খুলনায় ফের আলোচনায় হুমা বাহিনী, ডাকাতি মামলায় সহযোগী জিহাদ গ্রেপ্তার

খুলনার অপরাধজগতে আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর একটি হুমা বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘবদ্ধ ডাকাতির মামলায় বাহিনীটির সহযোগী হিসেবে পরিচিত এমদাদুল হাওলাদার ওরফে জিহাদকে গ্রেপ্তারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই বাহিনী।
খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানায় দায়ের করা সংঘবদ্ধ ডাকাতির মামলায় জিহাদকে গ্রেপ্তার করেছে খুলনা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গোপন তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ১৮ আগস্ট রাত ১টা থেকে সাড়ে ১টার মধ্যে খানজাহান আলী থানার ফুলবাড়ীগেট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, তদন্তে পাওয়া তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে ওই ডাকাতির ঘটনায় জিহাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া মামলার অন্য আসামিদের সঙ্গেও তার যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
খুলনার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মহানগর ও জেলায় সক্রিয় বা আলোচিত একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বাধীন ‘হুমা বাহিনী’ অন্যতম। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে খুলনা মহানগর ও জেলায় আলোচিত নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের তালিকায় হুমা বাহিনীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হুমা বাহিনীকে ঘিরে চাঁদাবাজি, হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার, গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত ও আদালতে প্রমাণ সাপেক্ষ।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা এলাকার ‘হুমা বাহিনীর সদস্য’ হিসেবে পরিচিত মো. সুজন সরকারকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ গ্রেপ্তারের কথা জানায় র্যাব-৬। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, ডাকাতি, অস্ত্র আইন ও চাঁদাবাজিসহ সাতটি মামলা ছিল।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাহিনীটির সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ২০ অক্টোবর দুটি বাড়িতে গুলি ছোড়ার ঘটনায় হুমা বাহিনীর সম্পৃক্ততার কথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে ওই ঘটনায় ওসমান ও সেলিম নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়।
খুলনায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চলতি বছরের জুনে কেএমপির নেতৃত্বে বিশেষ অভিযানে ৮৩৪ জন অপরাধীকে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কয়েক দিনে শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে—আলোচিত অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী তখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
একই সময়ে খুলনা মহানগর ও জেলায় আলোচিত নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম প্রকাশ্যে আসে। এসব গ্রুপের মধ্যে হুমা বাহিনী ছাড়াও বি কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির গ্রুপের নাম উল্লেখ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে হুমা বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা জিহাদের গ্রেপ্তার নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। ডিবির তদন্তকারীদের দাবি, শুধু পরিচিতির সূত্রেই নয়, সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় জিহাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণও তারা পেয়েছেন। একই মামলায় আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের সঙ্গে তার যোগাযোগের তথ্যও তদন্তে এসেছে।
কেএমপি’র ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী লিখল, সেটি আমাদের তদন্তকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করবে না। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। কারও বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, সে যে পর্যায়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে বা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করে, সেক্ষেত্রেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে জিহাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
খুলনায় একের পর এক সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম সামনে আসায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্র, মাদক, চাঁদাবাজি, জমি ও স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এসব গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ধরতে বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। ফলে জিহাদের মতো সহযোগীদের গ্রেপ্তারকে তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট চক্রের নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও অন্য সদস্যদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
এখন প্রশ্ন জিহাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হুমা বাহিনীর মূল হোতা ও অন্যান্য সক্রিয় সদস্যদের বিষয়ে পুলিশ কতটা তথ্য বের করতে পারে এবং সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় তাদের ভূমিকা কতটা ছিল। ডিবি জানিয়েছে, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন এবং জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।



















