নাড়ির টানে বাড়ি ছুটছে মানুষ

দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল ফিতর। চাঁদ উঠলেই খুশির ঈদ। গত দুই বছর করোনার কারণে প্রিয়জনের সঙ্গে হয়নি ঈদ উদ্যাপন। তাই এবার উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে গত কয়েকদিন ধরে গ্রামের বাড়ি ছুটছেন লাখো মানুষ। মহাসড়কে যানজটের ভোগান্তি নেই। তাই অনেকটা স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন ঘরমুখো মানুষ।

তবে শনিবার (৩০ এপ্রিল) রাজধানীর বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ সব যানে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।

রোজা ২৯টা হলে এবং আজ রোববার চাঁদ দেখা গেলে আগামী দিন সোমবার উদ্যাপিত হবে ঈদুল ফিতর। তবে রোজা ৩০টি হলে ঈদ হবে ৩ মে মঙ্গলবার। সেই ক্ষেত্রে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের সরকারি-বেসকরারি চাকরিজীবীরা ছুটি পেয়েছেন ২৯ এপ্রিল থেকে। আর ২৭ এপ্রিল ট্রেনের বিশেষ সার্ভিস থেকে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। তাই গত কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ছাড়েন ঘরমুখো মানুষ। গত তিনদিন রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের চাপ ছিল না।

তবে গতকাল থেকেই রাজধানীর মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিল যাত্রীদের ভিড়। ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাট জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।

ঈদযাত্রায় অবশেষে ট্রেনেও মিলেছে স্বস্তি। এবার ঈদযাত্রায় কয়েক ধাপে ছুটি হওয়ায় ইতোমধ্যে রাজধানী ছেড়েছে বেশিরভাগ মানুষ। গত কয়েকদিনের তুলনায় গতকাল ট্রেনের কামরায় দাঁড়ানো যাত্রীও ছিল কম। তবুও নানাভাবে যারা প্রিয়জনের কাছে যেতে পারছেন, ঈদের আনন্দ শুরু হয়েছে তাদের এ যাত্রা থেকেই।

শনিবার সকাল থেকেই মোটামুটি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া টিকিটে যাত্রা করতে পেরে খুশি যাত্রীরা। ট্রেনের ভেতরে বা ছাদে উঠতে পারা এক প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের। সর্বোচ্চ ঝুঁকি জেনেও তা ম্লান হয়েছে ঈদ উৎসবের কাছে। শেকড়ের টান, নাড়ির টানে ফিকে হয়েছে কষ্টের যাত্রা।

প্রায় সব ট্রেনে ভিড় কম থাকলেও উত্তরাঞ্চলের নীলসাগর এক্সপ্রেসের অনেক যাত্রী উঠে বসেন ট্রেনের ছাদে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকজনকে নামিয়ে দিতে সক্ষম হলেও বেশিরভাগই রওনা দিয়েছেন ঝুঁকি নিয়ে। আবার অনেকে টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগও করেছেন।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রা করতে পারছেন যাত্রীরা। সার্বিক বিষয় নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু এক লেন হওয়ায় সেখানে অপেক্ষা করতে গিয়ে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

তাছাড়া সবাইকে নিরাপদে নামিয়ে দিতে প্রতিটি স্টেশনে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছু সময় বেশি থামানো হচ্ছে। ফলে সময় মেনে চলা কঠিন হবে। তবে কোনো দুর্ঘটনা না হলে সময়সূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় হবে না। আমরা চেষ্টা করেছি দ্রুত ঢাকা থেকে ট্রেনগুলো ছেড়ে দিতে।

গত কয়েকদিন বাসে ছিল যাত্রী সংকট। তাই বাসে হয়েছে সিডিউল বিপর্যয়। কিন্তু গতকাল বাসের টিকিটের জন্য হাহাকার লেগে যায়। সকাল থেকে রাজধানীর গাবতলীতে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের চঞ্চলতা। দুই হাতে ব্যাগ নিয়ে নির্দিষ্ট বাসের কাউন্টার খুঁজে বেড়াচ্ছেন অনেকে। তবে দূরপাল্লার যাত্রীর চাপ কম দেখা গেছে। ঢাকার পাশের জেলাগুলোর যাত্রী বেশি দেখা গেছে।

গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমবঙ্গের সব বাস ছেড়ে যায়। অনেকে গতকাল আধা বেলা অফিস করে পরিবার নিয়ে ছুটছেন গাবতলীতে। তবে টিকিটপ্রাপ্তরা নির্বিঘ্নে বাসে উঠতে পারলেও বিড়ম্বনায় পড়ছেন টিকিট না পাওয়া সাধারণ যাত্রীরা। যারা আগে টিকিট কাটেননি বা টিকিট পাননি তাদের একমাত্র ভরসা এখন লোকাল বাস। এই বাসগুলোতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়াও।

