শিরোনাম:

সন্তান যেন বড় হয়ে ধর্ষক, জঙ্গি না হয়

শেখ আদনান ফাহাদ : কার সন্তান বড় হয়ে কী হবে, কেউ জানেনা। মা-বাবা শুধু চেষ্টা করে যেতে পারে, ভবিষ্যতে ফল কেমন হবে, তারা কেউ জানেন না। তবে কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে আগাম কিছু কথা বলা যায়। যাপিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। যদিও আমার আপনার সন্তান ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিবে, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা।

স্কুল পর্যায়ে একটা ভাবসম্প্রসারণ সবাই করেছে- ‘অর্থই অনর্থের মূল’। অবশ্য আমাদের মধ্যে যারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তারা বলবেন, এসব কথা বলে প্রজন্মের মধ্যে ‘বড়’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে মেরে ফেলা হয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা দোষের কিছু নয়। উচ্চাকাঙ্ক্ষা তখনই আপত্তিজনক হয় যখন মনের মধ্যে লোভ সৃষ্টি হয়। লোভ করলে সেই লোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে অনেক অসদুপায় অবলম্বন করতে হয়। একটা পাপ আরেকটা পাপকে ডেকে আনে। একটা ভুল আরেকটা ভুলকে ডেকে আনে। আপনার, আমার কাছে মনে হতে পারে, সব ঠিকই আছে। কিন্তু কোত্থেকে কী হয়ে যাবে, ঠাহর করে উঠতে পারবেন না।

আপনি ব্যস্ত টাকা কামাতে, আপনি ব্যস্ত বিউটি পার্লারে। আপনি ব্যস্ত লং ড্রাইভে। আপনি ব্যস্ত পার্টিতে। আপনি ব্যস্ত ক্যারিয়ার নিয়ে। আপনার অনেক টাকা। আপনাদের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তর্ক হয় নানা ইন্টারেস্টিং বিষয় নিয়ে। কার বাবার কত টাকা, কোন গাড়িটা কত দামি। আগামী ঈদ বা পূজার ছুটিতে কে কোথায় হলিডে কাটাতে যাবে? টাকা আছে; দামি গাড়ি, দামি মোবাইল সেট কিনে দেন, কারণে অকারণে বিদেশে যান, কোনো অসুবিধা নেই। আপনার টাকা আপনি খরচ করবেন, আমরা বলার কে? কিন্তু ভাই সাবধান। একটু খেয়াল করে দেখুন, আপনার সন্তান কোনো ধরনের শূন্যতা নিয়ে বড় হচ্ছে কি না।

টাকা আছে বলে সন্তান কিছু চাইলেই কিনে দিতে হবে, আরেকজনের সন্তানকে একটু গরীব প্রমাণ করার জন্য নিজের সন্তানকে সবচেয়ে দামিটা কিনে দিতে হবে এমন চর্চা আদৌ ঠিক হচ্ছে কি না, একটু ভাবুন। আপনার সন্তান ভালো ইংরেজি পারছে, এতে আহ্লাদে ডুবে না গিয়ে খেয়াল করে দেখুন সে নিজের দেশের ইতিহাস, স্থানীয় মূল্যবোধ শিখছে কি না? বড়দের সম্মান করতে শিখছে কি না। ছেলেসন্তান হলে মেয়েদের সম্পর্কে তার ধ্যানধারণা কী? তার চেহারার দিকে তাকান, চুলের স্টাইলের দিকে তাকান। কোনো অসংগতি ধরা পড়ে কি না। আপনার বাবা, না হলে দাদা কি গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিল? গ্রামে কি আপনাদের কোনো বাড়ি আছে এখনো? আপনার ছেলে কি কখনো গ্রামে গেছে? গ্রামের সাথে, নিজের শিকড়ের সাথে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে, এদেশের গান-কবিতার সাথে আপনার সন্তানের কোনো চেনাজানা আছে কি না, আজই ভাবুন। এদেশের নদী-নালা, কৃষক, শ্রমিকের সাথে তার কোনো যোগাযোগ হচ্ছে কিনা? একটু ভাবুন।

আপনার সন্তান কি মাঠে যাচ্ছে নিয়মিত? সে কি ফুটবল খেলতে পারে? ক্রিকেট খেলে সে? বন্ধুদের সাথে কি কি বিষয় নিয়ে আলাপ করে সে? একটু জানার চেষ্টা করুন। তবে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে ধরা খেলা হবেনা। কৌশলে শুনুন। সময়ের সাথে চাহিদার কেমন পরিবর্তন আসছে কি না, একটু খেয়াল করুন। নিজের সন্তান বন্ধুদের নিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে কি না? প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে বলে, বাবা-মার কাছ থেকে তথ্য গোপন করছে কি না, খেয়াল করুন। তার গতিবিধি নজরে আনুন।

যে টাকা-পয়সা কামানোর দৌড়ে আমরা আছি, সেখানে ইতোমধ্যেই কিছু মানুষ ফার্স্ট হয়ে বসে আছে। বিত্তের দৌড়ে ভালো করা পরিবারগুলোর কেউ কেউ মাঝে মাঝেই জঙ্গি কিংবা ধর্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। তাতে কী, দৌড় কারো থামার নয়। তবে মধ্যবিত্তের কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবন এক অদ্ভুত ব্যালন্সের উপর দাঁড়িয়ে। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ মিলে দারুণ এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবন এখানে মানুষের। বলতে পারেন টানাপোড়েনও। এই ভারসাম্য কিংবা টানাপোড়েনই যেন তাদের জীবনকে নিরাপদ রাখে। সমাজে অপরাধীদের ডেমোগ্রাফি বিশ্লেষণ করলে হয়তো এমন তথ্য বের হয়ে আসবে যে, একেবারে নিম্নবিত্ত অথবা উচ্চবিত্তের সন্তানেরাই অধিক সংখ্যায় অপরাধী হচ্ছে। এখনি সিদ্ধান্ত দেয়া যাচ্ছেনা, কারণ, গবেষণা ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়না।

ফলে শুধু উচ্চবিত্তের সন্তানেরাই শুধু বিপথে যাচ্ছে, এমন কথার সরলীকরণ হবে সমাজের ভুল পাঠ।

আমি আপনি যে বিত্তেরই হইনা কেন, সন্তানকে সমাজের জন্য নিরাপদ নাগরিক হিসেবে তৈরি করা আমাদের সকলের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। নিজেরা আর্থিক ভাবে সৎ থেকে, একটা সুস্থ পরিবেশে বসবাস করে আমরা শুধু চেষ্টা করেই যেতে পারি। আর ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে পারি।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়