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সবকিছু ফ্রি দেয়া হয়।’

গ্লোবাল ক্লাবফুট ইনিশিয়েটিভের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে এই সমস্যা নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর হার প্রতি হাজারে এক দশমিক দুই। আর বাংলাদেশে বছরে ৪ হাজার ৩৭৩টি শিশু ক্লাবফুট (বাঁকা পা) নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। ২০১০ সাল থেকে বিএসএমএমইউ বিনামূল্যে শিশুদের জন্মগত বাঁকা পায়ের চিকিৎসা দেয়া শুরু করে। এ পর্যন্ত এখানে ৫৯৯টি শিশুর মোট ৯১৪টি জন্মগত বাঁকা পায়ের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

শিশুদের প্রতিবন্ধিতা দূরীকরণে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে— ‘দ্য ন্যাশনাল ক্লাবফুট প্রোগ্রাম অব বাংলাদেশ’। এটি যৌথভাবে পরিচালনা করে দ্য গ্লেনকো ফাউন্ডেশন ও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

দ্য গ্লেনকো ফাউন্ডেশনের ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পের এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার লিটন রোজারিও বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ২১ হাজার ৪০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৩১ হাজার ৫২১টি বাঁকা পায়ের চিকিৎসা করা হয়েছে। কারণ, সব শিশুর দুই পায়ে ক্লাব ফুট হয় না। এই শিশুদের মধ্যে ২/১ জন ছাড়া প্রায় ১০০ শতাংশ শিশুই চিকিৎসার মাধ্যমে সাফল্য পেয়েছে। ’

শুধুমাত্র ২৭টি জেলার হাসপাতালে কেন এই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, দেশের ৬৪টি জেলার শিশুদেরই এই হাসপাতালগুলোর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।’

বিএসএমএমইউ’র প্রক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, এটা আসলে শিশুদের জন্মগত সমস্যা। আগে এই সমস্যার তেমন কোনো চিকিৎসা ছিল না। মানুষও তেমন গুরুত্ব দিতো না। তবে এখন সময় বদলেছে, এই সমস্যার উন্নত চিকিৎসা চালু হয়েছে। তাই জন্মের পরেএ ধরণের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সম্ভব শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে এবং সঠিক চিকিৎসা দিলে বাঁকা পা স্বাভাবিক করা যায়।

এই সমস্যা এখন অপারেশন করে এবং শুধু পোনিচেটি প্লাস্টার করেও সারিয়ে তোলা যায়। এ পর্যন্ত আমাদের কাছে আসা সব শিশুর বাঁকা পা আমরা সারিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি বলেও জানান তিনি।

বিএসএমএমইউ’র অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ক্লাবফুট বিষয়ক কো-অর্ডিনেটর ডা. কৃষ্ণ প্রিয় দাশ বলেন, ‘অনেকেরই ধারণা হয়ত বাবা-মায়ের কারণে বাঁকা পা নিয়ে শিশুর জন্ম হয়। কিন্তু এটা আসলে জন্মগতভাবেই হয়। তবে এর কারণ এখনও নির্ণয় করা যায়নি। ধারণা করা হয়, মায়ের পেটে পানি কমে গেলে এই রোগ হতে পারে।’

এই সমস্যা দেখা গেলে শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসতে হবে। তাহলে শিশুটি সঠিক চিকিৎসা পাবে এবং সেটা সারিয়ে তোলা সম্ভব হবে।



মন্তব্য চালু নেই