প্রধান ম্যেনু

হঠাৎ বসন্ত || সাবিনা ইয়াসমিন

তিথী আর বিথীমনি দুই বোনের ছোট একটা সংসার। এ দুনিয়াতে ওদের আপন বলতে কেউ বেঁচে নেই। বিথীমনি এইচএসসি পাস করলে খরচ আরো বেড়ে যায় কারণ বিথীমনিকে ঢাকায় ভালো কলেজে এবং হোস্টলে ভর্তি করতে হবে। তিথীর ইচ্ছা ছোট বোনকে ডাক্তারি পড়ার, বিথীমনি অনেক মেধাবী ছাত্রী। তিথী তো অনার্স কমপ্লিট করতে পারেনি, তার বাবা মারা গেলে, সেই শোঁকে শোঁকে কিছু দিন পরে তার মাও মারা যায়। তাই তিথী অনার্স পরিক্ষা দিতে পারেনি। সে জন্য তিথীর অনেক আশা ছোট বোনটারে নিয়ে।

তিথী ভাবে না নিজের কথা।
ছোট বোনটারে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে।
একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন তিথীর, পত্রিকায় একদিন চাকরির খোঁজ পেল বেতন ১৫ হাজার টাকা খাওয়া থাকা ওদের।
কাজ এক বৃদ্ধাকে দেখাশুনা তাকে বই পড়ে শুনানো, ঔষধ সময় মতো খাওয়ানো তার সাথে গল্প করে সময় কাটানো,
এই রকম একটা কাজের প্রয়োজন ছিল তিথীর কারণ বোনটা হোস্টলে গেলে সে বড় একা হয়ে যাবে।
কিছুদিন পরে বিথীমনি হোস্টলে চলে গেল আর তিথী কাজের জায়গায়।

এক বড় লোকের বিরাট বাসাতে তিথীর চাকরি।
পছন্দ হলো কাজের জায়গাটা তিথীর,
বাসাতে থাকে এক বয়স্ক মহিলা তেমন একটা বৃদ্ধা নয়।
তার মেয়ে আর নাতি সংসার।
মেয়েকে বিভিন্ন বিজনেসের কাজে বাইরে থাকতে হয় তাই মাকে দেখা শুনা করতে পারে না।
আর ছেলেটা অর্থাৎ নাহিদ কেবলি পড়াশুনা শেষ করে মায়ের সাথে বিজনেসের দেখাশুনা করছে।
বয়স্ক মহিলার প্রাণ নাহিদ,
নাহিদো তার নানুভাইকে ছাড়া কিছু বোঝে না,
দুজন দুজনার জান।
ছুটির দিনে সারাদিন নাহিদ তার নানুভাইয়ের সাথে সময় কাটায়।
তিথীর কাজে কাজে কেটে গেল কিছু দিন, বাসার সবার সাথে অনেক ঘনিষ্ঠ হলো। তিথীর কাজে এবং ব্যবহারে বয়স্ক মহিলার মেয়ে আতিয়া হোসায়েন অনেক খুশি।
তিথীকে মেয়ের মত ভালবাসতো।
আর তিথীর হাতের চা ভীষণ ভালোবাসতো সবাই।
তিথীর হাতের চা একবার যে খাবে সে সহজে ভুলতে পারবে না তিথির হাতের চা বারবার খাইতে চাইবে।

নাহিদ রোজ ছুটিরদিনে তার নানুভাইয়ের ঘরে আসতো এবং তিন জনে লুডু খেলতো আড্ডা দিত গল্প করত।
নাহিদের অনেক সুন্দরি সুন্দরি গার্লফ্রেন্ড আছে মাঝে মাঝে ওদের কেউ সে সময় দিত।
কিন্তু ইদানিং ওদের বেশি সময় দেয়না নাহিদ।
কি হয়েছে নাহিদ নিজেও জানে না, ওদেরকে সময় দিতে ভালো লাগে না।
আগের চেয়ে নাহিদ তার নানুভাইয়ের ঘরে খুব চলা ফেরা।
নাহিদের নানুভাই রেবেকা আহম্মেদ ওর হঠাৎ এ পরিবর্তন দেখে অবাক।
তবে রেবেকা আহম্মেদের ভালোই সময় কাটছে।
নাহিদের এ পরিবর্তন রেবেকা আহম্মেদ বোঝে কখনো প্রকাশ করে না।
তিথী আসাতে রেবেকা আহম্মেদের ভালোই হয়েছে।

