মেইন ম্যেনু

স্কুল-মাদ্রাসায় ছাত্রীদের নিরাপত্তা : কী করা দরকার?

ফরিদপুরের একটি স্কুলে নবম শ্রেণীর একজন ছাত্রী তারই স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে নিয়মিত প্রাইভেট পড়তেন। একদিন পড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরে শিক্ষক ওই ছাত্রীকে কিছুক্ষণ থেকে যেতে বলেন।

সবাই চলে যাওয়ার পরে ‌ঐ ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন শিক্ষক।

এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই ছাত্রী বলছেন, ”প্রথমে আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করবো? প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। পরে যখন তাকে হুমকি দিলাম যে, আমাকে ছেড়ে দেন, না হলে চিৎকার করবো। তখন তিনি আমাকে ছেড়ে দিলে আমি দৌড়ে বের হয়ে এলাম।”

ভয়ে লজ্জায় এই কথাটি তিনি অভিভাবক, স্কুলের অধ্যক্ষ, কাউকে জানাতে পারেননি। যদিও স্কুলে এই শিক্ষকের কাছেই তাকে পড়াশোনা করতে হয়েছে।

”তার কাছে আর আমি প্রাইভেট পড়তে যাইনি, কিন্তু তিনি আমাকে স্কুলে নানাভাবে হয়রানি করতেন। ক্লাসে অকারণে বকাঝকা করতেন, নম্বর কমিয়ে দিতেন। স্কুল ছাড়ার পরে যেন আমি নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলাম।”

তিনি বলছেন, পরবর্তী সময়ে তিনি অনেক বান্ধবীর কাছেও এভাবে স্কুলে কোন কোন শিক্ষকের কাছে হয়রানি হওয়ার কথা শুনেছেন।

সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজীতে একজন মাদ্রাসা ছাত্রী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা করার পর তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ওই শিক্ষার্থী এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, স্কুল-মাদ্রাসায় অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা কতখানি নিরাপদ? অভিভাবক এবং কর্তৃপক্ষ এসব ব্যাপারে কতটা সচেতন?

কী বলছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা?

চাঁদপুরের নীলকমল উসমানিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোশাররফ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, আমাদের স্কুলে পথেঘাটে মেয়েদের উত্যক্ত করার অভিযোগ কখনো কখনো পেলেও, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোন ছাত্রী কোন অভিযোগ করেনি।

তিনি বলছেন, এ ধরণের ঘটনায় নির্দেশনা আছে যে, কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে স্কুলের বোর্ড এবং প্রশাসনকে জানাতে হবে।

”আমি সবাইকে বলে রেখেছি, ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন, কোন অভিযোগ থাকলে যেন এসে সরাসরি আমাকে জানায়।” বলছেন মি. হোসেন।

কিন্তু নিয়ম কানুন যাই থাকুক না কেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেই চলেছে। ২০১৯ সালের প্রথম তিনমাসে দেশ জুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এরকম অন্তত আটটি অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে।

তবে স্থানীয় শিক্ষকরা বলছেন, কোন হয়রানির ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই সেটি চেপে রাখে। অনেক সময় পরিবারকে জানালেও সামাজিকতার কথা চিন্তা করে পরিবার এ নিয়ে আর এগোতে চায় না।

গোপালগঞ্জের ডালনিয়া আই এ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লতিফা আক্তার বলছেন, ”স্কুলের দায়িত্ব হিসাবে আমরা সবসময়েই সতর্ক থাকি। কিন্তু তারপরেও কেউ বিচ্ছিন্নভাবে যদি এ ধরণের কোন অপরাধ ঘটিয়ে ফেলে, দ্রুত তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটাই কাম্য। আমার মনে হয়না, এ ধরণের ঘটনা কেউ সমর্থন করবে।”

তিনি বলছেন, এরকম ঘটনার শিকার হলে কোন শিক্ষার্থীর সেটা চেপে রাখা উচিত নয়।

তবে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ উঠলে তার প্রতিকার পাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে মিজ আক্তার বলছেন জানান, নারী প্রধান শিক্ষক হওয়ায় তাকে স্কুলের শিক্ষার্থীরা সহজে এ ধরণের ঘটনা ঘটলে জানাতে পারবে। কিন্তু এ ধরণের ঘটনা ঘটলে পুরুষ শিক্ষকদের জানাতে অস্বস্তি লাগলে, নারী শিক্ষক এবং অভিভাবকদের অবশ্যই দ্রুত জানানো উচিত, যাতে অপরাধীদের ক্ষেত্রে শক্ত ব্যবস্থা নেয়া যায়।

