মেইন ম্যেনু

স্বপ্নবিলাসী কবি তমসুর হোসেন || আবদুল হাই ইদ্রিছী

সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মানুষই স্রষ্টার আপন বৈশিষ্ট্যেই অনন্য। বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা মানুষকে দিয়েছে সৃষ্টির মাঝে শ্রেষ্ঠত্বেও মর্যাদা। বিবেকবান মানুষ তাই সৃষ্টির আদি লগ্ন হতে মনম ও মেধার কর্ষনে সচেষ্ট। মানুষ তার মনন ও মেধা চর্চায়, নিজেকে প্রকাশ করার তাড়ানায়, আপন ভাবনা ও কল্পনাকে অন্যে ছড়িয়ে দেবার বাসনায় মানুষ সৃষ্টি করেছে শিল্প সাহিত্য। আর সাহিত্যের প্রধান শাখা হচ্ছে কবিতা। কবিতার ইতিহাস মানব ইতিহাসের মতই সুপ্রাচীন। কবিতা তাঁর বাঁক পরিবর্তন করে, মোড় ঘোড়িয়ে কালের মাঝে নীল হয়েছে। কবিতা শুধু শিল্পই নয়- কবিতা মানব সভ্যতার ইতিহাস, মানব মনের ক্রমবিকাশের হাতিয়ার। আদি কবি বাল্মিকি থেকে শুরু করে যে বাংলা কাব্যের ধারা তা আজ শত সহস্র ধারায় বিকশিত। আধুনিক বাংলা কাব্যে একটি অনন্য নাম তমসুর হোসেন।

কবি তমসুর হোসেন ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার রেলবাজার গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার মোঃ ছকিরউদ্দিন সরকার এবং মাতার মোছাঃ তমিরন নেছা। পাঁচভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। তিনি ১৯৭৫ সাথে একই জেলার হিঙ্গুন রায় উপজেলান বিশিষ্ট শিল্পী কসিম উদ্দিনের কন্যা মোছাঃ কুহিনুর বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। তিনি মেয়ে সন্তানের জনক।

ছাত্রজীবন থেকেই তার লেখালেখি শুরু। ব্রক্ষ্মপুত্রের অগাধ জলরাশির তরঙ্গহিল্লোল এবং দিগন্তবিস্তৃত মাঠের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া উদাস হাওয়া তার মনে লেখক হওয়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। সম্ভবতঃ ‘বাতায়ন পাশে ঝিঙ্গেফুলদল’ তার লেখা প্রথম কবিতা। এরপর থেকে লিখে চলছেন অবিরাম।

তমসুর হোসেন সেই সকল কবিদের অন্তর্ভুক্ত যারা সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে কলমকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহন করেছেন। কবিতা, ছড়া, শিশুতোষ গল্প, ছোটগল্প এবং ইসলামি প্রবন্ধ সবদিকেই তার উন্মুক্ত বিচরণ। কবিতায় তিনি যেমন স্বপ্নবিলাসী এবং সুচিন্তিত শব্দকুশলী, তেমনি ছোটগল্পেও তিনি এক সংবেদনশীল দুঃখভারাক্রান্ত মানবপ্রেমিক। তার শিশুতোষ গল্প শিশুর স্বপ্নীল ভুবনের বাস্তব রঙটিকে জীবন্ত করে তোলে।

একজন সত্যিকার বিশ্বাসী কবি হিসেবে তমসুর হোসেন নিজ ধর্ম এবং আদর্শের প্রতি সমভাবে কৃতজ্ঞতার পরিচয় তুলে ধরেছেন তার রচিত প্রবন্ধসমুহে। তার রচিত প্রবন্ধ সহজপাঠ্য, রুচিকর এবং হৃদয়গ্রাহী। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যুক্তি, তথ্য এবং সমৃদ্ধ ভাষার লালিত্যে তিনি পাঠকের মর্মমূলে চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেন। বর্তমান সময়ে ইসলামি ভুবনে যে ক’জন কলমসৈনিক তাদের নিবিড় পাঠ এবং ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে নিরলস সাধনা করে যাচ্ছেন কবি তমসুর হোসেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

কবি তমসুর হোসেন এর লেখা নিয়মিত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত তাঁর কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, জীবনী, নাটকসহ প্রায় ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা: অনাবাদী মাঠে প্রেম, চন্দ্রালোকের গন্ধে ভেজা, মনের শূন্যমাঠে দাঁড়ায় সে এলোচুলে, অগোচরে অনুভবে। গল্প: দুঃখনদীর শতবাঁক, পড়ন্ত বিকেলের রোদ, হৃদয়ে নক্ষত্র জ্বলে। শিশুতোষ গল্প: রক্তাক্ত পালক, হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ, সুদূর মরুর সোনার মানুষ, পরির দেশে রাজকুমার। প্রবন্ধ; বিশ্বনবীর প্রতিচ্ছবি, কবি আবদুল হালীম খাঁ : বাণী যার খোলা তলোয়ার এবং প্রেম প্রত্যয় এবং সৌন্দর্যের কবি মোশাররফ হোসেন খান।

দৃশ্যের আড়াল থেকে শব্দের কারুকার্য কৌশলে যিনি পাঠককে যত বেশি কাছে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছেন কবি হিসাবে তিনি ততটুকু সার্থকতা লাভ করেছেন। কবি তমসুর হোসেন সেই দিক থেকে স্বার্থক। তাঁর কবিতা মনের সুপ্ত অনুভুতিকে বৃষ্টির শব্দে জাগিয়ে তোলে। তিনি লিখেছেন-

