ওবায়দুল কাদেরসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ জনের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ

২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির এবং যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একইসঙ্গে রায়ে পাঁচ নেতার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা আন্দোলনে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া সাত নেতা হলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সরকারিনীতি পড়ুন
এছাড়া রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ এবং মাইনুল হোসেন খান নিখিলের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ জুলাই-আগস্ট (২০২৪) সময়কালে নিহত ও আহত সব ব্যক্তি বা তাদের পরিবারবর্গকে ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই এই সাত আসামি পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটররা। অন্যদিকে পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান উপস্থিত ছিলেন।
২০২৫ সালের ১৮ জুন এ মামলার তদন্তকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তারা। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
একই দিন ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। এরপর ধাপে ধাপে গ্রেফতারি পরোয়ানা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও স্টেট ডিফেন্স নিয়োগসহ শুনানি শেষে চলতি বছরের (২০২৬ সাল) ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ। গত ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী এতে সাক্ষ্য দেন। এরপর ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হলে ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন।
জুলাই আন্দোলনে সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় এটি সপ্তম রায়। ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে।
এর আগে দুটি ট্রাইব্যুনাল জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। ওইসব রায়ে মোট ৬১ জন আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই ১৫ আসামির মধ্যে ১১ জনই পলাতক এবং কারাগারে বন্দী আছেন মাত্র ৪ জন।
শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর। তার প্রায় ১০ মাস পর মঙ্গলবার দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের এই রায় ঘোষণা হলো।
প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীরা যেন রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, সে আহ্বান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন তারা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আসামিরা কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য।






























