এক সপ্তাহেও কাটেনি সংকট, কলকাতায় হোটেল না পেয়ে দিশাহারা বাংলাদেশিরা

এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কলকাতায় চিকিৎসা নিতে আসা বাংলাদেশিদের হোটেল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এখনো হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। রোগী ও স্বজনদের নিয়ে একের পর এক হোটেলে ঘুরেও মিলছে না মাথা গোঁজার ঠাঁই। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পথেঘাটে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ আবার হোটেল না পেয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এদিকে, এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসছেন বহু বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের বক্তব্য, সমস্যার কথা জানলেও চিকিৎসার তারিখ আগে থেকেই নির্ধারিত থাকায় কলকাতায় না এসে উপায় নেই।
প্রতিদিনই কলকাতার নিউমার্কেটের মারক্যুইস স্ট্রিটে বাংলাদেশ থেকে বাস এসে থামছে। বাস থেকে নেমেই যাত্রীরা ছুঁটছেন হোটেলের খোঁজে। অনেক রোগীর স্বজন ও পরিবারের সদস্যকে দীর্ঘক্ষণ ফুটপাতেই বসে অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ঢাকার বাসিন্দা মো. পাভেল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। সেখান থেকে চিকিৎসা শেষ করে বুধবার (২৬ আগস্ট) কলকাতায় আসেন। কিন্তু হোটেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফুটপাতেই বসে থাকতে হয় তাকে।
পাভেল বলেন, আজ সকালে হোটেল পেলাম। সব মিলিয়ে পাঁচটি হোটেল পরিবর্তন করা লেগেছে। চিকিৎসা করাতে এসেছি, অপারেশন হয়েছে, সমস্যায় আছি। অসুস্থ রোগী নিয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে তারপর হোটেল পেলাম। এখানে থাকার কারণ হলো এখানে বাংলা খাবার পাওয়া যায়। এর আগে নিউটাউনে ছিলাম। বাচ্চা ছিল, তাদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমরা কষ্ট করে কোনো রকম রয়ে গেছি।
এখানকার সরকার আমাদের সুরক্ষার জন্য সব হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটা রুমে তিনজন থাকি আর ভাড়া ১২০০ রুপি। সেফটি ও সিকিউরিটি ভালো আছে।
অন্যদিকে, ঢাকার বাসিন্দা শামীমের অভিজ্ঞতা কিছুটা আলাদা। পাঁচ-ছয়টি হোটেল ঘোরার পর শেষ পর্যন্ত তিনি থাকার জায়গা পেয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক সমস্যায় পড়েছি। তবে অনেক কষ্টে একটা হোটেল পেয়েছি। আমি মনে করি, যা হচ্ছে আমাদের ভালোর জন্যই হচ্ছে। তাই সাময়িক এই সমস্যাটা আমরা মেনে নিতে পারি।
তবে এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন মারকুইস স্ট্রিট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ীরা।
নিউমার্কেটে ট্রাভেল ব্যবসায়ী সাকিল আহমেদ জানিয়েছেন, দুর্ঘটনা সত্যি দুঃখজনক, এরপর থেকেই কোনো হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। এখানকার ব্যবসায়ীরা ৯৫ শতাংশই বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভরশীল। মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিটের প্রায় সব হোটেল বন্ধ হয়ে গেছে। আমি যতদূর জানি, এই কয়েক জায়গায় মুর্হুতের মধ্যে ৫১টির মতো হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
‘যে হোটেলে আগুন লেগেছে ‘শিখা ইন’ ওই হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত, কারণ সেটি হোটেল নয়। কিন্তু অন্য যেসব হোটেল রয়েছে, তারা সবকিছুই মেইন্টেন করে। সরকারের উচিত ছিল তাদেরকে একটু সময় দেওয়া। হোটেল বন্ধ করার একটা নোটিশ দিয়ে বাংলাদেশি পর্যটকদের হ্যারাস করা হচ্ছে।’
সাকিল আরও বলেন, ভারত সরকার পর্যটন ভিসা খুলে দেওয়ার পর থেকেই প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশি পর্যটক এখানে আসছে। প্রত্যকদিন অনেক বাংলাদেশি নাগরিককে চেন্নাই, ভেলোর, মুম্বাই, দিল্লিতে পাঠাই। এছাড়া কলকাতাতেও এখন প্রচুর বাংলাদেশি আসছেন, কিন্তু আমরা তাদের হোটেল দিতে পারছি না। এটা দেশের বদনাম।
তার আরও প্রশ্ন, প্রতিদিন যখন বাংলাদেশ থেকে চার-পাঁচটি গাড়ি করে যাত্রীরা কলকাতায় আসছেন, তখন তারা থাকবেন কোথায়? হোটেল বন্ধ রাখলে বাসও বন্ধ করে দেওয়া হোক, যাত্রী আসাও বন্ধ করা হোক। আমরা শুধু ব্যবসার কথা বলছি না, বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষগুলোর কথাও ভাবতে হবে।
তবে কলকাতার মুকুন্দপুর এলাকায় ছবিটা একেবারেই ভিন্ন। কলকাতার ‘হাসপাতাল পাড়া’ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় রয়েছে একাধিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ও কলকাতা শহর থেকেও বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য মুকুন্দপুরে আসেন।
সেখানেও নিয়মবহির্ভূতভাবে হোটেল চালানোর অভিযোগে শতাধিক হোটেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিস ঝোলানো হয়েছে। নোটিসে অতিথি না রাখার নির্দেশ রয়েছে, বলেই অভিযোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের নির্দেশকে কার্যত উপেক্ষা করেই বহু হোটেলে অতিথি রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, প্রশাসন মূলত কাগজপত্র পরীক্ষা করার নোটিস দিয়েছে। অতিথি রাখা যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়নি।
আবার অনেকের বক্তব্য, চিকিৎসার জন্য যখন মানুষ এত দূর থেকে আসছেন, তখন তাদের থাকার ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একজন ব্যবসায়ীর কথা, মানুষ চিকিৎসা করাতে এখানে আসছে। তারা থাকবে কোথায়? হয় তাদের আসা বন্ধ করতে হবে, নয়তো সীমান্ত থেকে বাস চলাচল বন্ধ করতে হবে। মানুষ যখন আসছে, তখন তাদের তো রাখতেই হবে।
জাগোনিউজ২৪।





