‘যে আমাকে কাছে টানে তারে আমি চিনি
নির্জন শ্রাবণ হয়ে বাজে রিনিঝিনি
বিমুগ্ধ চাঁদিনী তার স্বচ্ছ শুভ্র হাসি—
(নির্জন শ্রাবণ হয়ে)

কবি তমসুর হোসেন একজন বিশিষ্ট আধুনিক কবি। সমাজ সচেতন মানবতাবাদী কবি। তার কলমের আঁচড়ে ফুটে উঠেছে সমকালের অন্যায়, অনাচার এবং জুলুমের চিত্র। দেশের দুর্দশা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় প্রতিহিংসা, বেকার ভাসমানদের আর্তনাদ সম্পর্কে তার কলমে এসেছে জোর প্রতিবাদ। কবি লিখেছেন-.

‘একদিন ভাবতাম তুমি বড় সুন্দর হে স্বদেশ
তোমার কাছে সত্যের চেয়ে মূল্যবান কিছু থাকতেই পারেনা
কিন্তু যখন থেকে দেখছি দলীয় প্রতিহিংসায় লোকেরা লাশের ওপর লাথি মেরে
অট্টহাসি করে, তখন থেকে মনটাকে কিছুতেই স্বাভাবিক করতে পারিনা।
(হায় অশান্ত স্বদেশ)

কবি তমসুর হোসেনের কবিতায় শুধু দেশের কথাই নয়, সমস্ত পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের কথা এসেছে। কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, মায়ানমার, চেচনিয়া, বসনিয়া আর ভারতের মুসলমানরা কিভাবে দিনের পর দিন নির্যাতিত হচ্ছে কবির লেখনীতে রয়েছে এর উচ্চকন্ঠ প্রতিবাদ। কবি লিখেছেন-.

‘প্রাচীন নগরী বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তাতে কার ক্ষতি
মারণাস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত তিলোত্তমা নগরী
বিধ্বস্ত দালানের আড়ালে বসে কাঁদে
হানাদার কেড়ে নিচ্ছে প্রাচীন সব নিদর্শন
( বাগদাদ )
. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
জ্বলছে ইরাক, জ্বলছে সংক্ষুদ্ধ ফিলিস্তিন
জ্বলছে অবিরাম ভুস্বর্গ কাশ্মীর
(অবরুদ্ধ ইরাক)

কবি তমসুর হোসেন কবিতার পাশাপাশি ছোটগল্প ও শিশুতোষ গল্প রচনায়ও সমধিক দক্ষ। তার শিশুতোষ গল্পগুলো সুখপাঠ্য এবং রুচিকর। শিশুমনের আকুতি এবং পুষ্পশুভ্র উল্লাসের অনবদ্য গতিময়তা নিয়ে তিনি গল্প লিখেন। তার প্রতিটি রচনা তারকার মত দীপ্যমান।‘ধার্মিক চাষী নিয়ামত’ গল্পে বুজুর্গ আবদের দোয়ায় নিয়ামতের দুই ছেলে এবং এক মেয়ের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। নিয়ামত ছিল সৎ এবং দ্বীনদার চাষী। ‘তোতা এবং সওদাগর’ গল্পে তিনি সওদাগরের খাঁচায় বন্দী নিরুপায় পাখির মুক্তিলাভের করুণ আর্তি অত্যন্ত দরদ দিয়ে তুলে ধরেছেন। ‘প্রেতের সাথে বাস’ গল্পে এক নিসঙ্গ বালকের একা থাকার অবর্ণনীয় কষ্টের গল্প। যার স্বজন তাকে অপরিচিত ভুতুড়ে বাড়িতে একা ফেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যায়। অনেক বছর আগে মরে যাওয়া দিব্যময় নামের একটি সুন্দর বালক তাকে সঙ্গ দেয়। ‘দৈত্যের রাজ্যে রাজকুমার’ গল্পটি পশ্চিমের কিরকুক রাজ্যের শাহজাদা তাহসীনের বীরত্ব নিয়ে লিখেছেন। আজখাস দৈত্যের কবল থেকে দারফুন রাজার কন্যা শাহাজাদী গুল-ই-নুরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে অমিততেজী বীর শাহজাদা তাহসীন।

উত্তরবঙ্গের স্বপ্নবিলাসী কবি তমসুর হোসেনের কাছে রয়েছে বন্ধু সুলভ অমায়িক আচরণ। প্রত্যয়দ্দীপ্ত শান্ত চেহারার অধিকারী এই ব্যক্তিত্বের কন্ঠে রয়েছে এক যাদুময়ী ভাষা, যা মানুষকে সহজেই আপন করে নেয়। আমরা আশাবাদী কবির সাহিত্যকর্ম ও সাধনা পরবর্তী প্রজন্মকে একটি উজ্জল আলোকবর্তিকার মত সামনে এগিয়ে চলার পথ দেখাবে। আমাদের বিশ্বাসী সাহিত্যধারা হবে গতিশীল ও বেগবান। ৬২তম জন্মদিনে কবিকে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

লেখক :
আবদুল হাই ইদ্রিছী
সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক, কবি ও ছড়াকার
সম্পাদক: মাসিক শব্দচর,
প্রকাশক: শব্দচর প্রকাশনী।
ই-মেইল: [email protected]



মন্তব্য চালু নেই