বিথীমনির কলেজ বন্ধ হলে মাঝে মাঝে এখানে বেড়াতে আসতো,
বাসার সবাই বিথীমনিকে আদর করতো,
বিশেষ করে নাহিদ ওকে ছোট বোনের মত ভালোবাসতো।
আর সময় পেলে নিজে গাড়ি ড্রপ করে হোস্টলে রেখে আসতো।

এত কিছু নাহিদ কেন করে তিথী তা ঠিকই বোঝে কিন্তু তার কিছু করার নেই।
কারণ তিথী ওদের সাহায্য নিয়ে বেঁচে আছে।
আর বিথীমনি ছাড়া এসব কখনো ভুলেও কল্পনা করে না ভালোবাসা তার জন্য নয়।
এ সুখ টুকু তিথী ভুলেও কোন দিনো ভাবে না।

রাত অনেক গভীর সবাই ঘুমে বিভোর হঠাৎ দরজায় লক।
তিথী বলল কে।
আমি নাহিদ।
তিথী বলল এত রাতে কেন।
নাহিদ বলল নানুভাইয়ের সাথে আমার জরুরি কথা আছে।
তিথী বলল উনি তো এখন ঘুমাচ্ছে কাল কথা বলেন।
নাহিদ বলল তুমি দরজা খুলো আমার খুব প্রয়োজন।
তিথী দরজা খুলে রেবেকা আহম্মেদকে ডাকতে গেল।
নাহিদ তিথীর একটা হাত শক্ত করে ধরলো,
আমি নানুভাইয়ের কাছে নয় তোমার কাছে এসেছি।
তাহলে যে বললেন কি জানি প্রয়োজনের কথা।
এ কথা না বললে তুমি কি দরজা খুলতে, আমি জানি আমার ডাকে কখনোই সারা দিতে না তুমি।
তিথী নাহিদের কাছ থেকে হাতটা সারাতে চেষ্টা করলো বারবার ব্যর্থ হলো, এক সময় ঠিকই সরিয়ে নিলো, বলল এ হয় না কখনো সম্ভব নয়।
-কেন সম্ভব নয়;
আপনি কোথায় আর আমি কোথায়, আপরার সাথে আমার হয় না।
প্রথম যেদিন তোমাকে দেখেছি সেদিন থেকে তোমাকে মনে প্রাণে অনেক বেশি ভালবেসে ফেলেছি, আমি আমার মাঝে নেই, আমার সমস্ত হৃদয় জুরে শুধু তুমি আর তুমি, তুমি সবার থেকে আলাদা একটি মেয়ে, তুমি অন্য মেয়েদের মতো নও।
আমি তোমাকে আপন করে পেতে চাই সারা জীবনের জন্য।

আমি বিথীমনি ছাড়া নিজেকে ভাবি না, নিজের সুখ কল্পনা করতে পারি না।
বিথীমনির সব দায় দায়িত্ব আমি নেব, তিথীর ভাই হিসেবে সবকিছু আমি পালন করবো।
কিন্তু আন্টি।
কালকের মধ্যে আমি নানুভাইকে নিয়ে মাকে সব খুলে বলবো, মা নিশ্চয়ই আমার কথায় রাজি না হয়ে পারবে না।

নাহিদ তার নানুভাইকে নিয়ে সব বুঝিয়ে বলল, নাহিদের মা সব শুনে রাজি হলো একমাত্র ছেলে তার সুখে তিনি সুখি;
আতিয়া আহম্মেদ বলল আগামী পরশু আমি ব্যবসার কাজে এক মাসের জন্য সিঙ্গাপুর যাচ্ছি তাই কালকের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলতে চাই; তিথী মা তোমার কি কোনো আপত্তি আছে।

তিথীর অনিশ্চিত জীবনে এভাবে হঠাৎ বসন্তের আগমন কিছুক্ষণের জন্য তিথীকে স্তম্ভিত করে দেয়। জীবনটা একদিন এমন বাসন্তী রঙে সাজবে কখনো কল্পনাও করেনি সে। যেন মুহূর্তেই বদলে গেলো তিথীর পৃথিবীটা।

হঠাৎ নাহিদের মা তিথীর মাথায় হাত রেখে বললো- কি ভাবছো তিথী; চুপ কেন?

তিথী নাহিদের মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে তার সম্মতির কথা জানিয়ে দিলো।



মন্তব্য চালু নেই