তিনি বলছেন, স্কুলে জেলার ডিসই, এসপি, ইউএনও ও ওসিদের ফোন নম্বর দেয়া আছে, যেখানে ইভটিজিংসহ যেকোনো ধরণের কোন অভিযোগ থাকলে তারা সরাসরি জানাতে পারে।

তবে শিক্ষকরা স্বীকার করছেন, কেউ নিজে থেকে এগিয়ে এসে অভিযোগ না করলে এ জাতীয় ঘটনাগুলো তাদের পক্ষে জানার কোন ব্যবস্থা নেই।

মেয়ে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসার কোন কোন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও, যার সর্বশেষ ভুক্তভোগী সোনাগাজীর ছাত্রীটি।

ফেনীর ফুলগাজীর বশিতপুর বক্সী শাহ ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবু হানিফা বলছেন, ”একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্রীরা সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা। তাদের কাছে কেউ হয়রানির শিকার হবে,সেটা আশা করা যায় না।”

‘অভিভাবকের উচিত তাদের সন্তানদের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলা’
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সন্তানদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে মামলা করেছেন অভিভাবকরা। তবে সমাজ বিজ্ঞানী ও শিক্ষকরা বলছেন, এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরণের ঘটনা অভিভাবকরা চেপে রাখার চেষ্টা করেন।

অনেক সময় সামাজিকভাবে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি করে দেয়া হয়, ফলে সেগুলো থানা-পুলিশ বা মামলা পর্যন্ত আর গড়ায় না।

ফরিদপুরের বিদ্যালয় ছাত্রী দুই মেয়ের পিতা মমিনুল হক বলছেন,”আমি আমার মেয়েদের বলে রেখেছি, কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হলেই যেন আমাকে এসে তারা বলে।”

”সব অভিভাবকের উচিত তাদের সন্তানদের সঙ্গে এরকম সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে তারা যেকোনো ঘটনার কথাই এসে খুলে বলতে পারে, নিজেদের মধ্যে চেপে রাখতে না হয়। আর অভিভাবকদেরও উচিত, এরকম অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া, যাতে ওই ব্যক্তির উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত হয়।”

তিনি স্বীকার করছেন, এখনো লোকলজ্জার কথা ভেবে অনেকে হয়তো এসব বিষয় নিয়ে সামনে এগোতে চান না। কিন্তু তাতে যেমন নিজের সন্তানের অপমানের কোন প্রতিকার হয়না, তেমনি আরো অনেক সন্তান এর শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

‘নৈতিকতার এতোখানি অবনতি কীভাবে হলো’
শিক্ষা খাতের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, কেন এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে, সেটা আগে খুঁজে দেখা দরকার।

তিনি বলছেন, ”একসময়ে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত হওয়া প্রতিরোধ করতে গিয়ে শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সেই চিত্রটা কীভাবে বদলে গেলো? কারো কারো নৈতিকতার এতোখানি অবনতি কীভাবে হলো?”

এখন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন আর গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এজন্য তিনি যেসব পরামর্শ দিচ্ছেন:

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কারিকুলাম আরেকবার খতিয়ে দেয়া উচিত এবং সেখানে নৈতিকতার বিষয়ে আরো জোর দেয়া উচিত।

এসব ঘটনায় আইন আছে, নীতি আছে, কিন্তু সেটার কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা উচিত। অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত, যাতে অন্যকেউ এ ধরণের ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়।

অভিযোগ উত্থাপনকারী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা পরবর্তীতে কোনরকম হয়রানি বা সমস্যার মুখোমুখি না হন।

রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, কোন অভিযোগই হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে।

কিন্তু এসব ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ কি ব্যবস্থা নিয়ে থাকে?
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোঃ শাহেদুল খবির চৌধুরী বলছেন, ” যৌন হয়রানি রোধে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করার নির্দেশনা রয়েছে। এ জাতীয় অভিযোগ পেলে এই সেল দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।”

তিনি বলছেন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আসলে স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। সেখানে দোষী প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। পাশাপাশি পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেয়া হয়ে থাকে।

তবে রাশেদা কে চৌধুরী বলছেন, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী প্রতিটা স্কুলে এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে মনিটরিং সেল থাকা উচিত। কিন্তু বেশিরভাগ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় সেটা হয়নি। সেটা তৈরি করা এবং কতটা মনিটরিং হচ্ছে, সেটাও নজরদারি করা উচিত।



মন্তব্য চালু নেই