‘নিজের ফাঁদেই আটকা ভারত’: বাংলাদেশকে পাকিস্তান না ভাবার সতর্কবার্তা শেখর গুপ্তের

বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও দ্য প্রিন্টের প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত। তার মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই দৃষ্টিতে দেখছে ভারত। এতে শেষ পর্যন্ত নয়া দিল্লিরই কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দ্য প্রিন্ট এ প্রকাশিত তার সাপ্তাহিক ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’ কলামে শেখর গুপ্ত লেখেন, ভারত নিজের তৈরি একটি ফাঁদে আটকে পড়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আরও জটিল হয়েছে। তবে দুই দেশকে একই কাতারে রেখে দেখার বিষয়টি ভারতের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
শেখর গুপ্তের ভাষ্য, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রয়োজন এবং ঘন ঘন নির্বাচনী প্রচারের ধরন বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে এক বন্ধনীতে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুর ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য এ প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।
ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের বক্তব্যেও বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, ‘ছোট প্রতিবেশী’ ধরনের মনোভাবের সঙ্গে এসব বক্তব্য যুক্ত হওয়ায় ঢাকার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
তবে শেখর গুপ্ত মনে করেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারতে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার কারণে তার আবার ক্ষমতায় ফেরাকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন ঘটানো ভারতের এজেন্ডায় নেই এবং নরেন্দ্র মোদি সরকারও বিষয়টি বোঝে। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার জন্য নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতাতেও তার ইঙ্গিত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিশ্লেষণ করেছেন শেখর গুপ্ত। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একদিকে জামায়াতে ইসলামীর বাড়তে থাকা রাজনৈতিক প্রভাব, অন্যদিকে ভারত নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মনোভাব দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তার মতে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সমালোচনা করায় এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ভারতের বিষয়ে যে মনোভাব তৈরি হয়েছে, তাতে নয়াদিল্লির সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেওয়া ঢাকার জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
একই সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ আরও কঠিন করে তুলছে। ঢাকার এমন অভিযোগও অমূলক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখর গুপ্তের মতে, ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে কি একই কাতারে রাখা হবে? তিনি বলেন, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশও সেই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে। এর ফলে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম দুই সীমান্তেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি দেশকে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখানোর একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি ভারতের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ভারত যদি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই বন্ধনীতে রাখে এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, তাহলে তা নয়াদিল্লির কৌশলগত স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক হবে না।
তিনি আরও বলেন, ভারতের দুই পাশে থাকা বড় প্রতিবেশী দেশগুলো যদি একই সময়ে বৈরী অবস্থান নেয় এবং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে সেটি ভারতের জন্য কতটা লাভজনক সেই প্রশ্ন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শেখর গুপ্তের মতে, ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একই কৌশলগত পরিসরে চলে যাওয়া ঠেকানো। এজন্য প্রতিবেশী নীতিকে দেশের মেরুকৃত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ না করাই নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সম্পর্ক মেরামতের জন্য বড় কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ দিয়েই শুরু করতে হবে এমন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশে ক্রিকেট সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণের মতো ছোট একটি পদক্ষেপ দিয়েও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।






























