ফুলছড়ি রেঞ্জে পাহাড় কেটে ৫ কক্ষের নতুন মার্কেট নির্মাণ

কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জে বন বিভাগের জমিতে পাহাড় কেটে পাঁচ কক্ষের একটি মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিমে নির্মিত কাঠ ও টিনের স্থাপনাটি ঘিরে জমির মালিকানা, নির্মাণের বৈধতা এবং বন বিভাগের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই এলাকায় গত এক বছরে কয়েক একর বনভূমি দখল করে আধাপাকা ও বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ ঘটনায় দৈনিক গণমুক্তি, দৈনিক ঘোষণা, দৈনিক আজকের আওয়াজসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।তবে সংবাদ প্রকাশের পর ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের। এতে বনভূমি রক্ষায় বন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা যায়,ফকিরা বাজারের উত্তর-পশ্চিমে মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় মাদার গর্জনগাছবেষ্টিত পাহাড়ের একটি অংশ কেটে পাঁচ কক্ষের মার্কেটটি নির্মাণ করা হয়েছে।শুধু এই স্থাপনাই নয়, বন বিভাগের জমিতে অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এসব ঘটনায় বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
৯ হাজার ৯৩৮ একর বনভূমি:
বন বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি রেঞ্জে সংরক্ষিত বনভূমির পরিমাণ ৯ হাজার ১০৩ একর এবং রক্ষিত বনভূমি ৮৩৫ একর। সব মিলিয়ে এ রেঞ্জের বনভূমির পরিমাণ ৯ হাজার ৯৩৮ একর। রেঞ্জটি পাঁচটি বন বিট নিয়ে গঠিত।
অন্যদিকে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিভাগের বনভূমির পরিমাণ ৩৫ হাজার ৬.৪৯ হেক্টর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি ২৯ হাজার ১৮৪.২৭ হেক্টর, রক্ষিত বনভূমি ৫ হাজার ৭৯৫.৬৪ হেক্টর এবং অর্পিত বনভূমি ২৬.৫৮ হেক্টর।
বিপুল পরিমাণ বনভূমির দায়িত্বে থাকা একটি রেঞ্জের আওতায় মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় পাহাড় কেটে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ ওঠায় বনভূমি সংরক্ষণ ও নিয়মিত তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, স্থাপনাটি নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্ট বিট ও রেঞ্জ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরে বিষয়টি আসেনি কেন? যদি এসেই থাকে, তাহলে প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?
বাড়িঘর নির্মাণে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ:
বন বিভাগের জমিতে বাড়িঘর নির্মাণের সুযোগ দিতে বাড়িপ্রতি ৭০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকটি সূত্র। বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।ফুলছড়ি রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমানের বিরুদ্ধে বনভূমি রক্ষা ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।এ বিষয়ে একাধিকবার তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।
আগেও উঠেছিল বনভূমি দখলের অভিযোগ:
ফুলছড়ি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ফুলছড়ি রেঞ্জ এলাকায় কয়েক বছরে প্রায় ৫০০ একর বনভূমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল।
ফুলছড়ির সহকারী বনসংরক্ষক শহিদুল হাসান শাকিল এর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি নতুন যোগদান করায় পাহাড় কাটা কিংবা মার্কেট নির্মাণের বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই। তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেনের পূর্ববর্তী বক্তব্য অনুযায়ী, বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে তাঁর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।তবে সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে ফকিরা বাজারের মার্কেট নির্মাণের অভিযোগে বন বিভাগের সর্বশেষ অবস্থান ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি:
স্থানীয়দেরস্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের দাবি, ফকিরা বাজারের পাঁচ কক্ষের মার্কেটটির জমির দাগ-খতিয়ান, সীমানা নকশা ও মালিকানা যাচাই করে নির্মাণের বৈধতা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি কতটুকু পাহাড় কাটা হয়েছে, কী পরিমাণ পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে এবং বনভূমি দখলের অভিযোগে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট বন বিটের নথি, বনভূমি দখলসংক্রান্ত মামলা, উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবেদন এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।৯ হাজার ৯৩৮ একর বনভূমির দায়িত্বে থাকা ফুলছড়ি রেঞ্জে ফকিরা বাজারের মার্কেটটি কোন জমিতে নির্মিত, পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে কি না এবং অভিযোগ প্রকাশের পর বন বিভাগ কী পদক্ষেপ নিয়েছে-এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্যই পারে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনতে ও বনভূমি সংরক্ষণে জনআস্থা ফিরিয়ে আনতে।