পাটুরিয়া ঘাটগামী যাত্রী সবুজ মিয়া জানান, বাস টার্মিনালে ভিড় কম থাকলেও লোকাল ও গেটলক বাসগুলোতে মানুষের চাপ বেশি। এ সুযোগে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। দেড়শ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে আড়াইশ টাকা।

পাটুরিয়া ঘাটে যাবেন আরেক যাত্রী বেলাল মিয়া বলেন, অন্য সময় ভাড়া নিত ১৫০ টাকা, আজ নেওয়া হচ্ছে ৩০০ টাকা। ভাড়া এক এক গাড়িতে একেক রকম। বাসও মিলছে না। বাধ্য হয়ে পরিবারসহ সেলফি বাসে উঠেছি।

একটি বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা আবু নাছের বলেন, গাবতলীতে এসে পরিবহন ভোগান্তিতে পড়েছি। লাইনে দাঁড়িয়ে কখনো টিকিট কিনি না। সিডিউল বাসেই যাওয়া যায়। কিন্তু এবার এসে দেখছি ভাড়া বেশি, পরিবহনও কম। অল্প বাসে ঠাসাঠাসি অবস্থা।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদে দীর্ঘ ছুটি থাকায় আগেই অনেক যাত্রী ঢাকা ছেড়েছেন। এ কারণে গত কয়েকদিন যাত্রীর তেমন চাপ ছিল না। তবে গতকাল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চাপ কম থাকলেও দুপুরের পর চাপ বেড়ে যায় কাউন্টারগুলোতে। অনেকে সিটিং সার্ভিসের টিকিট না পেয়ে লোকাল বাসের যাত্রী হয়েছেন।

এসবি লিংক পরিবহনের সুপারভাইজার সাজেদুল জানান, আমাদের ঈদ আছে। আমাদের কেনাকাটা করতে হয়। পরিবহন মালিকরা সব সময় সে খরচ দেয় না। তাই যাত্রীরাই আমাদের ভরসা। ঈদ আসছে, যাত্রীদের চাপ আছে। তাদের কাছ থেকে বলে-কয়ে একটি বেশি নিচ্ছি।

বাংলাদেশ বাস ট্রাক মালিক সমিতির চেয়ারম্যান রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, চলতি যাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শেষ। বাস টার্মিনালে মনিটরিং টিম আছে। র‌্যাব ও পুলিশের কন্ট্রোল রুম রয়েছে। মালিক সমিতির নজরদারিও রয়েছে। যদি কোনো যাত্রীর কাছে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হয় তবে অভিযোগ করুক, আমরা ব্যবস্থা নেব।

এদিকে নৌপথ যাত্রীর তীব্র চাপ দেখা গেছে। ঢাকা নদীবন্দরে অনেক যাত্রী লঞ্চের ছাদে চড়ে গন্তব্যে রওনা হন। এতে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। তবে লঞ্চগুলো নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যায়।

অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া, মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও শরীয়তপুরের মাঝিকান্দি নৌপথে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ ছিল প্রচুর। তবে, দুপুর পর্যন্ত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটের দৌলতদিয়া প্রান্তে এখনও চাপ দেখা যায়নি। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়ায় ফেরি পারাপারের অপেক্ষায় থাকে কয়েকশো গাড়ি। ৮৫টি লঞ্চ, একশ ৫৫টি স্পিডবোট ও ১০টি ফেরিতে পদ্মা পার হন হাজারো মানুষ। এবারের ঈদযাত্রায় ফেরি ঘাটে প্রতিদিনই শত শত মোটরসাইকেলের চাপ দেখা যাচ্ছে। এজন্য এক নম্বর ফেরি ঘাট দিয়ে কেবল দ্বিচক্র যানই পার করা হয়।

মাদারীপুরে বাংলাবাজার প্রান্তে যাত্রীর চাপ বাড়লেও একাধিক ঘাট ও এক্সপ্রেসওয়ে থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি যাত্রীদের। তবে যাত্রীদের চাপ বাড়ার সুযোগে বাড়তি ভাড়া আদায় করে স্পিডবোটের চালকরা। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের ভিড় ছিল না বললেই চলে। তবে ছোট যানবাহনের চাপ ছিল। এই রুটে ২১টি ফেরি ও ৩৩টি লঞ্চ চলাচল করছে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজটে নাকাল হন উত্তরবঙ্গগামীরা। মহাসড়কটির হাতিয়া থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা।

তবে দুপুরের পর এখানকার পরিস্থিতি সহনীয় হয়ে এলেও বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের গোল চত্বর থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত জট তৈরি হয়।

সবমিলিয়ে যাত্রাপথে কিছুটা ভোগান্তি বাড়লেও এবারের ঈদযাত্রায় অনেকটা স্বস্তির কাথা জানিয়েছেন মানুষ। নানা ঝক্কি পেরিয়ে কষ্ট শেষে আপনজনদের সঙ্গে ঈদের হাসির অপেক্ষায় লাখো মানুষ।