মেইন ম্যেনু

এখনো আতঙ্কে শিউরে ওঠে শোলাকিয়াবাসী

শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এলাকাবাসীর কানে আজও ভেসে আসে গুলি আর বোমার শব্দ।

সেদিনের আচমকা হামলার কথা আজও ভুলতে পারছে না শোলাকিয়াবাসী। শিউরে উঠে শরীর যখন মনে পড়ে রক্তাক্ত দৃশ্যের কথা। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শোলাকিয়া এলাকার বাসিন্দারা।

গত বছর ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাতের সময় নিকটবর্তী চর শোলাকিয়া সবুজবাগ মোড়ে মুফতি মোহাম্মদ আলী জামে মসজিদের সামনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আচমকা হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জঙ্গি। জঙ্গিদের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হয় দুই পুলিশ সদস্য ও এক গৃহবধূ। এছাড়া গুরুতর আহত হয় আট পুলিশসহ কয়েকজন নিরীহ মানুষ। ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে এক জঙ্গিও নিহত হয়।

ঈদুল ফিতরের জামাতের সময় পরিচালিত জঙ্গি হামলায় ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে পারেনি নিহত গৃহবধূর পরিবারসহ স্থানীয়রা। এদিকে ওই ঘটনায় পুলিশ এখনো তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিতে না পারলেও জানিয়েছেন তদন্তে অগ্রগতির কথা।

ঘটনার এক বছর পরও বিপর্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন জঙ্গিদের গুলিতে নিজ বাড়িতে নিহত হওয়া গৃহবধূ ঝর্না রাণী ভৌমিকের পরিবারের সদস্যরা।

নিহতের স্বামী গৌরাঙ্গ নাথ ভৌমিক জানান, এই শোক এখনো আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ঘটনার পর অনেকেই অনেক ধরনের সহায়তার কথা জানালেও বাস্তবে কিছুই পাননি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দুঃখ-বেদনার কথা কথা জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে ঝর্না রাণী ভৌমিকের নিহত হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দারি করেছেন তিনি।

নিহত ঝর্না রাণী ভৌমিকের বড় ছেলে বাসু দেব ভৌমিক জানান, তার মায়ের মৃত্যুতে পরিবারটি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বাবা যেমন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন, তেমনি ছোট ভাইটিও মায়ের শোকে লেখাপড়াতে মন বসাতে পারছে না।

নিহত ঝর্না রাণী ভৌমিকের ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শুভ দেব ভৌমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মা আমাকে কত আদার করত। নিজের হাতে খাওয়াত, ঘুম পাড়াত, পড়াশোনা করাত। মাকে আমি আর এই জীবনে পাব না। আমার কোনো কিছু ভালো লাগে না।

শুধু ঝর্না রাণী ভৌমিকের পরিবারের সদস্যরাই নয়, সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এলাকাবাসীও এখনো ভুলতে পারছেন না সেই দুঃসহ স্মৃতি।

স্থানীয় বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা নীরেন্দ্র চন্দ্র দাশ ও দলিল লেখক মো. হাবীবুর রহমান জানান, এখনো সেদিনের কথা মনে হলে তারা আঁতকে ওঠেন এবং অজানা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশুদের মন থেকে এ ঘটনার স্মৃতি দূর হচ্ছে না কিছুতেই।

এদিকে ঘটনার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এখনো তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেনি। হামলার পেছনে জড়িত অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা ও মদদদাতাদের চিহ্নিত করতেই এই বিলম্বের কারণ বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই মামলায় আসামি হিসেবে ঘটনাস্থলে আটক জঙ্গি জাহিদুল হক ওরফে তানিম ও আনোয়ার হোসেন এবং সম্প্রতি গ্রেপ্তার দেখানো জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধী- এ তিন আসামি বর্তমানে জেল-হাজতে আছে। এছাড়া ঘটনার সময় পুলিশের গুলিতে আহত আরেক জঙ্গি শফিউল ইসলাম (ডন) গত বছরের ৪ আগস্ট বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোর্শেদ জামান জানান, এখনও মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তাই এ মামলার অভিযোগপত্র দিতে আরও সময় লাগবে। তবে তদন্তে অনেক অগ্রগতি রয়েছে।

তিনি বলেন, শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার অন্যতম হোতা জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজিব গান্ধীকে গত ২৯ মে আদালতের অনুমতিক্রমে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় কিশোরগঞ্জ পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে রাজিব গান্ধী। পুলিশের কাছে অস্ত্রদাতা, অর্থদাতা এবং হামলার নেপথ্যে আরও কারা ছিল তাদের নাম প্রকাশ করেছে সে। জিজ্ঞাসাবাদে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও শোলাকিয়া হামলায় নিজে জড়িত থাকাসহ আরও অনেকের নাম বলেছে রাজিব। শোলাকিয়ার ঘটনার সঙ্গে গুলশানের হোলি আর্টিজান, জাপানি নাগরিক হোসে কুনিও, ঢাকার সিজার তাবেলা হত্যাকাণ্ডসহ আরো কয়েকটি জঙ্গি হামলার সম্পৃক্ততা রয়েছে। শোলাকিয়া জামাতের ইমাম ফরিদউদ্দিন মাউসদকে হত্যা করতেই মূলত হামলা চালায় জঙ্গিরা। এরা সবাই নব্য জেএমবির সদস্য। হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ার পরিকল্পনা একসঙ্গেই করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে রাজিব গান্ধী। তার জবানবন্দি অনুযায়ী মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, হামলার ঘটনার তিন দিন পর ১০ জুলাই শফিউল ইসলাম (ডন) ও জাহিদুল হক তানিমকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ছয়টি ধারায় দায়েরকৃত মামলায় অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পাকুন্দিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সামছুদ্দিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।



মন্তব্য চালু নেই